ঢাকা, রোববার, ২০ জুন ২০২১, ৬ আষাঢ় ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ভ্রষ্ট রাজনীতিবিদদের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে

জাহিদ আব্দুল্লাহ
প্রকাশিত: ২৭ নভেম্বর ২০১৮ মঙ্গলবার, ০৮:০৩ এএম
ভ্রষ্ট রাজনীতিবিদদের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে

বলা হয়, রাজনীতি হলো আদর্শের বিষয়। এই আদর্শকে বুকে ধারণ করেই একজন জনকল্যাণে এগিয়ে আসেন। এটিই হলো রাজনীতির মূল বিষয়। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, পদ-পদবির লোভে, কিছু পাওয়ার আশায় কিছু রাজনীতিবিদরা বিসর্জন দেন আদর্শকে। এই আদর্শ বিসর্জনের বিষয়টিও একটি মাত্রা আছে। ধরা যাক, একটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল থেকে কেউ আরেকটি একই রকম প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলে চলে গেলেন। যেমন বাম রাজনৈতিক দল থেকে আরেকটি বাম দলে গেলেন কেউ। এমন বদল দৃষ্টিকটু হলেও মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু অনেকের আদর্শের বদল হয় সম্পূর্ণ বিপরীত। রাজনৈতিক আদর্শে অনেকে ‘ইউটার্ন’ নেন। বিষয়টি অনেকটা এক মেরু থেকে আরেক মেরুতে যাওয়ার মতোই। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলা রাজনীতি থেকে ক্ষমতা, পদের লোভে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তিতে যাওয়া এমনই এক ইউটার্ন। আর এমন রাজনৈতিক আদর্শের বিচ্যুতিকে ভ্রষ্ট রাজনীতি বলাই সবচেয়ে উপযুক্ত। বাংলাদেশের এমন ভ্রষ্ট রাজনীতিবিদের সংখ্যাই দীর্ঘ হচ্ছে।

সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, যিনি বঙ্গবন্ধুর উপর গবেষণা করে লাভ করেছেন পিএইচডি ডিগ্রি। তিনিই বাংলাদেশে প্রথম ‘ফ্যাক্টস অ্যান্ড ডকুমেন্ট’ বই প্রকাশ করেছিলেন। যেখানে বলা হয়েছিল, জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত। সেই অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, হলেন ভ্রষ্ট রাজনীতির সাম্প্রতিক সংযোজন। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন আবু সাইয়িদ। মনোনয়ন না পেয়ে আজ যোগ দিয়েছেন গণফোরামে। নিশ্চিত ভাবেই গণফোরামের ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন এই সাবেক ভ্রষ্ট গবেষক রাজনীতিবিদ।

তাহলে রাজনীতি শুধু একটা সংসদ সদস্যের পদলাভ, রাজনীতি মানেই কী শুধু প্রাপ্তির আশা। এখানে আদর্শ, নীতি, নৈতিকতা সবই কী তবে মুখোশ, লেবাস।

ভ্রষ্ট রাজনীতির সাম্প্রতিক সংযোজন অধ্যাপক আবু সাইয়িদ হলেও, বাংলাদেশে এর সূচনা যিনি করেছিলেন, তিনি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ ছিলেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কৌসুলি। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠন ব্যারিস্টার মওদুদকে বঙ্গবন্ধু ক্ষমতায় থাকাকালে পোস্টমাস্টার জেনারেল করা হয়েছিল। কিন্তু ৭৫’র ১৫ আগস্টের পর সবচেয়ে বড় বঙ্গবন্ধু বিদ্বেষী হন ব্যারিস্টার মওদুদ। এখন তিনি যে রাজনীতি করেন, তারা সরাসরি বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত। ৭৫’র ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সুবিধাভোগী যে দল, সেই দলের রাজনীতিকে ধারণ করে চলেছেন ব্যারিস্টার মওদুদ। তবে এটিই যে তাঁর শেষ গন্তব্য, তাও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবেন না। বহুবার গন্তব্য বদলেছেন ব্যারিস্টার মওদুদ। তিনি কখনো জাতীয় পার্টি, কখনো বিএনপির মধ্যে পিং পং বলের মতো এপাশ ওপাশ করেছেন।

আর বর্তমান জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ভ্রষ্ট রাজনীতির যেন এক মেলা বসেছে। এ কে খন্দকার ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালে বিমান বাহিনীর প্রধান। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পণ করে, সেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের নেতৃত্ব দিয়েছেন এ কে খন্দকর। সেই তিনিই শুধুমাত্র লোভে পড়ে ধানের শীষ প্রতীক নিতে যাচ্ছেন বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

রেজা কিবরিয়া, যাঁর পিতাকে হত্যা করেছিল বিএনপি জামাত জোট সরকার। ওই মামলায় এখনো বিচারাধীন, আসামিরা হলেন আরিফুল হক চৌধুরীসহ সিলেট অঞ্চলের বিএনপির নেতৃবৃন্দ। কিন্তু রেজা কিবরিয়া শুধুমাত্র মনোনয়নের জন্যই ধানের শীষ প্রতীক বেছে নিয়েছেন। এমন আদর্শিক স্থলনে, গা ঘিন ঘিন হওয়াই কী স্বাভাবিক নয়।

গোলাম মাওলা রনি, ভ্রষ্ট রাজনীতিদের সর্বশেষ সংযোজন। দুদিন আগেও তিনি টকশোতে, বিএনপিকে ধোলাই দিয়েছেন। এখন তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষে নির্বাচন করছেন। অথচ এই গোলাম মাওলা রনিকেই ২০০৮ সালে একরকম রাস্তা থেকে তুলে এনে সাংসদ বানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এখন ক্ষুদ্র স্বার্থেই সম্পূর্ণ আদর্শ উল্টে ফেললেন তিনি! এই রনিরাই যখন আদর্শ, নীতির কথা বললে, মানুষই লজ্জিত হয়।

ঐক্যফ্রন্টের তালিকার দিকে একবার তাকালেই বোঝা যায়, যাঁরা সেখানে এখন যোগ দিচ্ছেন, তাঁরা সবাই যাচ্ছেন একটা পদের আশায়, কোনো মোহে নীতি নৈতিকতার কাপড় খুলে, মোটামুটি দিগম্বর হয়েই রাজনীতির করছেন। আদর্শের এমন স্থলন দেখে লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে মানুষ।

এমন আদর্শের স্থলনের রাজনীতি শুধু ঐক্যফ্রন্টেই না, আছে অন্যান্য জোট-দলেও। শমসের মবিন চৌধুরী, কদিন আগেও প্রশ্রয় দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের, তাঁর হাত দিয়েই পদোন্নতি পেয়েছেন ৭৫ এর খুনিরা। এখন তিনি বঙ্গবন্ধুর নাম কপচাচ্ছেন। তিনি হৃদয় থেকে বঙ্গবন্ধু নাম নেন, নাকি নৌকাকে ধারণ করতে বঙ্গবন্ধুর নাম কপচান?

আবার যুক্তফ্রন্টের নেতা ও বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজা চৌধুরী, এক হাতে গীতা, আরেক হাতে কোরআন শরীফ রেখে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে হিন্দু রাষ্ট্র হবে। তাঁর সেই সাবাস বাংলাদেশ দিয়ে তিনি মিথ্যার বেসাতি গড়ে বিভ্রান্ত করেছিলেন দেশবাসীকে। তিনিও এখন হয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। নৌকা মার্কার লোভে তিনি ও তাঁর সন্তান সকাল-বিকেল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে বৈঠক করছে।

বাংলাদেশে রাজনীতির এই নোংরামিপনা, যে কোনো নোংরা ছবিকেও হার মানিয়ে দেয়। এক সময় অশ্লীল চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সেন্সর বোর্ড সোচ্চার হয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে, অশ্লীল রাজনীতির বিরুদ্ধেও একটি সেন্সর বোর্ড গঠন করা দরকার হয়ে পড়েছে।

এবারের নির্বাচনে ডিগবাজি, এক মেরু থেকে আরেক মেরুতে যাওয়ার যে প্রতিযোগিতা, সেখানে বাংলাদেশের ভ্রষ্ট রাজনীতিবিদদের তালিকা আরও দীর্ঘ হচ্ছে।

একটি কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য, ভ্রষ্ট রাজনীতি কখনোই মানুষ গ্রহণ করে না। যাঁরা এই ভ্রষ্ট রাজনীতি করে, তাঁদের মানুষ পতিত রাজনীতিবিদ হিসেবেই গণ্য করে। আদর্শ ভুল বা শুদ্ধ হতে পারে, কিন্তু একই আদর্শে যাঁরা থাকেন, তারাই জায়গা করে নেয় মানুষের হৃদয়ে।  

বাংলা ইনসাইডার/জেডএ