ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ফিরে এসেছে গুম কৌশল

নিনা এল. ক্রুশ্চেভা
প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর ২০১৮ সোমবার, ০১:৫৫ পিএম
ফিরে এসেছে গুম কৌশল

চীন থেকে সৌদি আরব, বর্তমান বিশ্বের আধিপত্যবাদী শাসকগোষ্ঠী হঠাৎ করেই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কিংবা সুপরিচিত ব্যক্তিদের অপহরণ বা হত্যা করতে শুরু করেছে। এটি বিরোধীদের কন্ঠরোধ করার একটি পুরনো ও বর্বরোচিত এক কৌশল। যারা এই ধারাটিকে আবারও ফিরিয়ে এনেছে, তাদের এই কাজের জন্য একসময় আফসোসও করতে হতে পারে।

গত শতাব্দীর ৭০’র দশকে আর্জেন্টিনা ও চিলিতে সামরিক শাসনামলে বিরোধীদের হত্যা ও গুমের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ৮০’র দশকে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে জোসেফ স্ট্যালিনের সময়েও ভিন্নমত পোষণকারীদের গুম করা হতো। সাম্প্রতিককালে সেই পুরনো পন্থা বিশ্বব্যাপী আবারও ফিরে এসেছে।

চিলি এবং আর্জেন্টিনায় সামরিক শাসনামলে মানুষকে হেলিকপ্টার থেকে সমুদ্রে ছুড়ে ফেলা হতো, যাদের আর কখনোই খুঁজে পাওয়া যেত না। প্রতিবাদকারীদের হত্যা করে মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলা হতো, তাঁদের সমাধিটাও আর পাওয়া যেত না।

সোভিয়েত ইউনিয়নে স্ট্যালিনের সময়ে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে কেউ আওয়াজ তুললে তাঁকে কেজিবি সদর দপ্তরে কিংবা অন্য কোনো গোপন স্থানে নিয়ে যাওয়া হতো। রাতের আঁধারে অপহরণ করা হতো অনেককে। ১৯৩০ এর দশকে এবং তার পরেও লাখ লাখ সোভিয়েত নাগরিক কারাগার বা অন্য কোনো জায়গা থেকে চিরতরে অদৃশ্য হয়ে গেছেন। আধুনিক কর্তৃত্ববাদী শাসকগোষ্ঠী আবারও বিরোধীদের মুখ বন্ধ করার পুরনো কৌশল ফিরিয়ে এনেছেন।

গত মাসে বেইজিং থেকে নিখোঁজ হন ইন্টারপোল প্রেসিডেন্ট মেং হংওয়ে। চীনের নাগরিক মেং প্যারিস থেকে বেইজিং পৌঁছানোর পর থেকে তাঁর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রথম অবস্থায় চীন তাঁর অন্তর্ধানের বিষয়ে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে চাপের মুখে দেশটি মেংকে আটক করার কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়। বেইজিং জানায়, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁকে আটক করা হয়েছে।

বর্তমান চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিং পিং’কে একজন সিরিয়াল কীডন্যাপার বলা যেতে পারে। ২০১২ সালে তিনি ক্ষমতাগ্রহণের পর থেকে বহু মানুষকে অপহরণ করিয়েছেন। এই তালিকায় সাধারণ বই প্রকাশক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী নেতাও ছিলেন। হংকং বা অন্য কোনো দেশে বসবাসরত চীনা নাগরিকদেরও তিনি অপহরণ করিয়েছেন। দীর্ঘ সময় পরে তাঁরা যখন জনসমক্ষে এসেছেন তখন তাঁদের পূর্বের অবস্থান থেকে সরে যেতে দেখা গেছে। গত জুলাইয়ে চীনের শোবিজ জগতের বড় তারকা ফ্যান বিংবিংয়ের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটেছিল। মাসখানেক নিখোঁজ থাকার পর চলতি মাসের শুরুতে জনসমক্ষে আসেন তিনি। জানা যায়, তাঁর বিরুদ্ধে বিপুল অংকের ট্যাক্স ফাঁকির অভিযোগ আনা হয়েছে। এরপর থেকে তাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আগের মতো সরকারবিরোধী অবস্থানে দেখা যায়নি। উল্টো ক্ষমতাসীন কম্যুনিস্ট পার্টির গুণগান করে বিবৃতি প্রকাশ করেছেন তিনি। নিজের ক্যারিয়ারে কম্যুনিস্ট পার্টির অবদানের কথাও প্রচার করছেন বিংবিং, যা তাঁর আগের অবস্থানের সঙ্গে একেবারেই বেমানান।

সৌদি আরবেও অনেকটা একই রকম চিত্র দেখা গেছে। তবে দেশটির অপকর্মের মাত্রাটা আরও ভয়াবহ। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি রিয়াদে রাষ্ট্রীয় সফরে থাকা অবস্থায় গুম হন। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নির্দেশেই তাঁকে গুম করা হয় বলে জানা যায়। সপ্তাহখানেক নিখোঁজ থাকার পর জানা যায়, হারিরি পদত্যাগ করেছেন। 

সৌদির গুম কৌশলের সর্বশেষ নজির সাংবাদিক জামাল খাসোগি। দেশটির রাজ পরিবারের কঠোর সমালোচক এই সাংবাদিক তুরস্কের সৌদি কনস্যুলেট থেকে নিখোঁজ হন। ওয়াশিংটন পোস্টের নিয়মিত এই কলামিস্ট তাঁর তুর্কি বাগদত্তা হাতিস চেঙ্গিসকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে কনস্যুলেটে প্রবেশ করেন। সেখানে আগের বিয়ের তালাকের কাগজপত্র সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন খাসোগি। এরপর তিনি আর বের হননি বলে জানিয়েছেন তাঁর বাগদত্তা হাতিস চেঙ্গিস। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সৌদি যুবরাজ সালমানকেই খাসোগির অন্তর্ধানের জন্য দায়ী করছেন। বলা হচ্ছে, তাঁকে কনস্যুলেটের ভেতরেই হত্যা করা হয়েছে।

শুধু চীন কিংবা সৌদি আরব নয়, রাশিয়া, মেক্সিকোসহ বিশ্বের আরও অনেক দেশই প্রতিপক্ষকে নিশ্চুপ করিয়ে দিতে গুম, খুন ও নির্যাতনের আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব অপকর্মের ফল কী তাঁরা ভোগ করবে না? অতীত কিন্তু এ বিষয়ে সতর্কবার্তাই দিচ্ছে। নেপোলিয়ানের শাসনামলের পুলিশ প্রধান জোসেফ ফোচ আফসোস করেছিলেন। বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘এটা অপরাধের চেয়েও ভয়ানক কিছু ছিল। আমি ভুল করেছিলাম।’ চীনের শি জিং পিং কিংবা সৌদি যুবরাজ সালমানের ক্ষেত্রেও যে এমন কিছু ঘটবে না তার কিন্তু কোনো নিশ্চয়তা নেই।

লেখকঃ ওয়ার্ল্ড পলিসি ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো। ইমাজিনিং নাবোকভঃ রাশিয়া বিটুইন আর্ট অ্যান্ড পলিটিক্স বইয়ের লেখক।  

বাংলা ইনসাইডার/এএইচসি/জেডএ