ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তের পর কেন আন্দোলনের ঘোষণা

আশিস সৈকত
প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সোমবার, ১০:১০ পিএম
কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তের পর কেন আন্দোলনের ঘোষণা

অবশেষে নবম থেকে ১৩ তম গ্রেডের (প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি) সরকারি চাকরিতে কোনো কোটা না রাখার সুপারিশ করেছে সরকার গঠিত কমিটি। এ সংক্রান্ত কমিটির প্রতিবেদন সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে জমা দিয়েছে কমিটি। কমিটি নবম থেকে ১৩ তম গ্রেডের সব পদে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের সুপারিশ করেছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুসারে কোটা পদ্ধতি বাতিল হয়ে যাচ্ছে।

এখন শুধু বিসিএস পরীক্ষায় নয়, দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রেও কোটা পদ্ধতি বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। এখন মন্ত্রিসভার পরবর্তী বৈঠকেই কোটা বাতিলের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। ফলে আন্দোলনকারীদের চাওয়ার চেয়ে পাওয়া বেশি হয়েছে।

কিন্তু কোটা বাতিলের চূড়ান্ত পথে যখন সরকার সেই মুহূর্তেও কোটা আন্দোলনকারীরা থামছে না। বরং তারা নতুন করে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। যা আন্দোলনের  নামে আরেক অশুভ যাত্রার ইঙ্গিত বহন করছে।

সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি পর্যালোচনা, সংস্কার বা বাতিলের বিষয়ে করা কমিটির প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম জানিয়েছেন, এখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। পরবর্তী মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়তো আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে হবে। মন্ত্রিসভা পাস করলে প্রজ্ঞাপন জারি হবে।

এর আগে গত জুনে কোটা সংস্কার আন্দোলন ইস্যুতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা জানি, বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশই আসেন নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে। তাঁদের অনেকেই শাসক শ্রেণির পর্যায়ে নিজেদের উত্তীর্ণ করা বা ধনীক শ্রেণির অন্তর্গত হবার স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ধনীক শ্রেণির  পর্যায়ে নিজেদের উন্নীত করতে পারাটা কঠিন হলেও বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত হবার স্বপ্ন তাদের একটা বড় অংশের মাঝেই দানা বাঁধে।

আর বর্তমানে প্রচলিত ৫৬ শতাংশ কোটাকে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থীরা তাদের এ স্বপ্ন পূরণের প্রধান অন্তরায় হিসাবে মনে করছেন। দীর্ঘদিন ধরে একটা অসন্তোষ চলছিল ।

যদিও স্বপ্ন পূরণের মূল অন্তরায় খুব অল্প সংখ্যক পদের জন্য বিপুল পরিমাণ পরীক্ষার্থীর অংশগ্রহণ। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় ৩৬তম বিসিএস এর প্রার্থী সংখ্যা ছিল ২ লাখ ২১ হাজার ৩২৬ জন। চূড়ান্ত ফলাফলে ২ হাজার ৩২৩ জনকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগের সুপারিশ করেছে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)।

স্বপ্ন পূরণ না হবার এ অসন্তোষ থেকে শিক্ষার্থীরা ধরে নিলো এ কোটা ব্যবস্থা বাতিল বা সংস্কার হলেই হয়ত তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ খুলে যাবে। অনেকে কোটা ব্যবস্থা একেবারে তুলে দেবার পক্ষপাতী হলেও অনেকটা চক্ষু লজ্জার খাতিরেই যেন বলা হল কোটা ব্যবস্থার সংস্কার করে ৫৬ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। যদিও এ ১০ শতাংশের বণ্টন কিভাবে হবে আন্দোলনকারীরা এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো রূপরেখা দিতে পারে নাই।

তাহলে দেখা যাচ্ছে আন্দোলনকারীদের, যাদের পিছনে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর সমর্থন রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, তাঁদের ক্ষোভটা গিয়ে পড়েছে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান/দৌহিত্রদের জন্য বরাদ্দ ৩০ শতাংশ, নারী কোটা ১০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, আদিবাসী (সংবিধানে যাদের খুব অদ্ভুত কারণে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বলা হয়েছে) পাঁচ শতাংশ আর প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ এক শতাংশ কোটার ওপর। অর্থাৎ এ আন্দোলনের লক্ষ্য হলো উপরে উল্লেখিতরা যাতে কোনো বিশেষ সুবিধা পেয়ে বিসিএস ক্যাডার হতে না পারেন। এ ব্যবস্থার নিরসনকে তারা বৈষম্যের অবসান বলতে চাচ্ছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস দেখলে দেখা যাবে, অতীতে কখনোই সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন সেখানে জনপ্রিয় হতে পারে নাই। এটি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ইউনিক বৈশিষ্ট্য, যা এখন আর বজায় নেই। মূলগতভাবে, অতীতের সমস্ত আন্দোলন ছিল নিপীড়নমূলক আইন, প্রথা, বৈষম্য ও প্রতিষ্ঠান বিরোধী এবং সে বিবেচনায় প্রগতিশীল।

কিন্তু অতীতের সবগুলো আন্দোলন যেখানে ছিল জাতি এবং দেশকে কিছু দেবার, সেখানে এ কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল নিজেরা কিছু পাবার এবং তাও আবার কাউকে কাউকে বঞ্চিত করে। তাই এ আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল শুধু কোটা সংস্কারের দাবিতে, আমলাতন্ত্রের সংস্কারের প্রশ্ন সেখানে আসে নাই।

দীর্ঘ আন্দোলনের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটা দ্রুত উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের বিপরীতে যাওয়া কোনো শুভ পদক্ষেপ হবে না, বিশেষত যখন দেখতে পেলেন তার দলের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ থেকে কেউ কেউ পদত্যাগ করে আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছেন।

যদিও আন্দোলন ছিল কোটা সংস্কারের, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে পুরো কোটা বাতিল করে দেবার ঘোষণা দেন।

কোটা বাতিলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুসারে সচিব কমিটি যখন কোটা বাতিলের চূড়ান্ত প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কাছে দিয়েছেন তখন আবার কার স্বার্থে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আন্দোলনের ঘোষণা? সাধারণ ছাত্রছাত্রী যারা এ আন্দোলনের সূচনা করেছিল তারা এসব সস্তা কর্মসূচিতে থাকবে বলে মনে হয় না। কারণ এ ধরনের হটকারি সিদ্ধান্ত ভাল আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে বাধ্য।


লেখক: সাংবাদিক

বাংলা ইনসাইডার/জেডএ