ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৫ আগস্ট ২০২১, ২১ শ্রাবণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

নির্বাচন ঠেকাতে ফেসবুক দিয়ে সন্ত্রাস!

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ১৫ নভেম্বর ২০১৮ বৃহস্পতিবার, ০৮:১৩ এএম
নির্বাচন ঠেকাতে ফেসবুক দিয়ে সন্ত্রাস!

আমাদের সমাজে বিশ্বাস দুই ধরনের। একটা বিশ্বাসকে আমরা ইংরেজিতে বলি ‘বিলিভ’, যা নিজ চোখে দেখা,  নিজ কানে শোনা, নিজে স্পর্শ করা, ইত্যাদির মাধ্যমে জন্ম নেয়। এই বিশ্বাসের মুল হচ্ছে প্রমাণ, মুক্তচিন্তায় জারিত যুক্তি। অন্যটিকেও আমরা বিশ্বাস বলি, যা ইংরেজিতে বলা হয় ‘ফেইথ’। যা আত্মিক, আধ্যাত্মিক, পারলৌকিক বা ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশে আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রভাব খুবই বেশি। বিভিন্ন মিডিয়ায় ছাপার অক্ষরে লেখা, ছবি, ভিডিও, ইত্যাদি দেখে তার সত্য মিথ্যা যাচাই না করেই কিছু মানুষ তা বিশ্বাস করে। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসে চিড় ধরলে বা আঘাত পেলে মানুষ হয়ে ওঠে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য ভয়ঙ্কর দানব। বাংলাদেশের মত দেশে মিডিয়ার প্রভাবের কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের কথা।                 

ফেসবুক হচ্ছে বিশ্ব-সামাজিক আন্তঃযোগাযোগ ব্যবস্থার একটি ওয়েবসাইট, যা ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি  প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিতে বিনামূল্যে সদস্য হওয়া যায়। ফেসবুক ব্যবহারকারীগণ আত্মীয়-বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ, খবর দেওয়া নেওয়া এবং তাদের ব্যক্তিগত তথ্যাবলি আদান প্রদান করতে পারেন খুব সহজেই।  সেই সঙ্গে একজন ব্যবহারকারী শহর, কর্মস্থল, বিদ্যালয় এবং অঞ্চল-ভিত্তিক নেটওয়ার্কেও যুক্ত হতে পারেন। ফেসবুক ওয়েবসাইটটি প্রাথমিকভাবে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু পরে সারা দুনিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রূপ নিয়েছে। ১৩ বছর বা ততোধিক বয়স্কদের যে কেউ এটার সদস্য হতে পারে। বলা হয় যে, সারা বিশ্বে বর্তমানে এই ওয়েবসাইটটি ব্যবহার করছেন এক বিলিয়নের বেশি সক্রিয় সদস্য। আমাদের দেশেও এটি খুব জনপ্রিয় এবং পাশের দেশেও এর জনপ্রিয়তা কম নয়। শুধু বাংলাদেশেই আড়াই কোটিরও বেশি মানুষ সক্রিয়ভাবে ফেসবুক ব্যবহার করে। এই হিসেবের মধ্যে বিদেশে থাকা বাংলাদেশের বাঙ্গালি আর ভারতীয় বাঙ্গালিদের ধরা হয় নি।            

ফেসবুকের মতো আরও কিছু সোশ্যাল মিডিয়া আছে। আর এই সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে মানুষ নানাভাবে উপকৃত হচ্ছেন। মানুষের সামাজিক বন্ধন দৃঢ়তর হয়েছে। বিদেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বেড়েছে। অবাধ তথ্য প্রবাহের কারণে নানা ধরনের তথ্য পেয়ে বা শেয়ার করে মানুষ জ্ঞানে অনেক সমৃদ্ধ হচ্ছেন। ফলে হু হু করে সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। শিল্প-সাহিত্যে, সংস্কৃতির চর্চায় এর অবদান বিশাল, তা আজ আর কেউ অস্বীকার করেন না। এর সাথে যোগ হয়েছে অনলাইন পোর্টাল, যা তথ্য প্রবাহ আর মত প্রকাশের অনন্য এক প্লাটফর্ম। আইটির এই যুগে তাই মানুষ যেন একটা ‘বিশ্ব গ্রামের সদস্য’ হয়ে উঠছেন দিনে দিনে।

২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের নামে একটা আন্দোলন শুরু হয় যার মূলে ছিল এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লাখ লাখ মানুষ শাহবাগে সমবেত হন। এই দিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত আসামি আব্দুল কাদের মোল্লার বিচারের রায় ঘোষণা করে। কবি মেহেরুন্নেসাকে হত্যা, আলুব্দি গ্রামে ৩৪৪ জন মানুষ হত্যাসহ মোট ৬টি অপরাধের ৫টি প্রমাণিত হওয়ার পরেও আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। কিন্তু এতগুলো হত্যা, নারী নিপীড়ন , সর্বোপরি গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ মেনে নিতে পারেনি। রায়ের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিপুল সংখ্যক মানুষ ঢাকার শাহবাগে জড়ো হতে শুরু করে এবং এর অনুসরণে একসময় সারা বাংলাদেশের অনেক স্থানেই সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ সমাবেশ শুরু হয়, যা ছিল সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে এক অভূতপূর্ব প্রতিবাদ সমাবেশ, বিশাল অর্জন।       

ভালোর পাশাপাশি এই সোশ্যাল মিডিয়া আর অনলাইন পোর্টাল অনেক দেশে অনেক খারাপ কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে। এই সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্যে আইএস এর মত ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী গ্রুপ তাদের সদস্য সংগ্রহ করে সারা দুনিয়ায় হত্যা, খুনসহ নানা অরাজকতা চালিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় কিছু গ্রুপ যাদের অন্যতম হচ্ছে ‘বাঁশের কেল্লা’ এবং তার সাথে যোগ দেওয়া একটা বিশেষ গোষ্ঠীর মালিকানায় ও নির্দেশে চালিত কিছু অনলাইন পোর্টাল ও প্রিন্ট মিডিয়ার অপপ্রচারে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনকে নাস্তিকদের বা ধর্ম বিরোধীদের আন্দোলন হিসেবে প্রচার করে বাংলাদেশের ধর্মভীরু মানুষদের একটা বড় অংশকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়। যদিও তার পিছনে ছিল১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের রক্ষা করার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। এই বিশেষ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কিছু মিডিয়ার মিথ্যাচারে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাতের ফলে সৃষ্ট অসীম দানবীয় শক্তি সারা দুনিয়ার মানুষ দেখেছে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের মতিঝিল সমাবেশ বা তার পরবর্তী ঘটনাসমূহে।      

আমাদের দেশের সরকারি চাকরীতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বিরোধী আন্দোলনে সোশ্যাল মিডিয়াকে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে? এটা আসলে কাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন? কাদের পক্ষে আন্দোলন? দাবি ন্যায্য হলে কেন আহতকে ছাত্র সমাজের মধ্যে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করা হয়েছে? কেন ফটোশপের মাধ্যমে ছবি টেম্পারিং করে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মন বিষিয়ে তুলে একজন ছাত্রীকে চরম হেনস্তা করা হয়েছে? মিথ্যার উপর ভিত্তি করে কেন নিরীহ ছাত্রছাত্রীদের রাস্তায় নামানো হয়েছে? উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন, অসৎ, কিন্তু এই কাজে খুব সফলতার সঙ্গেই ফেসবুককে ব্যবহার করা হয়েছে। নিরাপদ সড়কের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে নিয়োজিত শিশুদের আন্দোলনকে ছিনিয়ে নিয়ে কীভাবে তা সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ দেবার চেষ্টা হয়েছে তা আমাদের সবারই জানা। এসবি হয়েছে হীন দলীয় স্বার্থে ফেসবুকের মত কিছু সোশ্যাল মিডিয়া আর কিছু অনলাইন পোর্টাল সাথে দুই একটি অন্য মিডিয়া ব্যবহার করে। যদিও তারা পুরোপুরি সফল হয়নি তবুও তারা থেমে নেই। কারণ তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়া।            

আমাদের পাশের দেশ ভারতে `ফেক নিউজ` বা ভুয়ো খবর নিয়ে বিবিসির গবেষণায় ইতিমধ্যেই উঠে এসেছে যে, ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপির অভূতপূর্ব জয়ের পেছনে দলের তথ্যপ্রযুক্তি বা সোশ্যাল মিডিয়া সেলের অবদানও কেউ অস্বীকার করেন না। সেখানেও ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছে উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। তাদের সহায়তা করেছে ‘কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা’ নামের একটা প্রতিষ্ঠান। যেটি আমেরিকার নির্বাচনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ব্যবহার করেছেন বলে বাজারে কথা চালু আছে।    

এই লেখা শেষ করার সময় পল্টনে বিএনপির কর্মীরা পুলিশের উপর চড়াও হয়েছে, পুলিশের গাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। এই খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় আসবে নানাভাবে ‘বাঁশের কেল্লা গ্রুপের’ কল্যাণে। এর অনেক ভিডিও ক্লিপে অন্য কিছু জুড়ে দিয়ে বাংলাদেশের সরল সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হবে। কারণ তারা আর তাদের দোসর জামায়াত- শিবির মাঠে নামতে পারছে না প্রকাশ্যে তাই তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় হবে খুব সক্রিয়। তারা বিভিন্ন সময়ে তাদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন সময় নানা লবিস্ট গ্রুপ ব্যবহার করে আসছে। তারা ‘ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা’র মত প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করবে না বা করছে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে! এর সব কিছুই হবে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য, নির্বাচন বানচাল অথবা অন্য যে কোন উপায়ে ক্ষমতায় গিয়ে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির উপর চরম প্রতিশোধ নিতে। ইতিমধ্যেই তার আঁচ পাওয়া গেছে। এমন কী পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইচ্ছা করে ঘটানো কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে চলবে ২০১৪ সালের মত অগ্নিসন্ত্রাস, সংখ্যালঘু নির্যাতনের তাণ্ডব। মানুষ এখন অনেক সচেতন তাই হয়তো সফল হবে না, তবে সাবধান হতে দোষের কী! আমাদের দেখতে হবে বিনা অপরাধে যেন কোনো প্রাণ ঝরে না যায়।        

তথ্যঋণঃ বাংলা পিডিয়া, অনলাইন পোর্টাল, ইত্যাদি।