ঢাকা, শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

মৃত্যুর মিছিল এবং প্রধানমন্ত্রী

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট ২০১৮ শনিবার, ০৯:০০ পিএম
মৃত্যুর মিছিল এবং প্রধানমন্ত্রী

ঈদের ছুটি শেষ, কর্মজীবী মানুষের ঢাকায় ফেরার পালা শুরু হয়ে গেছে। শুরু হয়েছে মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল। আবার ঢাকা মহানগরীর মানুষ যানজটে নাকাল হবে, কোটি কোটি টাকার কর্মঘণ্টা নষ্ট হবে, আবার কেউ হয়তো হারাবে প্রাণ নগরীর রাস্তায়। ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে শিশুদের অভাবনীয় আন্দোলনের পরে এবং সেই আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে আন্দোলনের আগুনে কেউ কেউ ‘আলু পুড়িয়ে খাওয়ার চেষ্টা’ করলেও দেশবাসী আর সংশ্লিষ্ট সকল সরকারী সংস্থা একটা ক্লিয়ার ম্যাসেজ পেয়েছে। কিন্তু পরিবহন মালিক-শ্রমিক আর নগরবাসীর মনে শিশুদের আন্দোলনের ফলে কোনো স্থায়ী দাগ কেটেছে বলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় না।

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির কারণে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ-সংলগ্ন পথচারী আন্ডারপাস নির্মাণকাজের উদ্বোধনকালে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘যত দিন শিক্ষার্থীরা রাস্তায় ছিল, তারা ট্রাফিক কন্ট্রোল করছিল এবং সবাই তাদের কথা মেনে নিয়েছিল, এটা ঠিক। কিন্তু যখনই সবাই ফিরে গেল, স্বাভাবিক হলো যানবাহন চলাচল, তারপর কী দেখি? রাস্তার পাশেই ফুটওভার ব্রিজ, আমরা দেখলাম, ইয়ং ছেলেমেয়ে সামান্য কয়েক কদম হাঁটলে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করতে পারে, সেটা না করে রাস্তার মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে হাত দেখিয়ে দেখিয়ে’। প্রধানমন্ত্রী ‘ইয়ং ছেলেমেয়ে’ কথাটা এজন্য মনে হয় উল্লেখ করেছেন যে আমাদের নগরীতে শারীরিকভাবে পঙ্গু বা অসুস্থ্য, গর্ভবতী মা কিংবা বয়স্কদের রাস্তা পারাপারের উপযোগী কোনো অবকাঠামো আমাদের তৈরি করা সম্ভব হয়নি। আর্থিক ও অন্যান্য দৈন্যতায়। তাই ‘ইয়ং ছেলে-মেয়েদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা বেশি, এ ব্যাপারে তারা হতে পারে আমাদের পথ প্রদর্শক, যেমনটি করেছে শিশুরা, সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেছেন, এটা আমাদের সমাজের অপসংস্কৃতি, নৈতিক শিক্ষার অভাবের ফল। এর থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা থাকতে হবে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের আন্তরিকতা থাকতে হবে, আন্তরিক হতে হবে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের, নগর ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ব্যক্তি সেই সঙ্গে পরিকল্পনাবিদগণের। সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিতে করণীয় নিয়েও ভাবতে হবে আমাদের। নিজের জানমালের নিরাপত্তায় করণীয় কী কী, তা কি আমাদের পরিবারে, স্কুলে বা শিক্ষালয়ে শেখানো হয়? এটা জরুরি কিনা, তাও ভাব্বার সময় এসেছে। নিরাপদ সড়ক নিয়ে দীর্ঘ সংগ্রামেরত চিত্র নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের একটা ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে। যাতে দেখা যাচ্ছে যে, মানুষ রঙ সাইড দিয়ে যেনতেন উপায়ে গন্তব্যে যাবার প্রতিযোগিতায় নেমে সৃষ্টি করছে যানজট, নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি শ্রমঘণ্টা। কিন্তু তাঁদের ভিতর কোনো অপরাধ বোধ নেই। বয়েজ স্কাউটের ছেলেরা ঈদের আগে পুলিশের সহযোগী হয়ে ঢাকার রাস্তায় ছিল, তারাও খুব হতাশা প্রকাশ করেছে সাধারণ মানুষের সড়ক ব্যবহারের নৈতিকতা দেখে।       

কেউ বলতে পারে না সড়কে মৃত্যুর মিছিল কবে শেষ হবে। ঈদ শেষে ঢাকায় ফেরার পালা শুরু হয়েছে কর্মজীবী মানুষের। শুধু নগর পরিকল্পনাবিদগণই নন, নগরীতে বসবাসকারীদের মনেও মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়কের পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিবিসি’র খবরে জানা যায় যে, বাংলাদেশের বিভিন্ন মহাসড়কের মোট ২০৮টি স্থানকে দুর্ঘটনাপ্রবণ বলে এক গবেষণায় চিহ্নিত করেছে দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। অন্য একটি সূত্রে জানায়, শুধু বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের পটুয়াখালীর শাখারিয়া থেকে বরগুনার আমতলী উপজেলার বান্দ্রা পর্যন্ত ১৭টি বাঁকে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। মহাসড়কের এই অংশে ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৪৫ জনের প্রাণ ঝরেছে। এমন মরণ ফাঁদ সারা দেশের সব মহাসড়কেই আছে। অথচ এসব বাঁককে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করার কথা থাকলেও তা পর্যাপ্তভাবে নেই। রাস্তার বিভিন্ন স্থানে যে স্প্রিড ব্রেকার আছে সেটার ব্যবস্থাপনাতেও মনোযোগ নেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্তাদের। স্প্রিড ব্রেকারে সারাবছর সাদা রঙ দেওয়া থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে থাকে না, তাই নতুন চালকগণ তা বুঝতে পারেন না। তাই ঈদের সময় অতিরিক্ত যাত্রী চাহিদা মেটাতে নতুন কোনো চালক, যত ভালোই হোক না কেন, মহাসড়কে প্রায় দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। কোনো কোনো সময় মহাসড়কে চলার উপযোগী নয় এমন গাড়িও ঈদের সময় রাস্তায় নামানো হয়, যা দুর্ঘটনার আরেকটি কারণ। বিশেষ করে ঈদের সময় এটা টের পাওয়া যায় হাড়ে হাড়ে। কারণ আমাদের মতো দেশে জীবন নিয়েই চলে বাণিজ্য। অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকা মফস্বলের প্রিয়জনদের আনন্দ বিষাদে রূপ নেয় মৃত্যুর মিছিলে, ঢাকায় ফেরাতেও প্রায় একই চিত্র, তবে কম।

সড়ক দুর্ঘটনায় আমাদের চেয়ে হয়তো কোনো কোনো দেশে অনেক বেশি প্রাণহানি ঘটে কিন্তু তার কারণ কিন্তু ভিন্ন। অতিরিক্ত জোরে গাড়ি চালানো, যান্ত্রিক ত্রুটি, যান্ত্রিক যানের লেনে অযান্ত্রিক যান এসে পড়া বা অন্যায় করে লেন পরিবর্তন, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের দেশের মতো রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে কারো প্রাণ যায় না। এক জরিপে দেখা যায়, রাজধানীতে ৯১ শতাংশ চালক জেব্রা ক্রসিংয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পথচারীদের আমলেই নেয় না। পাশাপাশি ৮৫ ভাগ পথচারী নিয়ম ভেঙ্গে রাস্তা পার হয়। তাছাড়া আরেক সমীক্ষায় বলা হয়, ঢাকা শহরের ৮৪ শতাংশ রিকশাচালক ট্রাফিক আইন ও নিয়ম সম্পর্কে অজ্ঞ। রিকশা আরোহী শিক্ষিত ভদ্র মানুষ রিকশাচালককে আইন অবজ্ঞা থেকে বিরত থাকতে বলে না, হয় চুপ থাকে না হয় আইন ভাঙ্গতে রিকশাচালককে উৎসাহিত করেন। একই চিত্র, প্রাইভেট যানবাহন ব্যবহারকারীদের বেলায়ও ঘটে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে অহরহ। গাড়ির চালকরা গাড়ি চালানোর সময় ফোনে কথা বলে, গান শোনে। ফলে অসতর্ক হয়ে পড়েন। এতে করে গাড়ি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এছাড়া ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক, সড়কের ওপর অবৈধ হাটবাজার, অবৈধ স্থাপনা, বিকল্প রাস্তার ব্যবহার না করে যখন-তখন রাস্তা খোঁড়াখুড়ি, যানবাহনে ব্যবহৃত তেলে ভেজাল এবং রাস্তার মধ্যে প্রয়োজনীয় ডিভাইডার না থাকা প্রভৃতির কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। নগর পরিকল্পনাবিদগণ পর্যাপ্ত সড়কের প্রভিশন না রেখেই নগরায়নের অনুমোদন দেন, মহাসড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ না করাও দুর্ঘটনার আরেকটি অন্যতম কারণ। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর হিসাব মতে আন্তর্জাতিকভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৫২০ বিলিয়ন ডলার। উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশে এর পরিমাণ ৬৫ বিলিয়ন ডলার।

নগরীতে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর কথা মনে হলেই শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা কানে বাজে। সুষ্ঠু সড়ক ব্যবস্থাপনায়, জনগণের জানমাল রক্ষায় গণপরিবহন সংশ্লিষ্ট সরকারী বেসরকারী দপ্তরগুলো, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের দায়িত্ব কি কিছুই নেই! দেশের সব সেক্টরের সব কাজ কি আমাদের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রীকে একাই করতে হবে! নাগরিক অধিকার সচেতন আমরা নানা দেশের উদাহরণ টানি কথায় কথায়, বিভিন্ন ঘটনায় তুলনা করি। কিন্তু তুল্য সব দেশের নাগরিকদের মতো আমাদের কি কোনো দায়িত্ব আছে, না নেই! আমরা নাগরিক দায়িত্ব কতটুকু পালন করি!

লেখক: উন্নয়ন কর্মী ও কলামিস্ট

 

বাংলা ইনসাইডর