ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৪ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ক্রমশই নিয়তিবাদী হচ্ছে বিএনপি?

আশিস সৈকত
প্রকাশিত: ১১ আগস্ট ২০১৮ শনিবার, ১০:০০ পিএম
ক্রমশই নিয়তিবাদী হচ্ছে বিএনপি?

বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই ক্রমশ এক ধরনের হতাশায় আক্রান্ত হতে থাকে বিএনপির নেতাকর্মীরা। যত দিন যেতে থাকে এ নৈরাশ্যবাদিতার মাত্রা বাড়তে থাকে, যা অচিরেই পরিণত হয় নিয়তিবাদীতায়। ফলে,সরকারের নানা স্তরে দুর্নীতি এবং বিভিন্ন গণদাবী বাস্তবায়নে গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলবার বদলে তারা যেন কোনো এক অজানা নিয়তির জন্য অপেক্ষা করতে থাকে, যে এসে আওয়ামী লীগকে সরিয়ে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে বিএনপিকে। গত ৯ বছর ধরে চলছে এ খেলা। ফলে আরেকটি জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও এখনো বিএনপি সিদ্ধান্ত পারছে না যে তারা নির্বাচনে যাবে কিনা?

এ নিয়তিবাদিতা এখন চূড়ান্তভাবে জেঁকে বসেছে বিএনপির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল, সব স্তরে। মাঠ পর্যায়ের বিএনপির যেকোনো নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বললে যে চিত্র পাওয়া যায়, তা হলো তাঁরা প্রায় সবাই বিশ্বাস করে বসে আছেন যে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলনের দরকার নেই। আওয়ামী লীগের কর্মফলের কারণেই নিয়তির বিধানে তাদেরকে একদিন ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হবে।

সেই নিয়তি বলতে তারা অনেকেই বাস্তবতা বিবর্জিত, সেনা হস্তক্ষেপের আশা করে বসে আছেন। ২০০৯ সালের দিকে তাঁদের মাঝে এ বিশ্বাস এত প্রবল হয়ে উঠেছিল যে কোনো কোনো কেন্দ্রীয় নেতাও সেসময় আবেগ চেপে রাখতে না পেরে বলে ফেলেছিলেন আরেকটি ১৫ই আগস্ট আসন্ন। এরই ফলশ্রুতিতে বিডিআর বিদ্রোহের সময় অনেক বিএনপি নেতাকর্মীর মাঝে একটা চাপা উল্লাস পরিলক্ষিত হয়।

এছাড়া বিএনপির অনেক সমর্থক মনে করেন হেফাজতের মতো চরম দক্ষিণপন্থার উত্থানেও সরকারের পতন ঘটতে পারে। এর বাইরে তাঁরা আশা করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এ ধরনের বাইরের চাপ। এমনকি কেউ কেউ এমন কল্পনার জগতে ডুব দিয়েছেন যে তাঁরা মনে করছেন যে ভারতের মোদি সরকারও ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে।

এ ধরনের নানা কাল্পনিক জগতে ডুবে থাকা মাঠ পর্যায়ের যেকোনো কর্মী সমর্থককে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় তাঁরা নিজেরা কেন আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন না, তাঁদের সবার কাছ থেকে সাধারণত যে উত্তরটি পাওয়া যায় তাহলে পুলিশ তাঁদের কোনো অবস্থাতেই রাস্তায় দাঁড়াতে দিচ্ছে না, পুলিশ প্রযুক্তিগত ভাবে অনেক উন্নত এখন, ফলে এ পুলিশের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে রাস্তায় আন্দোলন করা সম্ভব নয় ইত্যাদি। এছাড়া আন্দোলনে জেল, মামলা ইত্যাদির ভয়ও রয়েছে।

পুলিশের ভয়ে ভীত হয়ে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে নূন্যতম প্রতিবাদও জানাতে পারছে না বিএনপি। আর এ দাঁড়াতে না পারা থেকেই বিএনপি তার ভবিষ্যত নিয়তির হাতে ছেড়ে দিয়ে বসে আছে।

বস্তুত, ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বিএনপির রাজনীতি পরিচালিত হচ্ছে এ নিয়তিবাদের উপর নির্ভর করে। এ কারণেই দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হবার পরেও নূন্যতম আন্দোলন তো দূরের কথা, দেশের কোথাও তারা একটি বড় প্রতিবাদ মিছিল বা সমাবেশ করতে চায়নি বা পারেনি।

শুধু এবারই নয়, গত ওয়ান-ইলেভেনের সময় যখন বেগম জিয়া প্রথমবারের মত বন্দী হলেন তখনো দলের নেতাকর্মীদের নেত্রীর মুক্তির দাবিতে মিছিল, মিটিং করতে দেখা যায়নি। তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টাও দেখা যায়নি।

বরং, খালেদা জিয়াকে বন্দী রেখে সেসময় সাইফুর রহমান, আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া, মেজর (অব.) হাফিজের মত বাঘা বাঘা বিএনপি নেতারা উদ্যোগ নিয়েছিলেন বেগম জিয়াকে বহিষ্কার করে নতুনভাবে দল গড়ে তোলার। প্রয়াত খন্দকার দেলোয়ার হোসেনসহ কিছু কর্মী সমর্থক তখন দলকে টিকিয়ে রাখার সাহসী ভূমিকা না রাখলে বিএনপি আজকে যে অবস্থায় রয়েছে তাও থাকত কিনা সন্দেহ।

আওয়ামী লীগ, বিএনপির মত দলগুলোর কাছে যেহেতু আদর্শের চেয়ে ভোটের হিসাবটা মুখ্য তাই তারা সাধারণত নেতাকর্মীর সংখ্যা বাড়াবার হিসাবে বেশি ব্যস্ত থাকেন। খালেদা জিয়া হয়ত এ ভাবনা থেকেই ১/১১ এর হোতাদের সাথে যারা হাত মিলিয়েছিলেন তাঁদের অধিকাংশকে ক্ষমা করে দিয়ে দলে সক্রিয় হবার সুযোগ দিয়েছিলেন। বিএনপির জন্ম প্রক্রিয়া নিয়ে যে মিথটি তৈরি করা হয়েছে তাহল বিএনপি হলো সেনা- ছাউনি জাত দল। এ দল গঠনের মূল উদ্দেশ্য হল রাষ্ট্র কাঠামোয় সেনা আমলাতন্ত্রের স্বার্থ রক্ষা করা। অর্থাৎ, সেনা আমলাতন্ত্রের বেসামরিক মুখপাত্র হিসাবে কাজ করবার জন্য বিএনপি গঠন করা হয়েছে। বিভিন্ন দলের প্রচারণার ফলে জনগণের একটা বড় অংশের পাশাপাশি বিএনপি সমর্থকদের একটি অংশও এটি বিশ্বাস করেন। বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক গবেষকও বিএনপির জন্ম প্রক্রিয়াকে এভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন।

এ কথা সত্য যে জিয়াউর রহমান উর্দি পরে দল গঠন করেছিলেন এবং এ দল গঠন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র কাঠামোকে কাজে লাগিয়েছিলেন। তবে, এ দলটি গঠিত হয়েছিল ক্যান্টনমেন্টের বাইরে, সিভিলিয়ান এলাকায়। কিছু সেনা অফিসারের এ দল গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং সমর্থন থাকলেও পুরো সেনা ছাউনির সমর্থন জিয়া পাননি। বরং সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশই জিয়ার দল গঠন প্রক্রিয়ার বিরোধী ছিল।

কিন্তু ক্ষমতা দখল করে জিয়া একদিকে যেমন দ্রুত গোপন সামরিক বিচারের মাধ্যমে তাহেরকে ফাঁসী দিয়ে তাঁর নিজের ক্ষমতা সংহত করতে উদ্যোগ নেন, তেমনি পাশাপাশি, মুসলিম লীগের রাজনৈতিক চেতনাকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণার জন্ম দিয়ে। জিয়া বুঝতে পেরেছিলেন সেসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানাবিধ কারণে প্রবল অজনপ্রিয় আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিত্তিতে তিনি তাঁর রাজনীতিকে এগিয়ে নিতে পারবেন না।

ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী আওয়ামী লীগ এবং জাসদের প্রতি সহানুভূতি সম্পন্ন সেনা অফিসাররা জিয়ার হাত ধরে মুসলিম লীগ ধারার রাজনীতির পুনর্বাসনের বিরোধী ছিলেন। অপরদিকে, জিয়ার মতো মুসলিম লীগ বা ইসলামপন্থার রাজনীতিতে যারা বিশ্বাস করতেন তাঁদের একটা বড় অংশও জিয়ার রাজনৈতিক সাফল্যে ঈর্ষান্বিত ছিলেন। এর বড় প্রমাণ হলো একই ধারার রাজনীতিতে বিশ্বাসী হয়েও জেনারেল এরশাদ কর্তৃক পরবর্তীতে বিএনপি সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল।

শুরু থেকেই কারও উপর নির্ভর করে ক্ষমতা দখল বা আন্দোলন করবার ফলে এককভাবে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার সংস্কৃতি বিএনপিতে গড়ে ওঠেনি। তাই ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে জামায়াত তার যুদ্ধাপরাধী নেতৃত্বকে মুক্ত করবার জন্য আন্দোলন গড়ে তোলে যা পরবর্তীতে পেট্রোল বোমা নির্ভর সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে পরিণত হয়—বিএনপি নেতৃত্ব তার কর্মীদের নিয়ে এ আন্দোলনের অনুগামী হয়।

জনসমর্থন না থাকায় সরকার কঠোর হাতে পেট্রোল বোমা নির্ভর সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন দমন করে ফেলে। পাশাপাশি, যুদ্ধাপরাধী নেতৃত্বের অনেকের ফাঁসি হয়ে যাওয়ায় এবং সরকারের দমন নীতির ফলে জামায়াত সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পরায় আন্দোলন থেকে দূরে সরে যায়। এমতাবস্থায়, খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হলে নিয়িতিবাদ নির্ভর বিএনপি নেতৃত্ব অনেকটাই নিয়তি নির্ভর হয়ে পড়েছে।

প্রতিষ্ঠা হবার পর থেকে গত ৪০ বছরে বিএনপি এখন তার দলীয় ইতিহাসে সবচেয়ে সংকটময় সময় অতিক্রম করছে। এমতাবস্থায়, বিএনপি যদি নিয়তির উপর নির্ভর করে থেকে মাঠের আন্দোলন (সন্ত্রাস নয়) গড়ে তুলতে না পারে এবং সংকট উত্তরণের জন্য শুধুমাত্র আইনি লড়াই ও ফেসবুক অ্যাক্টিভিজমের উপর নির্ভর করে তাহলে অদূর ভবিষ্যতে দলটির পরিণতি নিয়ে শঙ্কা জাগাই স্বাভাবিক। এটাই বিএনপির জন্য এখন বড় বিপদ।

 লেখক: সাংবাদিক

বাংলা ইনসাইডার/জেডএ