ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৯ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

সামাজিক ব্যবসার ফাঁক-ফোঁকর

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ২৪ জুন ২০১৮ রবিবার, ০৮:০০ এএম
সামাজিক ব্যবসার ফাঁক-ফোঁকর

১৯৭০ দশকের গোঁড়ার দিকে ব্রিটেনে সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ বা সামাজিক ব্যবসার ধারণার সূত্রপাত হয়। পরে বাংলাদেশের ডক্টর মুহম্মদ ইউনূস নোবেল বিজয়ের পরে ১৯৯০ দশকে এটাকে সোশ্যাল বিজনেস বা সামাজিক ব্যবসা নামকরণ করে সারা দুনিয়ার বিভিন্ন মাধ্যমে জনপ্রিয় করে তোলেন। উনার মতে, ‘সামাজিক ব্যবসা নিজে মুনাফা অর্জন করে, কিন্তু মালিক মুনাফা নেয় না, শুধু মূল বিনিয়োগ ফেরত নিতে পারে। এ কোম্পানির মূল লক্ষ্য হলো নির্দিষ্ট কোনো সামাজিক বা পরিবেশগত সমস্যার সমাধান। সামাজিক ব্যবসায় বিনিয়োগকারীরা লগ্নি করা বিনিয়োগ ফেরত পাবেন। এরপর থেকে সব মুনাফা থেকে যাবে কোম্পানিতে। সেটি ব্যবহৃত হবে সেবার আওতা বাড়াতে অথবা প্রদেয় পণ্য ও সেবার মান উন্নয়নে। সামাজিক ব্যবসায় উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীর প্রেষণাই হলো ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার পরিবর্তে বরং মহৎ কিছু করার আকাঙ্ক্ষা।’  

বিবিসি’র খবরে জানা যায় যে, ড. ইউনূস বলেছেন সামাজিক ব্যবসা অন্য আর দশটি ব্যবসার মতোই হবে, তবে পার্থক্য হলো:    

১. এতে বিনিয়োগকারীরা কোনো লাভ নিতে পারবেন না। কেবল তাদের প্রাথমিক বিনিয়োগ ফেরত পাবেন।

২. সামাজিক ব্যবসার সাফল্য বিচার করা হবে সামাজিক উন্নয়নের সূচক দিয়ে। যেমন তারা কতজনকে পুষ্টি সরবরাহ করতে পারলো বা কতজনকে দারিদ্রমুক্ত করতে পারল অথবা কতজনকে বিশুদ্ধ পানি দিতে পারল ইত্যাদি।

৩. এই ব্যবসাতে যারা বিনিয়োগ করবেন তারা আত্মতৃপ্তি পাবেন, কোনো ভালো কাজ করছেন এটা ভেবে।

৪. যারা এই ব্যবসাতে বিনিয়োগ করলেন তারা এটির মালিক থাকবেন কিন্তু লাভ নিতে পারবেন না। তবে ব্যবসার পরিচালনার সিদ্ধান্ত তারাই নেবেন এবং এতে যারা চাকরি করবেন তারা বাজার দরে বেতন ভাতা ও সুবিধাদি পাবেন।

৫. সামাজিক ব্যবসা চাইলে মালিকেরা কিছুদিন পরে স্বাভাবিক ব্যবসায় রূপান্তরিত করতে পারবেন। অর্থাৎ তারা লাভ নিতে পারবেন, যদি চান। এটা তাদের মর্জির উপর নির্ভরশীল।

সামাজিক ব্যবসার ৭টি মূলনীতি:  

ক. দারিদ্র্য বিমোচনসহ এক বা একাধিক বিষয় যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও পরিবেশগত খাতে বিরাজমান সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিগত মুনাফাহীন কল্যাণকর ব্যবসা এটি।

খ. সকলের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করাই এ ব্যবসার লক্ষ্য।

গ. সামাজিক ব্যবসায় বিনিয়োগকারীরা শুধু তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থই ফেরত পাবে, এর বাইরে কোনো প্রকার লভ্যাংশ নিতে পারবে না।

ঘ. বিনিয়োগকারী তার বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত নেয়ার পর বিনিয়োগকৃত অর্থের মুনাফা কোম্পানির সম্প্রসারণ কাজে ব্যবহৃত হবে।

ঙ. এ ব্যবসা হবে পরিবেশবান্ধব।   

চ. এখানে যারা কাজ করবেন তারা ভালো কাজের পরিবেশ ও চলমান বাজার অনুযায়ী বেতন-ভাতা পাবেন।

ছ. সামাজিক ব্যবসা হবে আনন্দের সাথে ব্যবসা। 

সামাজিক ব্যবসার মূল কথা হচ্ছে যে সমাজে এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা হবে, সেই ব্যবসার মাধ্যমে ঐ সমাজের মানুষের কর্মী নিয়োগ করে তাঁদের জীবন মানের ও পরিবেশের উন্নয়ন সাধন করা। কিন্তু বাস্তবে কী হয় আসুন কয়েকটা বাস্তব উদাহরণ দিয়ে তার একটা চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করি। কোনো দেশের কোনো এলাকায় যে সম্পদ অব্যবহৃত থাকে যা মূল্যবান তার ব্যবহার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই সেখানে কোনো সামাজিক ব্যবসা শুরু করা হয়। সাধারণত করপোরেট সোশ্যাল রেস্পন্সিবিলিটি (সিএসআর) ফান্ড ব্যবহার করে ছোট, বড় মাঝারি বিদেশি কোম্পানি অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশে এই ব্যবসা শুরু করে। যদিও তাঁরা জানেন যে,মূলধন ছাড়া লভ্যাংশ ফেরত নেওয়া যাবে না। তবে, ‘সামাজিক ব্যবসা চাইলে মালিকেরা কিছুদিন পরে স্বাভাবিক ব্যবসায় রূপান্তরিত করতে পারবেন। অর্থাৎ তারা লাভ নিতে পারবেন, যদি চান। এটা তাদের মর্জির উপর নির্ভরশীল”। এই কথাটা মনে রাখলে পরে আলোচনায় সুবিধা হবে। আমাদের মত দেশের ‘নামী দামী মানুষেরা’ মেধাবী যুবকদের নিয়ে অনেক ওয়ার্কশপ করে করে নতুন নতুন সামাজিক সম্পদ চিহ্নিত করে তা ব্যবহার করে সামাজিক ব্যবসার সম্ভাবনার ধারণা নিয়ে থাকেন। সামাজিক সম্পদ চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলা যায় যে, ১৯৯৭ সালের ২৬শে মার্চের আগে বাংলাদেশের কয়জন জানতেন যে, বাংলাদেশ রেলওয়ের অপটিক্যাল ফাইবার দিয়ে রাতারাতি সারা দেশে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যায়?

যা হোক সামাজিক সম্পদে ভরপুর আমাদের মত বিশ্বের অনেক দেশ। অন্তত বাংলাদেশে সোনার চেয়ে দামী অনেক সম্পদ আছে যা এখনো অনেকেই চেনেন না বা চিনলেও তা ব্যবহারের আর্থিক সামর্থ্য নেই। আমাদের দেশের ‘নামী দামী মানুষেরা’ বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সম্পদ চিহ্নিত করার পরে বিদেশে গিয়ে ঐ ধরনের সামাজিক সম্পদ ব্যবহারকারী কোম্পানির সাথে ‘নামী দামী মানুষেরা’ নিজে বা তার সেদেশে অবস্থান করা প্রতিনিধির মাধ্যমে আলোচনা করেন, সামাজিক ব্যবসায় বিনিয়োগে আগ্রহী করে তোলেন।  বিদেশি কোম্পানিকে বলা হয় যে, ‘সামাজিক ব্যবসা চাইলে মালিকেরা কিছুদিন পরে স্বাভাবিক ব্যবসায় রূপান্তরিত করতে পারবেন। অর্থাৎ তারা লাভ নিতে পারবেন, যদি চান। এটা তাদের মর্জির উপর নির্ভরশীল। এতে করেই বিদেশি সম্ভাবনাময় ছোট, বড়, মাঝারি কোম্পানির কেউ কেউ আগ্রহী হয়ে ওঠেন, আমাদের মত দেশে বিনিয়োগে; পরিক্ষামূলক ভাবে সিএসআর ফান্ড দিয়ে। কারণ উন্নত দেশে সিএসআর ফান্ড মানব কল্যাণে খরচ বাধ্যতামূলক।                       

এর পরে শুরু হয় কোম্পানি গঠনের পালা লক্ষিত দেশে। এ ধরনের কোম্পানি গঠনের সাথে জড়িত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে একজন বলেন যে, সাধারণত, সামাজিক ব্যবসার জন্য বাংলাদেশে লিমিটেড কোম্পানি করা হয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জয়েন্ট স্টক থেকে রেজিস্ট্রেশন নিয়ে। এতে সাধারণত পরিচালক থাকেন ৬ থেকে ১০ জন। বিনিয়োগকারী কোম্পানি আর এদেশীয় ‘বড় মানুষের’ প্রতিনিধি আধা আধি ভাগ করে নেন পরিচালকের সংখ্যা, যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানির বিনিয়োগ ৯৫ থেকে ৯৯% আর যে দেশে কোম্পানি হবে তাঁদের মানে ‘নামী দামী মানুষদের’ বিনিয়োগ ১% থেকে ৫%, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটু বেশি।কিন্তু পরিচালকের সংখ্যা সমান সমান। ব্যবসার মুনাফা থেকে কর্মচারীর বেতন ভাতা বাদে মুনাফার একটা বড় অংশ খরচ হয় পরিচালকদের রেমুনারেশন বা ভাতা হিসেবে, যা আয়কর মুক্ত থাকে। সেখানে দেশি বিদেশি পরিচালক প্রায় সমান ভাতা পান, যদিও বিনিয়োগ শূন্য প্রায়। যিনি বিদেশি কোম্পানিকে ম্যানেজ করে নিয়ে আসেন তিনি তো পরিচালক হবেনই, সেটা মাস্ট। কোম্পানির সভায় যোগদানের জন্য বিদেশ থেকে পরিচালকদের আসা যাওয়ার সমস্ত খরচ বহন করা হয় কোম্পানির মুনাফা থেকে। ফলে মুখে বড় বড় কথা বললেও, কোম্পানির কর্মীদের কোনো লাভ হয় না, দেশের আর দশটা দপ্তরের কর্মীদের মত বেতন, সুবিধা পান। কিছুদিন পরে কোম্পানির লস হতে শুরু করলে (অনেক সময় ইচ্ছাকৃত) ‘সামাজিক ব্যবসা চাইলে মালিকেরা কিছুদিন পরে স্বাভাবিক ব্যবসায় রূপান্তরিত করতে পারবেন। অর্থাৎ তারা লাভ  নিতে পারবেন, যদি চান। এটা তাদের ‘মর্জির উপর নির্ভরশীল’ ধারা প্রয়োগ করা হয়।         

দুই একটা সম্ভাব্য উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। মনে করুন আমেরিকায় উচ্চ শিক্ষা নিচ্ছেন একজন। তিনি একটা কসমেটিক্স কোম্পানিতে ইন্টার্নিশিপ করতে গিয়ে দেখলেন যেখানে লিপস্টিকের ভিতর ব্যবহার করা হয় হাস মুরগির নখ ও ঠোঁটের গুড়া করা পাউডার, আঠা হিসেবে, অনেক দাম। দামী কোম্পানির লিপস্টিকে কেমিক্যাল গ্লু বা আঠা ব্যবহার করা হয় না কারণ দীর্ঘ ব্যবহারে তাতে ঠোঁটে ক্যান্সার হবার আশঙ্কা থাকে। বাংলাদেশে মুরগির নখ ও ঠোঁট ফেলে দেওয়া হয় আবর্জনা হিসেবে। বাংলাদেশে ‘বড় মানুষের’ মাধ্যমে ঐ কোম্পানিকে বাংলাদেশে এনে একটা হাঁস-মুরগীর স্লটার হাউজ খুলতে পারেন সামাজিক ব্যবসার নামে। যার বাই প্রোডাক্ট মুরগির নখ ও ঠোঁট কম দামে রপ্তানি হয় আমেরিকায় সেই কসমেটিক্স কোম্পানিতে। পালক দিয়ে তৈরি হয় বালিশ, লেপ, তোষক, ইত্যাদি।হাড়, নাড়ি-ভুরিও কাজে লাগে অন্য কাজে। কিছুই বাদ যায় না। বাই প্রডাক্ট নিয়েই অ্যামেরিকান কসমেটিক্স কোম্পানি মহা খুশি, অনেক লাভ। এখানেই অন্য কোম্পানির কাছে বিক্রি বা অন্য দেশে পাঠানোর সময় সে দেশের আমদানি নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের এইচএস কোডের নির্ধারিত মূল্যে প্রায় বিনামূল্য পাওয়া পণ্য রপ্তানি করে অনেক লাভ হয় বাংলাদেশের সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের। লভ্যাংশ থেকে বাংলাদেশের স্ট্যান্ডার্ডে কর্মীদের বেতন দেওয়া হয় আর বাকি বিরাট অংক খরচ হয় পরিচালকদের আরাম আয়েশের জন্য। ‘বড় মানুষের’ সুপারিশে যিনি বিনা পূঁজিতে সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হয়ে আয় করমুক্ত আয় করে আয়েশি জীবন যাপন করেন, সেই তিনি ‘বড় মানুষকে’ ভগবানের মত পূজা করবেন তাতে সন্দেহ আছে কি? বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন একাধিক বাংলাদেশি পাবেন যারা ঐরকম ‘বড় মানুষের’ দয়ায় কোনো না কোনো কোম্পানির পরিচালকের সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করছেন, আর আরও বেশি আর্থিক সুযোগ পাবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।      

আরেকটি সম্পদের কথা বলি। আমাদের দেশের উপকূলীয় এলাকায় আছে বিপুল পরিমাণ তেলাকূচা (Coccinia) গাছ জন্মায়। এই লতা জাতীয় গাছের পাতায় এক ধরনের তেল থাকে যা ওষুধ কোম্পানির ওষুধ তৈরির একটা দামী উপাদান। এটা দিয়ে অনেক দামী দামী ওষুধ তৈরি হয়। তেলাকূচার শুকনা পাতা থেকে একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় এর তেল আহরণ করা যায়। কিন্তু আমাদের দেশে এর তেমন কোন বাণিজ্যিক ব্যবহার নেই। এমন অনেক সম্পদের কথা আমরা জানি কিন্তু ব্যবহারের প্রযুক্তি বা সামর্থ্য আমাদের নেই।  

এমন অভিজ্ঞতার মানুষ আছেন যার কাছে এমন একাধিক সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্মের ইতিহাস জানা আছে। তিনি বা তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ জড়িত ছিলেন এমন ব্যবসা শুরুর সমস্যা সমাধানের সহায়তায়। আসলে বাংলাদেশের মতো অনেক দেশ পৃথিবীতে আছে যাদের আছে বিপুল অব্যবহৃত সম্পদ, আছে বিপুল মানব সম্পদ। অনুন্নত দেশের জলসম্পদের শোষণ, আর অব্যবহৃত সম্পদের সফিস্টিকেটেড লুটপাটের নতুন কৌশল কী এই সামাজিক ব্যবসা? এটা কি সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের আনন্দ বিনোদনের ব্যবসা? প্রশ্ন থেকেই যায়।                  

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

তথ্যঋণঃ ড. ইউনূসের লেখা, বিবিসি, উইকিপিডিয়া, ইন্টারনেট, অন্যান্য      

E-mail: arefinbhai59@gmail.com