ঢাকা, শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ব্যবসায়ীরা বেশি হলে সংসদের মান কি হবে?

প্রণব সাহা
প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সোমবার, ১০:০০ পিএম
ব্যবসায়ীরা বেশি হলে সংসদের মান কি হবে?

এবছর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বছর। আর আগামী ২৯ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদের ৫ বছরের মেয়াদ পূর্ণ হবে। কিন্তু বলতেই হচ্ছে যে, যখন আমরা আগামী সংসদ নির্বাচনের জন্য নানারকম তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করবো, তখন আমাদের কাছে চলতি দশম সংসদ নির্বাচনের ফলাফল খুব বেশি বিবেচ্য হচ্ছে না। কারণ, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নবম জাতীয় নির্বাচনে দেশের বড় একটি দল বিএনপি অংশ নেয়নি। যদিও এখনো নিশ্চিত করে বলা যাবে না যে এ বছরের শেষার্ধে অনুষ্ঠেয় ভোটে দেশের সব বড় দল অংশ নিবে কিনা? আসলে জাতীয় সংসদের গুণগত মান নিয়ে আলোচনা করতে চাইলে দরকার নির্বাচন নিয়ে কথা বলা। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে। সর্বশেষ আমরা দেখলাম খুলনার একটি উপনির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ নির্বাচিত হলেন বর্তমান ব্যবসায়ী ও সাবেক তারকা ফুটবলার সালাম মুর্শেদী।

জাতীয় সংসদ সকল রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হবে এটা আলোচনার জন্য যত ভালো, তার বাস্তবতা ততটাই সুদূরপরাহত। এটা হতাশার কথা নয়। কারণ ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পর জাতীয় সংসদ সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে উঠবে এমনটা আশা করা হলেও ২০১৮ সালে এসে নিশ্চয় সবাই একমত হবেন যে তেমনটি হয়নি। বরং সংসদ বর্জন এবং সর্বশেষ নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে দেশর রাজনীতিতে যে অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তা আগামী নির্বাচনে কতটা কাটবে, তা এখন এক বড় প্রশ্ন।

সংসদ যে গুণগত মান হারিয়েছে, তার মূল তিনটি কারণ হিসেবে বলা যায় যে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংসদের ভেতরে আইন প্রণয়ন ও এলাকার জনগণের নানা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় যেমন তুলে ধরা হচ্ছে না, তেমন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয় আলোচিত হচ্ছে না আবার, সংসদে পাশ হওয়া আইন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হচ্ছে খুবই কম। ২০১১ সালে টিআইবির দুটি গবেষণা থেকে বলা যায় যে, সংসদ তার কাছে দেশবাসীর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না, মোটাদাগের তিনটি কারণে। এই তিনটি কারণ হচ্ছে ১. বেশিরভাগ সদস্য নিয়মিত সংসদে উপস্থিত থাকেন না। ২. আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সাংসদদের অংশগ্রহণ খুবই কম, এ ব্যাপারে তারা আগ্রহ পান না। সংসদ যে সরকারের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে, সে সম্পর্কে ধারনা যেমন কম, তেমনি সুযোগও সীমিত। ২০১২ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে  সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন আইন বহির্ভূত কর্মকাণ্ড, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়ম এবং এসব ব্যাপারে ব্যবস্থা না নেওয়ায় আইন প্রণেতাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হচ্ছে না। ফলে সংসদ সদস্যদের সম্পর্কে এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব দ্রুত শক্ত ভিত পাচ্ছে। আর এর অন্যতম কারণ যে স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যারা নেতা হয়েছেন, তাদের চেয়ে মনোনয়ন দেওয়ার সময় দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে প্রাধান্য পাচ্ছেন ব্যবসায়ী এবং সাবেক আমলারা।

নবম জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সদস্যদের পেশাগত অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বেশিরভাগ নির্বাচিত সাংসদ তাদের পেশা হিসেবে ব্যবসাকেই উল্লেখ করেছেন। তথ্য বলছে নবম সংসদে আওয়ামী লীগের ২৩৫ জন সাংসদের মধ্যে ১২১ জন ব্যবসায়ী, ৬১ জন পেশাজীবী, ২২ জন কৃষিজীবী, দুজন গৃহিনী এবং ২৯ জন অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত। আর ঐ সংসদের বিরোধীদল বিএনপির ৩০ জন সাংসদের মধ্যে ১৮ জন ব্যবসায়ী ৭জন বিভিন্ন পেশায় এবং ৫জন কৃষিজীবী আছেন। নবম সংসদে জাতীয় পার্টির সাংসদ ছিলেন ২৫ জন। এদের মধ্যে ১৪ জন ব্যবসায়ী,৬ জন পেশাজীবী ২ জন কৃষিজীবী এবং ৩জন বিভিন্ন পেশাজীবী ছিলেন। অন্যান্য দলের ১০ জনের মধ্যে ব্যবসায়ী ৩ আর বিভিন্ন পেশার ৭জন  ছিলেন। দেখা যাচ্ছে ৩০০ জন নির্বাচিত সাংসদের মধ্যে ১৫৬ জনই ব্যবসায়ী।

প্রশ্ন হলো রাজনীতিবিদরা ব্যবসা করলে অসুবিধা কি? বা ব্যবসায়ীরা রাজনীতিতে আসলে কেন আপত্তি উঠবে? এসব প্রশ্নের জুতসই জবাব পেতে অনেক আলোচনা বা গবেষণার দরকার। আমি শুধু দুটি উদাহরণ দিতে চাই।  দেশের একজন বড় ব্যবসায়ী সাবের হোসেন চৌধুরী ১৯৯৬ সালে মাত্র কয়েকদিন রাজনীতি করে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে। এরপর উপমন্ত্রীও হয়েছিলেন প্রথমবার সাংসদ হয়েই। এরপর তিনি আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক সচিবের পদও পেয়েছিলেন। সর্বশেষ তিনি দ্বিতীয়বারের মত সাংসদ হয়ে সারাবিশ্বের সাংসদদের সংগঠন আইপিইউ-এর মত ঐতিহ্যবাহী মর্যাদাবান প্রতিষ্ঠানের সভাপতির পদ অলংকৃত করেছেন। আবার মহিউদ্দীন খান আলমগীর প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের ডাকসাইটে আমলা ছিলেন। কিন্তু সিভিল সার্ভিস থেকে বিদায় নিয়ে তিনি প্রথমে প্রতিমন্ত্রী হন। এরপর আওয়ামী লীগের মনোনয়নে প্রথমে সাংসদ এবং পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর পদ পান। দেশের প্রাচীন দল আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যও হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আমলা থেকে রাজনীতিক এবং সর্বশেষ ব্যবসায়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন মহিউদ্দীন খান আলমগীর। তিনি ফারমার্স ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে ব্যাংক ব্যবসায়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু ফারমার্স ব্যাংকের নানা অব্যবস্থাপনার কারণে তিনি নিজে থেকেই পদত্যাগ করেন। সংসদে তার সম্পদের হিসাব নিয়ে বিজেপির সাংসদ আন্দালিব রহমান পার্থ প্রশ্ন তুলেছিলেন কীভাবে মহিউদ্দিন খান আলমগীর ব্যাংকের পরিচালক হলেন?

দুটি উদাহরণ এজন্য দিলাম যে একজন মানুষ তার পেশা বদলাতে পারেন বা যে কোনো পেশায় থেকে রাজনীতিতে যোগ দিতেই পারেন। আসলে দেখতে হবে জনপ্রতিনিধি হিসেবে সাংসদের কর্মকাণ্ড। কারণ ইয়াবা ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত থাকার পরও কেউ যদি সাংসদ নির্বাচিত হন, বা কোনো একজন সাংসদ এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করার পরও যদি দলের মনোনয়ন পেয়ে যান তাহলে নিরুপায় ভোটারের কি করার আছে? আমাদের তো ‘রিকল’ পদ্ধতি নাই। অথবা দল যখন কাউকে মনোনয়ন দেন তখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিবেচনায় কি থাকে? কিন্তু একথা বলাই যায় যে এখন যখন আমরা আমরা আগামী নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থিতার ওপর নানারকম জরিপ বা প্রতিবেদন তৈরি করছি তখন কিন্তু সাধারণ মানুষতো বটেই, বড় দলগুলোর তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা কিন্তু স্থানীয় রাজনীতিক বা গণমানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আছে, এমন রাজনীতিকদেরই মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানান। ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ প্রার্থী নিয়ে তাদের জোরালো আপত্তি আছে। আর পোঁড় খাওয়া পেশাদার রাজনীতিবিদের সংখ্যা সংসদে কমে যাওয়াই কিন্তু সংসদের গুণগত মান কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। নবম সংসদ নির্বাচনের আগে দেওয়া নিজ নিজ নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই প্রধান দলই জাতীয় সংসদকে কার্যকর করার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দেশের ভোটার, যারা মাত্র একদিনের জন্য ক্ষমতা পান তাদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাজনীতিবিদরা যথার্থভাবে পালন করবেন এটাই আমজনতার চাওয়া।


লেখক: সাংবাদিক