ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৫ আগস্ট ২০২১, ২১ শ্রাবণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বাংলাদেশের রাজনীতি: একই বৃত্তে স্রোত, নাকি প্রবাহ

দি ইকোনমিস্ট
প্রকাশিত: ১৪ নভেম্বর ২০১৮ বুধবার, ০৮:০৭ এএম
বাংলাদেশের রাজনীতি: একই বৃত্তে স্রোত, নাকি প্রবাহ

সাপের মতো এঁকে-বেঁকে পুরো বাংলাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা নদীর মতোই এর গণতন্ত্র ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অবয়বেরও পরিবর্তন করছে। ১৯৭১ এ স্বাধীনতার পর থেকে দেশটির জনগণ ১০ বার ভোট দিয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল অনেকটাই ভিন্নরকম। একদলীয় প্রভাব বলয়ের মধ্যে ভোট হয়েছে, ভোট হয়েছে সামরিক শাসন, বর্জন ও তীব্র প্রতিবাদ বিক্ষোভের মধ্যে। আবার এমন ভোটও হয়েছে যেখানে শান্তিপূর্ণ ভাবে ভোটাররা ভোট দিয়েছে এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতায় পরিবর্তন এসেছে।

১৯৯০ সাল থেকে ধারাবাহিক ভাবেই বাংলাদেশের ক্ষমতাধর দুই নারীর মধ্যেকার বিরোধ স্পষ্ট। এদের একজন হলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ। আর অপরজন দু’বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রধান খালেদা জিয়া, যিনি বর্তমানে কারাগারে। আরেকটি বিষয় ধারাবাহিক, যখনই ভোট স্বচ্ছ হয়েছে বলে মনে করা হয়েছে, তখনই ভোটার উপস্থিতি ছিল বেশি। আর নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ দেখা গেলে, ভোটাররাও থেকে গেছেন বাড়িতেই।

গ্রহণযোগ্যতার অভাবে কয়েক সপ্তাহ আগেও মনে করা হয়েছিল, আগামী তিন মাসের মধ্যে হতে চলা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি হবে খুবই কম। ২০০৮ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে জয়ী আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠেছে। ওই সময় মনে করা হচ্ছিলো, তৃতীয় বারের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদে যেকোনো উপায়ে থাকতে চায় আওয়ামী লীগ। তবে হঠাৎ হঠাৎ করেই এই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশে মানুষ অবশ্যই একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন পাচ্ছে, তবে তা স্বচ্ছ বলা যাবে না।

স্রোত পরিবর্তন

একটি নয়, দুটি বড় বিস্ময় এসেছে গত মাস অক্টোবরে। মাসের মাঝামাঝি সময়ে দীর্ঘদিনের ডানপন্থী ইসলামিক দলের সঙ্গ ছেড়ে ছোট পরিসরের ধর্ম নিরপেক্ষ দলের এক জোটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বিএনপি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে পরিচিত জোটটির শীর্ষ নেতা হিসেবে আছেন ৮২ বছর বয়সী ড. কামাল হোসেন, যিনি একজন সংবিধান বিশেষজ্ঞ আইনজীবী হিসেবেই পরিচিত। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো বিএনপির প্রতি চরম বিরূপ বলে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ হঠাৎ করেই সুর নরম করেছে। আর পুলিশ (দেশের সেনা ও আদালত হিসেবেই যারা পরিচিত এবং সরকারকে টিকে থাকার অন্যতম ভিত্তি) হঠাৎ করেই বিএনপি কর্মীদের ধরপাকড় বন্ধ করে। বরং, রাজধানীসহ দেশজুড়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সমাবেশের সুযোগ পায়। শেখ হাসিনা নিজেই ফ্রন্টের নেতাদের আমন্ত্রণ জানান। স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য তাঁদের প্রস্তাব বিবেচনার কথা দেন প্রধানমন্ত্রী।

দুটি বড় দলের সঙ্গেই ছোট দলগুলোর আস্ফালন এবং সদা পরিবর্তনশীল জোট নিয়ে শঙ্কার মধ্যেই দুই দলের মধ্যেকার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যার মধ্যে সর্বশেষটি অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ৭ নভেম্বর। ঐক্যের দাবির প্রতি নমনীয় মনোভাব দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ঐক্যফ্রন্টের দাবিগুলো মধ্যে আছে প্রধান বিরোধী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সকল রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তি। পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং নির্বাচন স্বচ্ছের বিষয়টি নিশ্চিত করাসহ আরও কিছু বিষয়।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হতে পারে, কিন্তু নির্বাচনের সময়কার কাঠামোতে থাকবে তাদের সরকার। আওয়ামী লীগের দাবি তারা কোনোভাবেই অনির্বাচিত সরকার আসতে দেবে না। উল্লেখ্য, ১৯৯৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলোপ করেছে আওয়ামী লীগই।

ঐক্যফ্রন্ট এমন প্রেক্ষাপটে আন্দোলনের হুমকি দেয়। তবে নির্বাচন বর্জনের ব্যাপারে তাদের মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা দেখা গেছে। এখনো তৃণমূলে শক্তিশালী বিএনপি সম্প্রতি কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের সহানুভূতির পাত্র। এর আগে ২০১৪ সালে নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি সড়কে অবস্থান নিয়েছিল। পার্লামেন্টের বাইরে চলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা বেগম জিয়া ও তার অনুসারীদের জন্য মোটেও সুখের হয়নি। এর ফলে সরকারের সব প্রতিষ্ঠানে আওয়ামী লীগের প্রভাবই শুধু বাড়েনি, হুমকির মুখে পড়েছে সম্পদশালী বিএনপি সমর্থকরা। বিএনপির ভাষ্য অনুযায়ী, দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৯০ হাজার মামলা হয়েছে, যেখানে আসামি আড়াই লাখের বেশি নেতাকর্মী। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেই আছে ৩৪ মামলা এবং লন্ডনে থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকেও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।

শেখ হাসিনার সংলাপ সত্ত্বেও, আওয়ামী লীগ হয়তো বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার ব্যাপারে যথেষ্ট উদ্যোগী না। বিএনপির প্রধান যেমন তাঁর স্বামীকে একটি ক্যুতে হারিয়েছেন। তেমনি আওয়ামী লীগ প্রধানকেও ট্রাজেডির মধ্যে দিয়ে আসতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের সঙ্গে নিহত হন প্রধানমন্ত্রীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এখন শেখ হাসিনা তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি দিন দিন কঠোর হচ্ছেন বলেই মনে করা হয়। আর এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, ‘বিবেকের দিক দর্শনের’গুণটি হারিয়ে ফেলছেন প্রধানমন্ত্রী।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার দশক পর আওয়ামী লীগ সংবিধান সংশোধন করে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার নিশ্চিত করেছে। চলতি বছরের মে থেকে পুলিশ মাদক ব্যবসায়ীদের দেখামাত্রই গুলির নীতিতে চলছে। বিচার-বহির্ভূত এই হত্যার সংখ্যা ২৬৪ বলে মনে করা হয়। ঢাকায় রাস্তায় যখন বেআইনি গাড়ি চালনার জন্য আন্দোলন করেছে, তখন ছাত্রদের দমাতে তাদের উপর চড়াও হয়েছিল দলীয় ক্যাডাররা। বাংলাদেশের বিখ্যাত একজন ফটোগ্রাফারকে নেওয়া হয়েছে কারাগারে। এই ব্যক্তি এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন ‘মানসিক ভাবে অসুস্থ’ বলে দাবি করেন। আর শেখ হাসিনা স্মরণ করেছেন, ওই ব্যক্তির চাচা ছিলেন পাকিস্তানের মন্ত্রী। রক্তই কথা বলে, মন্তব্য শেখ হাসিনার।

কিন্তু আওয়ামী লীগের তো কঠোর হওয়ার উপর নির্ভরের প্রয়োজন নেই। এর শাসনকালে বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়ন হয়েছে অকল্পনীয়। সর্বশেষ বছরে জিডিপি বেড়েছে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বেশি। জরিপও বলছে বর্তমান সরকার উপর জনগণ সন্তুষ্ট। এক দশকের প্রশ্রয়ে পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তাদের বিশ্বস্ততা পাওয়া গেছে, যাতে বন্ধ হয়েছে ক্যু-এর সব পথ। দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবেশী ভারতও আওয়ামী লীগের সমর্থনে। এছাড়া ৭১ বছর বয়সী শেখ হাসিনা পরিস্কার ভাবেই দেখিয়েছেন, তিনি পরিবর্তনও আনতে জানেন। দলের ধর্ম নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি সত্ত্বেও রক্ষণশীল মাওলানাদের সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে বিএনপিকে পেছনে ফেলেছেন শেখ হাসিনা।। এতসব সুবিধাই কি গণতন্ত্রকে তার নিজ পথে রাখতে বিশ্বস্ত রাখবে শেখ হাসিনাকে। নাকি স্রোতপ্রবাহ হবে তাঁরই নিয়ন্ত্রিত?

বাংলা ইনসাইডার/জেডএ