ঢাকা, শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ঈদে প্রধানমন্ত্রীর উপহার

আশিস সৈকত
প্রকাশিত: ২০ আগস্ট ২০১৮ সোমবার, ০৮:০১ এএম
ঈদে প্রধানমন্ত্রীর উপহার

অবশেষে ঈদের আগেই মুক্তি পেলেন নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের সময় আটক শিক্ষার্থীরা। প্রথম দিকে এ আন্দোলনটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা ভিন্ন রূপ নিতে শুরু করে। আন্দোলন মোড় নেয় সরকার বিরোধী আন্দোলনে। এরপরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে এ নিয়ে উদ্যোগী হয়েছেন।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের উপর যেন কোনো ধরনের নির্যাতন না হয় সেজন্য প্রথম থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। আর শেষ পর্যন্ত বড় কোনো অভিযোগ না থাকলে গ্রেফতারকৃত শিক্ষার্থীদের জামিনও দিতে বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে শেষ পর্যন্ত ঈদের আগেই তারা মুক্তি পেয়েছেন। এটিকে ঈদে প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসাবে দেখছেন মুক্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা।

দেশে রাজনৈতিক আন্দোলন অনেকটা বন্ধ অনেক দিন। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের নানা রকম তৎপরতা আছে, তবে রাজনীতি নেই। বিরোধী দলের স্বনামধন্য নেতাদের কেউ বার্ধক্যজনিত অবসরে, কেউ সংবাদপত্রে মস্ত মস্ত কলাম লেখায় মগ্ন, কেউবা শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত।

গত ৬ মাসে যে দুটি আন্দোলন হয়েছে, তার প্রকৃতি ভিন্ন। তারপরও কোটা সংস্কারের আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ। আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলার পর তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তা শান্ত করাও কঠিন হতো না। নিরাপদ সড়কের দাবিতে কিশোর-কিশোরীদের কথিত আন্দোলনটি ছিল একেবারেই নির্দোষ আন্দোলন। বাসের চাপায় বন্ধুদের মৃত্যুতে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল তারা শোক ও সমবেদনা জানাতে।

প্রথমে শুরু করলে ও শেষ পর্যন্ত সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে যে এখন যে আন্দোলনটি ছিল না তা বলাই বাহুল্য। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের  ৪৭ বছরের ইতিহাসে ট্রাফিক পুলিশ ও যোগাযোগ প্রশাসন যে কাজটি করতে পারেনি তা করে দেখিয়েছে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া তরুণরা। আমরা রাস্তাঘাটে দেখেছি লেন মেনে লাইন দিয়ে বাস-ট্রাক, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, রিকশাসহ সব ধরনের যান। অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি কাজে নিয়োজিত যানের জন্য তারা ব্যবস্থা করেছে ইমার্জেন্সি লেন। এর ফলে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারছে এই সমস্ত যানবাহনগুলো। কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীরা ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে গাড়ি ও ড্রাইভারের লাইসেন্স চেক বা পরীক্ষা করছে। এক শিক্ষার্থী নিজের বাবার গাড়ির লাইসেন্স চেক করে বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাদের নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের দৃঢ়তা ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে সত্যিই আশান্বিত হতে হয়। তারা খুব দক্ষতার সঙ্গে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা করেছে। কোনো ন্যায় দাবি আদায়ে কীভাবে আন্দোলন করতে হয় তা তারা সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না এই আন্দোলন শুরুতে এটি শুধু সাদা-কালো রঙে রঙিন থাকলেও আস্তে আস্তে তা নানা রঙে রঙিন হয়েছে। এই আন্দোলনে লেগেছিল রাজনীতি, দলীয় স্বার্থ, গোষ্ঠী স্বার্থের রঙ। যা একটা ইতিহাস সৃষ্টিকারী সৃজনশীল আন্দোলনকে বিতর্কিত করে তুলে। তারা তাদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে চালিয়ে গেলেও এটা দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। কারণ যখন সচিব-আমলা, পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনী ছেলে-মেয়েদের কাছে তাদের লাইসেন্স কেন্দ্রিক অনিয়মের জন্য ধরাশায়ী হচ্ছে; তখন তারা অপমানের পাশাপাশি অসহায়ত্ব দেখিয়েছে। তবু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সবাই শান্তভাবে আন্দোলন মোকাবেলার চেষ্টা করেছে।

সরকারে, প্রশাসনে ও পুলিশে যাঁরা আছেন, তাঁরা সবাই সন্তানের মা-বাবা অথবা কোনো শিক্ষার্থীর অভিভাবক। আমাদের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা উচ্চশিক্ষা নিতে এগিয়ে এসেছে, যা জাতির উন্নতির লক্ষণ। কত যে কষ্ট করে তারা লেখাপড়া শিখছে, তা কারও অজানা নয়। উচ্চশিক্ষা নিয়ে তারা পরিবারের এবং দেশের উপকার করবে, সেটাই প্রত্যাশা।

এসব কৈশোর-উত্তীর্ণ ছেলেমেয়েদের ভুল বা অপরাধ ক্ষমা-সুন্দর দৃষ্টিতে দেখাই হয়ত মানবিক রাষ্ট্রের কর্তব্য। যদিও আইনে আবেগের কোন স্থান নেই। কিন্তু সবাই কি আর মানবিকতাকে উপেক্ষা করতে পারেন। পারেন না অনেকেই।

আর সম্ভবত সেই মানবিক দৃষ্টিতেই প্রধানমন্ত্রী তাদের মুক্তি দেওয়ার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছেন। ঈদের আগেই তারা মুক্তি পেয়েছেন। কারণ স্বজন ছাড়া ঈদ করার বেদনা তাঁর মত আর কে জানে?

লেখক: সাংবাদিক

 

বাংলা ইনসাইডর/জেডএ