ঢাকা, রোববার, ১৩ জুন ২০২১, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

সংলাপ ও বিবৃতি বাণিজ্যের সম্ভাবনা

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর ২০১৮ বৃহস্পতিবার, ০১:৫৫ পিএম
সংলাপ ও বিবৃতি বাণিজ্যের সম্ভাবনা

বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিবৃতি বাণিজ্যের ভাটা পড়ার নতুন সম্ভাবনার মেঘ গুড় গুড় করছে দেশে বিদেশে; যদিও শত শত ব্রেইন, আর কাড়ি কাড়ি টাকার তহবিল গঠনে চলছে এক মহাযজ্ঞ। পত্রিকার খবরে যা প্রকাশ পাচ্ছে তাতে অনুমিত হচ্ছে যে দেশের বিরাট অংশের মানুষ আসন্ন এই সংলাপে ‘টানেলের ওপারে হাল্কা আলোর দেখা’ পেলেও জামায়াত নিষিদ্ধ হওয়া আর বিএনপি’র সংশোধিত গঠনতন্ত্রের অনুমোদন না দিতে নির্বাচন কমিশনকে আদালতের আদেশ সব সমীকরণ উল্টে দিতে পারে।        

১লা নেভেম্বর ২০১৮ তারিখ থেকে শুরু বাংলাদেশে বর্তমানে ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনার সরকার আর তার বিরোধীদের মধ্যে সফল (!) সংলাপের জোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এমতবস্থায় সরকার আর বিরোধীদলসমুহ যার যার অবস্থানে থেকে কীভাবে সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক মুনাফা আনবেন তার এন্তার হিসাব করছে, শয়নে স্বপনে, জাগরণে। কিন্তু উভয় পক্ষের জয় জয় অবস্থানে না গেলে কোন নেগশিয়েশন বা সংলাপ সফল হয় না, অতীত অভিজ্ঞতা তাই বলে। ইতিমধ্যে কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, ঐফ্রন্টের বড় দল বিএনপি সংলাপে যাবে মুখ রক্ষার জন্য, রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে, দাবী আদায়ের নিমিত্তে নয়, এটা জামায়াতী আর লন্ডনী কৌশল।  

রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নিষিদ্ধ দল জামায়েতের পরামর্শে বিএনপি সংলাপ থেকে ওয়াকাউট করলে কী হতে পারে? আন্দোলন করে দাবী আদায়ের পরিবর্তে দেশী বিদশী বিভিন্ন সংস্থা বা সরকারের বিবৃতির মাধ্যমে দাবী আদায় করে যেনতেন উপায়ে ক্ষমতায় আসার ফল কী হতে পারে তা অনুমান করা যায় এভাবে-    

(১) বিবৃতি বাণিজ্যে লিপ্ত এক শ্রেনীর চ্যুত বুদ্ধিজীবী আর বিশ্বের কিছু নামকরা, সুশীল তকমা পাওয়া মানুষ সরকারকে দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে কৌশলী বিবৃতি দেবেন, যার একাধিক অর্থ করা যাবে পরে।    

(২) লবিস্টদের ভুল ব্যাখ্যার ফাঁদে পড়ে ‘টাকা দিলে সব করতে বা বলতে পারি’ এমন ইমেজের কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা, যারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের শাস্তি মৌকুফের দাবি করেছিল, তারা আবার বিবৃতি দেবে নিজের অতীত বিবৃতিকে জায়েজ করতে বা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে।   

(৩) কিছু সরকার প্রধান বা তাদের দূতাবাস কূটনৈতিক ভাষায় বিবৃতি দেবে জামায়াত বিএনপি’র লিবিস্টদের মিথ্যাচারে বিভ্রান্ত হয়ে। অথবা যারা বাংলাদেশের ঈর্ষান্বিত উন্নয়নে অখুশি বা তাদের স্বার্থহানীর সম্ভাবনা আছে তারা বিবৃতি দেবে।   

(৪) বাংলাদেশের চ্যুত কিছু সুশীল ভবিষ্যৎ লাভের আশ্বাসে নানাভাবে ইনিয়ে বিনিয়ে বিএনপিকে কিছু ছাড় দেবার বা তাদের দাবির ন্যায্যতা প্রমাণে ঘোমটা খুলবেন বিবৃতির মাধ্যমে।

(৫) সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন ভাষায় মিথ্যাচার করে আন্তর্জাতিক মহলকে বিভ্রান্ত করবে, যাতে বিদেশী থাকা বাংগালীদের মাঝে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। 

(৬) অভিযোগ আছে যে, ‘পাঠাও’ নামের বাংদেশের একটি মোটর বাইক সার্ভিসের দলে জামায়াত বিএনপি’র কিছু ক্যাডার ঢুকিয়ে অতীতের মতো সারা ঢাকা শহর জুড়ে বোমাবাজি করে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করবে, যাতে বিদেশি বিনিয়গকারীরা ভয় পেয়ে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যান। যাতে বাংলাদেশ পাকিস্তানের মত অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়।           

লাভ কতটুকু হতে পারে তার হিসাব করার আগে দেখে নিই বিবৃতি বাণিজ্যের অতীত আর নিকট অতীত আর অনুমিত ভবিষ্যৎ। ৯০ দশকের গোঁড়ার দিকে কোন দেশ বা সংগঠনের বিবৃতি খুব কার্যকরী ছিল। এর একটা প্রমাই বসয়টি বুঝার জন্য যথেষ্ট।    

১৯৭১ সালের কথা যদি বলি তখন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মার্কিন ৭ম নৌবহর বঙ্গোপসাগরের দিকে আগুয়ান হলে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন বা বর্তমান রাশিয়ার এক বিবৃতিতেই তা থেমে যায়। আর এগুতে পারেনি ৭ম মার্কিন ৭ম নৌবহর বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরের দিকে।  

নিকট অতীতে আমরা দেখলাম যে, উত্তর কোরিয়ারকে পুরোপুরী ধ্বংস করে ফেলার মত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিবৃতি যুদ্ধ চললেও চীন আর রাশিয়ার উপস্থিতি টের পেয়ে পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার সাথে সমঝোতা করেছে। ইরানের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা, কারণ তার পাশে আছে রাশিয়া।       

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে জনঅসন্তোস তৈরির অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ফটোগ্রাফার শহিদুলের মুক্তি চেয়ে বহু নোবেল বিজয়ী বিবৃতি দিলেও তাঁর ফল ভালো হয় নি। অন্যদিকে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের শাস্তি মৌকুফের দাবী আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন আর কিছু সরকার প্রধান বা তাদের অংশ বিবৃতি আর টেলিফোনে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু একই অপরাধে শাস্তি পাওয়া বেশ কিছু মানবতাবিরোধী অপরাধীর (আর্থিকভাবে খুব সচ্ছল নয়) শাস্তি হলেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন কোন বিবৃতি দেয় নি। ভাবটা এমন যে গরীব বা আর্থিকভাবে অচ্ছল মানুষের মানবাধিকার থাকতে নেই। এসব উদাহরণ ব্যবহার করে  বর্তমান সরকার কূটনৈতিকভাবে খুব দক্ষতার সাথে শহিদুলের মুক্তির চাপ মোকাবিলা করেছে বলেছে জানা গেছে। তথ্য প্রবাহের এই যুগে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত দিয়ে সরকার তাঁদের বুঝাতে পেরেছে যে, বাংলাদেশ সরকার কোন অন্যায় করেনি। এর পরেই বিবৃতি বানিজ্যে ভাটা পড়ে তাই শহিদুল আলমের বেলায় তা তেমন কাজে লাগেনি।            

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গা এসে বাংলাদেশের পূর্ব দক্ষিন এলাকা তথা দেশের অর্থনীতিতে চরম খারাপ প্রভাব ফেললেও তার চেয়ে বিভিন্ন দেশ আর মানবাধিকার সংগঠন বিবৃতি দিয়েছে বেশুমার। কাজের কাজ তেমন সন্তোসজনক নয় তার অন্যতম কারণ হচ্ছে মিয়ানমারের পাশে আছে মহাশক্তিধর চীন। তাই এই বিবৃতির চাপ প্রত্যাশিত ফলের ধারে কাছেও যায় নি। লাভ হয়েছে শেখ হাসিনার, তাঁর সরকারের ইমেজের, সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে।     

অর্থনৈতিক রাজনীতির এই বিশ্বজগতে বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী জাপান, ইন্ডিয়া, রাশিয়া, চীনের মত একটা বা দুটি দেশও যদি বর্তমান সরকারের কাজে সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে কোটি টাকা ঢেলে বিবৃতি বাণিজ্যের কোন লাভ হবে না বিএনপি জামাতের তা অনুমান করা যায়। এটা সেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের শাস্তি মৌকুফের দাবীতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের বিবৃতির মতোই ফল দেবে তা বলার অপেক্ষা রাখে কি?

লেখক: উন্নয়নকর্মী

বাংলা ইনসাইডার/জেডএ