ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯, ৩১ আষাঢ় ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

আপনারা নীরব কেন?

সৈয়দ বোরহান কবীর
প্রকাশিত: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ বুধবার, ১০:০০ পিএম
আপনারা নীরব কেন?

৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন এই মামলার অন্যতম আসামি। রায়ে যদি তিনি দণ্ডিত হন তাহলে তিনিই হবেন বাংলাদেশের প্রথম দণ্ডিত প্রধানমন্ত্রী। এর আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদও জনতা টাওয়ার দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়ে কারাবরণ করেছিল। এই মামলার রায় যাই হোক না কেন, এটা আমার বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক ঘটনা। আমাদের সংবিধানে বলা হয়েছে, ‘আইন সবার জন্যই সমান।’ কিন্তু প্রায়ই আমরা দেখি আইন গরীবের জন্য একরকম, ধনীর জন্য অন্যরকম। টাকা থাকলেই আইন, বিচার ও ন্যায়নীতির বাইরে যাওয়া যায় এমন একটা বিশ্বাস বাংলাদেশে প্রবল। এদেশের অধিকাংশ মানুষই মনে করে আইন শুধু সাধারণ মানুষের জন্য, ক্ষমতাবানদের জন্য নয়। -এই রায় এরকম হতাশাজনক ধারণাগুলোর ওপর একটি বড় আঘাত। বেগম খালেদা জিয়ার মতো প্রচণ্ড প্রতাপশালী একজন রাজনীতিবিদকেও দুর্নীতির দায়ে আদালতে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এটা একটা বড় ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পর, বেগম জিয়ার দুর্নীতির বিচার- আইনের শাসনের পথে বাংলাদেশের আরেক ধাপ অগ্রযাত্রা। বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি আমাদের দেশে ৭৫ এর ১৫ আগস্টের পর থেকে শুরু হয়েছিল, সেখান থেকে যে আমরা কিছুটা হলেও বেরিয়ে আসতে পেরেছি-এই বিচার তার এক বড় উদাহরণ।

বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পুরোনো। দেশের অভিজাত নাগরিক সম্প্রদায়, যারা নিজেদের ‘সুশীল সমাজ’ বলতে পছন্দ করেন, তারা মনে করেন, বাংলাদেশের সর্বনাশের মূলে রাজনীতিবিদদের লাগাম ছাড়া দুর্নীতি। এই অভিযোগ যে একেবারেই অসত্য তা নয়। কিন্তু এরকম প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য হলো বিরাজনীতিকরন। রাজনীতিবিদদের হেয় করে একটি কৃত্রিম শাসন ব্যবস্থা কায়েম করে তাতে নেতৃত্ব দেওয়া এদেশের সুশীল সমাজের এক পুরোনো আকাঙ্ক্ষা। এজন্যই প্রতিটি গণতান্ত্রিক সরকারের মেয়াদান্তে আমাদের সুশীলরা ব্যাপক চিৎকার চেঁচামেচি করেন। এসব কথাবার্তায় প্রায় পুরোটাই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দুর্নীতি এবং ব্যর্থতা। বাংলাদেশও পালাক্রমে আওয়ামী লীগ , বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেও ‘দুর্নীতি প্রসঙ্গটি বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্যেই রয়ে গেছে।’ ক্ষমতাসীন কোনো দলই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ হাজির করে না। ব্যাপারটা এমন যে ‘কাক কাকের মাংস খায় না’ যেমন। এক্ষেত্রে সম্ভবত বর্তমানে সরকার এক বিরল ব্যতিক্রম। কাল আদালতে যে মামলার রায় হবে, সেই মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল ওয়ান-ইলেভেনের অনির্বাচিত সরকারের সময়ে।‘ রাজনীতি দুর্নীতিতে ডুবে আছে’ এমন তত্ত্ব দিয়েই নামজাদা সুশীলদের পৃষ্ঠপোষকতায় সেনা সমর্থিত ওই ওয়ান ইলেভেন সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। তখনো সুশীল সমাজ বলেছিল, রাজনীতিবিদরা তাঁদের দুর্নীতির বিচার করবে না, কাজেই ‘এখনি সময়’। ওয়ান – ইলেভেন সরকার বিদায়ের পর অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন তাদের আমলে করা মামলা গুলো বোধ হয় হিমঘরে চলে যাবে। কিন্তু সরকার দল নির্বিচারে সব যৌক্তিক মামলা অব্যাহত রেখেছে। মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, মহিউদ্দিন খান আলমগীর, ব্যরিস্টার নাজমূল হুদার মামলা বাধাহীন ভাবে প্রবাহিত হয়েছে। এবার সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিচারও আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। অর্থাৎ রাজনীতিবিদ হলেই তিনি আইন এবং বিচারের বাইরে – এই ধারণা লোপ পেতে শুরু করেছে। আমি মনে করি, এটা সুশাসন, আইনের শাসনের ক্ষেত্রে এক বড় অর্জন। তবে রায়ের আগে ওই সুশীল সমাজের নীরবতায় আমি হতবাক না হয়ে পারছি না। কোথায় আমাদের প্রিয় সম্পাদকদ্বয় মাহফুজ আনাম এবং মতিউর রহমান? যারা রাজনীতির দুর্নীতি নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করেন। তাদের ‘স্বপ্নের সরকারের’ সময়ে করা এক মামলা যে সমাপ্তির পথে তারা কি আনন্দিত নন? একটি প্রধান দলের শীর্ষনেতা যে বিচারের শেষ বিন্দুতে দাঁড়িয়ে এতে কী তারা মুগ্ধ নন? নাকি আসামি বেগম জিয়ার জন্য তারা মর্মাহত?

কোথায় আমাদের প্রিয় অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। যেকোনো বিষয়ে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে সোচ্চার এই অর্থনীতিবিদ, এই বিচারকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

কোথায় সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন? যিনিই আইন উপদেষ্টা থাকা অবস্থায় এই মামলা হয়েছিল। তাঁর মামলা পূর্ণতা পেতে যাচ্ছে, তিনি নীরব কেন? টিআইবির নির্বাহী পরিচালক তো সবকিছুর মধ্যেই দুর্নীতির গন্ধ পান। সুশাসনের জন্য দুর্নীতির মামলা বিচার জরুরি এমন কথা তো তার মুখ থেকে প্রায়ই শুনি। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী আইনের আওতায় এলেন। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক এটাকে কি চোখে দেখেন, জাতি তা জানতে চায়।

একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার রায় বাংলাদেশের জন্য এক অভূতপূর্ব ঘটনা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে এটি এক বড় বার্তা। অথচ আমি খুবই দুঃখিত এবং লজ্জিত যে সুশাসনের পক্ষে আমাদের বীর সুশীল যোদ্ধারা এ ব্যাপারে খামোশ। তারা কি বেগম জিয়ার জন্য কষ্ট পাচ্ছেন? তাদের মধ্যের কোনো কি কান্না জমেছে? একটু হাইপোথিটিক্যাল আলোচনা সূত্র ধরে লেখাটি শেষ করতে চাই। ধরা যাক, বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রী, এই রায় দেওয়া হচ্ছে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। এখন কি এই সুশীলরা মৃদু হেসে বলবেন না, ‘এটা আসলে গণতন্ত্রের জন্য এক মাইলফলক।’ এখন কি তাঁদের মনের কোনে বেজে উঠতো না, ‘মারহাবা! মারহাবা!’



Read in English- http://bit.ly/2E9XjJh

বাংলা ইনসাইডার/জেডএ