ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

মঈনুল, জাফর এবং ক্ষমতার ভারসাম্য

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০১৮ বৃহস্পতিবার, ১১:২৫ এএম
মঈনুল, জাফর এবং ক্ষমতার ভারসাম্য

বাংলাদেশের অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীদের একসময়ের সহযোগীরা ক্ষমতা হারিয়ে ইদানীং অনেকেই তাদের চিন্তার বা মস্তিষ্কের ভারসাম্য হারিয়েছেন। নতুন আঙ্গিকে সরকারের সমালোচনা হচ্ছে, ইনিয়ে বিনিয়ে, নিজে দেশপ্রেমিক সেজে সরকারের দোষ ধরা হচ্ছে। বলা হচ্ছে এটা পুলিশী রাষ্ট্র, সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাবের প্রতিফলন দেখছেন তারা। আবার বলছেন সরকার চরম আপোষকামী, ক্ষমতায় থাকার জন্য চরম আপোষ করছে সরকার। এই গোষ্ঠীর কাজই হচ্ছে উপদেশ দেয়া, অবিবেচনাপ্রসূত সমালোচনা করা, যার শিকার হচ্ছেন বর্তমান সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা। সরকারের কোন কাজ পছন্দ না হলে সমালোচনা করতেই পারেন, আমিও করি মাঝে মধ্যে। কিন্তু বাচ্চামী করি না, না জেনে, না বুঝে, নিজেদের সক্ষমতা আর ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা না বিবেচনায় এনে। এরা ১৯৭১ সালের আগে বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষণা না দেওয়ার সমালোচনা করেছে, আবার ৭ মার্চে বলেছেন, ‘কিছুই পরিষ্কার করলেন না বঙ্গবন্ধু’। তাঁরাই আবার ২৫শে মার্চের পরে বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু নিরস্ত্র বাঙ্গালীর জীবন নিয়ে ছেলে খেলা করলেন স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে।’ আবার স্বাধীনতার পরে তারা স্বাধীনতা বিরোধীদের ক্ষমা করার জন্য চাপ দিয়েছেন, মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচারের সময় বলেছেন, মাফ যখন করলেন, তখন সবাইকে নয় কেন? এমন সব কথা যার দালিলিক প্রমাণ আছে।               

একটি সার্বভৗম রাষ্ট্রের অধিকার বা ক্ষমতাকে তিনভাগে ভাগ করা হয় তা হলো- আইন প্রণয়ন ক্ষমতা, বিচারিক ক্ষমতা ও নির্বাহী ক্ষমতা। এই তিন ক্ষমতার মধ্যে কোনো একটি বিভাগ অতিরিক্ত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠলেই তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে দেশের নাগরিকদের জীবন বিপন্ন করে তুলতে পারে। আবার একটা দেশের অভ্যন্তরে যেমন ক্ষমতার ভারসাম্য দরকার তেমনি তা বিশ্ব রাজনীতি থেকে সেই দেশকে রক্ষায়ও খুব জরুরী। আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগের যে কোন একটি তার ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করলে শুধু দেশেই না আন্তর্জাতিক ভাবেও একটি দেশ চরম বিপদে পড়ে যেতে পারে। এর ভুরি ভুরি প্রমাণ প্রতি মাসেই আমরা দেখছি, আমাদের আশেপাশের দেশে। 

ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে দেশে বিদেশে যারা অনেকে কাজ করেছেন তাঁরা এটাকে ‘বাজেভাবে পিচ্ছিল, অস্পষ্ট, নিজের আকার আকৃতি পরিবর্তনে পারদর্শী,  চরম বিতর্কিত’, ইত্যাদি নানাভাবে সংজ্ঞায়িত একটা বিষয় বলে আখ্যায়িত করেছেন। আমাদের মত দেশে ক্ষমতার ভারসাম্যটা অনেক বেশী বাজে ভাবে পিচ্ছিল, অস্পষ্ট আর অ্যামিবার মত নিজের আকার আকৃতি পরিবর্তনে খুব পারদর্শী। নিজেরটা ১৬ আনা বুঝে নেন, পরেরটা যা হবার তাই হবে এমন ভাব। কথার প্যাঁচে সব ঠান্ডা। যা হউক, বিষয়টিকে একেবারে ছোট করে না আনলে এটি আর অস্পষ্ট থাকবে আমাদের কাছে।               

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ আর ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা লাভের পরে দেশে গণতন্ত্র চর্চায় বারংবার সামরিক হস্তক্ষেপ দেশের অভ্যন্তরের আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য এমন করে নষ্ট করেছে যে, তার থেকে বেরিয়ে আসা খুব দুষ্কর। যারা সরকারের সাথে কাজ করেন বা সরকারের কাজ গভীরভাবে অবলোকন করেন তাঁরা এই কথার অর্থ বুঝতে পারবেন। তবুও বলি  এই দীর্ঘ সময়ে আসলে আমাদের দেশের আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে নির্বাহী বিভাগ, যার মূলে আছেন আমলারা, হয়ে উঠেছে মহা পরাক্রমশালী। প্রশাসনে আমলাদের সাথে আছেন রাজনীতিকগণ কিন্তু সেখানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী, উপ-মন্ত্রী সবাই নখদন্তহীন বাঘ। কারণ হচ্ছে দেশের প্রচলিত আইনের ফাঁক, আর আমাদের আইন বিভাগের বিপুল সংখ্যক আইন প্রণেতা শিক্ষা ও জ্ঞানে ঐ রকম দক্ষ নন, যেমনটি থাকে উন্নত বিশ্বের দেশে। অল্পশিক্ষিত মানুষের দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের এটাই সবচেয়ে খারাপ দিক, ভোটের সময় স্রোতের টানে গা ভাসান, যোগ্যতা না দেখে দেখেন মার্কা বা প্রতীক।          

এটা ওপেন সিক্রেট যে, নির্বাহী বিভাগে আমলা ও তাঁদের সহযোগীগণ সবাই খুব একতাবদ্ধ, তাদে বিস্তার গ্রাম পর্যন্ত। সেই তুলনায় রাষ্ট্রের অন্য দুটি বিভাগে নিজেদের মধ্যে বিভেদ অনেক বেশী বলে অনুমিত হয়। আইন বিভাগ আইন করলেও সেই আইনের প্রয়োগ করেন নির্বাহী বিভাগ। বিচার বিভাগ বিচারে কাউকে দোষী সাব্যস্থ করে রায় দিলে সেই রায়ের বাস্তবায়ন করে নির্বাহী বিভাগ বা তার অংশবিশেষ। নিকট অতীতে দেখেছি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেফতারী পরোয়ানা পুরাতন ঢাকা থেকে গুলশানে আসতে কয়েকদিন সময় লেগেছে। আবার আসার পরে উনাকে খুঁজে পাওয়া যায় নি, তাই পলাতক দেখানো হয়েছে সেই সময় যখন উনি প্রতিদিন সংবাদ সম্মেলন করেছেন। আসলে এখানেও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে বলে অভিজ্ঞরা দাবী করছেন। নির্বাহী বিভাগের অংশ পুলিশ প্রশাসন বলছে, যে দেশে একজন মানবতাবিরোধী অপরাধীকে ফাঁসির হুকুমের পরে সারা দেশ জুড়ে তাণ্ডব চালিয়ে গণমানুষের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি করে একশ্রেণীর মানুষ। যে দেশের মানুষের একটা অংশ বিশ্বাস করে যে, ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি চাঁদের বুড়ির সাথে বসে গল্প বা রোমান্স করছে, সেই দেশে আইন প্রয়োগ কি এত সহজ? সে সময় সমালোচকরা তাঁদের স্বর এক ডিগ্রী চড়িয়ে বলেছেন পুলিশ তাঁর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে প্রশাসন বলছে, খালেদা জিয়ার ২০ দলীয় জোটের একজন এমপি ফাঁসির আদেশ দিলে যদি দেশে এই অবস্থা হয় তাহলে ২০ দলীয় জোটের প্রধান খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করলে যে অবস্থা আর ভয়াবহ হবে না সে গ্যারান্টি তো সমালোচকরা কেউ দেবেন না। উল্টা বলবেন প্রশাসন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে। এ কথায় বিচার বিভাগ আঁতকে ওঠে, সতর্ক হয় আইন বিভাগ তথা সরকার গঠনকারী রাজনৈতিক দল। কিন্তু এই ভারসাম্য রক্ষার ফলে সময় অনেকটা বদলে গেছে, ইচ্ছে করলেই আর কেউ চাঁদের বুড়ির সাথে পরকীয়া করতে পারছেন না, চেষ্টা আছে অনেক, তবুও।       

অনেকে বলেন জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশকে কেন নিষিদ্ধ করছে না সরকার! আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, জামায়াত কিন্তু একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের বাংলাদেশ শাখা। জামায়াতের আন্তর্জাতিক কানেকশন কূটনৈতিক ভাবে নষ্ট না করে নিষিদ্ধে কতটুকু লাভ হবে? অন্যভাবে বলা যায় যে, নিষিদ্ধ করা না করা মধ্যে পার্থক্য খুব কম। নিষিদ্ধ করলে কিছু ভালো মানুষ যারা ধর্মের নামে বিভ্রান্ত হয়ে শিবির হয়ে জামায়াতে গেছে, তা সুস্থ জীবনে ফিরতে পারবে না, স্থায়ীভাবে নষ্ট হবে। হিজবুত তাহরিরসহ অনেক চরমপন্থি ইসলামী দল নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তারা কী তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে? না বরং অন্য রাজনৈতিক দলের ব্যানারে তারা আর বেশী জিঘাংসা নিয়ে কাজ করছে। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করলে তারাও তাই করবে, বরং না করে আস্তে আস্তে সাংগঠনিক ভাবে নিঃশেষ করা, আন্তর্জাতিক কানেকশন নষ্ট করা অনেক ভালো কৌশল বলে অনেকেও সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন। এর জন্য লাগে সময় তাই এর পক্ষে বিপক্ষে মত থাকতেই পারে। মফস্বল থেকে ঢাকায় আসার পথ অনেক, সড়ক, নৌ, আকাশ, ইত্যাদি। মূল লক্ষ্য ঢাকায় পৌঁছানো। তাই মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে তার মানে এটা ভাবা ঠিক হবে না যে কেউ লক্ষ্যচ্যুত হয়েছেন।      

আন্তর্জাতিক, রাষ্ট্রীয়, সামরিক, রাজনৈতিক তথা সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করতে গেলে সমাজের কী অবস্থা দাড়াই তা আমরা ইদানীং দুইজন প্রখ্যাত (মনে হয় এখন আর নেই) ব্যক্তির আচরণ দেখলে অনুমান করতে পারবো। রাষ্ট্রে বা সমাজে ক্ষমতার ভারসাম্য রাখতে হয় নানা কারণে তাই ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মত লোককে দেশের সেনাবাহিনী তথা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলার পরেও ১৪ শিকে ঢুকানো হয়নি তাঁর অতীত অবদানের কথা ভেবে; যদিও তার অপকর্মের তালিকা অবদানের চেয়ে ঢের ঢের লম্বা। তিনি তড়িঘড়ি মাফ চাইলেন নুক্তা লাগিয়ে। মামলা হলো, দোষী হলে এবারেই সাইজ হয়ে যাবেন উনি। আবার ধরুন ইত্তেফাকের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ছেলে, ব্যারিস্টার মঈনুল, যিনি হালে শিবিরের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ হয়েছেন বা জামায়াতের বন্ধু হয়েছেন, তার মতো করে টেলিভিশনের অন এয়ারে কোন নারী সাংবাদিককে ‘চরিত্রহীন’ বলার পরে ঢাকার নারীসমাজ মনোভাব বুঝেই তড়িঘড়ি মাফ চেয়েছেন তিনি। কী অবাক যার সময় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির করা মামলায় খালেদা জিয়া এখন জেলে, তিনিই এখন খালেদা ভক্ত, তার জোটের নেতা! তাই খালেদা জিয়ার কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করতে এসব কী ভারসাম্যহীন আচরণ নয় কি ! তাই সামাজ তথা রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার জন্য অনেক সময় যা করা হয় তা অনেকের পছন্দ নাও হতে পারে, যিনি করেন তিনি বুঝে শুনেই করেন, ভালো হলে আখেরে সবাই তার ফল ভোগ করেন। খারাপ হলে সেই খারাপের ভাগ কিন্তু কেউ নেন না, একা সরকার প্রধান ও তাঁর দলের উপর বর্তায়।                        

লেখক: উন্নয়নকর্মী