ঢাকা, শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

অরিত্রীদের আত্মহত্যা: সমাজ কতটা দায়ী?

সাকিব রহমান
প্রকাশিত: ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮ শনিবার, ০৪:৩১ পিএম
অরিত্রীদের আত্মহত্যা: সমাজ কতটা দায়ী?

ভিকারুননিসা নুন স্কুলের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে তাঁর সহপাঠী থেকে শুরু করে অভিভাবক এবং সরকারও। অরিত্রীর আত্মহত্যার পর ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনার’ অভিযোগ এনে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, শাখা প্রধান এবং এক শ্রেণীশিক্ষককে আসামি করে পল্টন থানায় একটি মামলা করেন তাঁর বাবা। মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের গঠিত তদন্ত কমিটিতে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে শিক্ষক কর্তৃক অরিত্রীকে আত্মহত্যার প্ররোচনার প্রমাণ পাওয়ায় শ্রেণীশিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি তৎপরতা দেখা গেছে প্রশাসনের মধ্যে। তাঁরা রাতারাতি তদন্ত কমিটি গঠন করে, দ্রুততার সহিত সেই কমিটির রিপোর্টও আদায় করে ফেলেছেন।

অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনা বেশ কিছুদিন ধরে ঘাপটি মেরে থাকা অনেক প্রশ্ন উসকে দিয়েছে। একজন স্কুলছাত্রী আত্মহত্যা করলো, নাকি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাকে ‘হত্যা’ করলো? কে আসলে দায়ী এসব ঘটনার পেছনে? বাবা-মা? সহপাঠী? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নাকি আসলে সমাজ? নাকি রাষ্ট্র? এই ‘হত্যাকাণ্ডগুলো’ সংঘটিত করবার যন্ত্র আসলে কোনটি?

‘হত্যাকান্ডগুলো’ বলা হচ্ছে কারণ, দুর্যোগ ফোরামের তথ্যানুযায়ী এবছর এইসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের সাতদিনের মধ্যে আত্মহত্যা করে ১৭ জন শিক্ষার্থী। শিশু অধিকার ফোরামের সমীক্ষা বলছে, এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর চারদিনে ৪৭জন আত্মহত্যার চেষ্টা করে। পিএসসি, জেএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া বা জিপিএ ফাইভ না পাওয়ায় বছরে আত্মহত্যা করে ১০ থেকে ১৫ জন। গত ফেব্রুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পড়াশুনা ও প্রেম সংক্রান্ত হতাশা, শিক্ষাব্যবস্থার ওপর ক্ষোভ, আর্থিক সংকট, সহপাঠীদের উপহাসসহ বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯জন শিক্ষার্থী।

খুব সহজেই কি আত্মহত্যার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়? অবশ্যই না। একজন আত্মহনকারী আত্মহত্যা করার পূর্বে বেশ কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। সমাজের নানা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, আশেপাশের মানুষদের ব্যবহার ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েন অনেকে।

ভিকারুননিসার ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় অনেকেই ব্যক্তিগত জীবনে শিক্ষক, বন্ধুবান্ধব, বাবা-মা, আত্মীয়স্বজনদের ‘ওই অপমানের কথা এখনো ভুলেননি’, ‘ওমুকের দেওয়া ব্যাথা আমাকে সারাজীবন কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে’ ইত্যাদি ইত্যাদি বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছেন।

অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় ঢালাওভাবে শিক্ষকদেরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে। সেটি কি যথার্থ? আমি মনে করি না। গোটা সমাজই দায়বদ্ধ। আমরা যখন কাউকে অপমান করি তখন কি কখনো ভেবে দেখি এর ফলটা কি হবে? গোটা সমাজের উচিৎ মানুষকে মানুষ হিসেবে মনে করা। কেউ খারাপ কিছু করলে তাঁকে উৎসাহিত করতে হবে। শাস্তি দেওয়ার নানবিধ নমুনা রয়েছে। কিন্ত উৎসাহিত করার কয়টা নজির স্থাপন করেন আমাদের সমাজের উচ্চস্তর থেকে নিম্নস্তরের মানুষেরা?

পিতামাতা যখন  সন্তানকে একজন ভালোমানুষ হিসেবে গড়ে  তুলতে চান তখন সন্তানকে অপমান করে, মারধর করে সেই ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবেননা কখনোই। একজন বাবা-মা সন্তান জন্ম হওয়ার পর দেখেন তাঁর ছেলে-মেয়ে বড় হচ্ছে কিনা, খাচ্ছে কিনা, মোটা হচ্ছে কিনা, পড়ালেখা করছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। এসবের পাশাপাশি তাঁর চিন্তার জগতটা বাড়ছে কিনা, পারিপার্শিকতা তৈরি হচ্ছে কিনা, নৈতিক আদর্শের দিকটা উন্নত হচ্ছে কিনা, সে স্বাধীনভাবে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারছে কিনা সেসব কখনোই ভেবে দেখতে চাননা। চাননা কেন? এসবের কোনোটিই জিপিএ ফাইভের সিলিবাসেই নেই।

বাবা-মা’রা প্রতিযোগিতা করে নামীদামী স্কুলে ভর্তি করিয়ে নিজেরাই স্কুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। ছেলেমেয়ের কাঁধে বইয়ের বস্তা তুলে দিয়ে দিয়ে স্কুল, কোচিং, টিউশন, ক্লাস টেস্ট, টিউশনে পরীক্ষা, কোচিংয়ে পরীক্ষায় দিনরাত এক করে ছেলেমেয়েদের রেসের ঘোড়ার মত দৌড় করান। শুধু চার, ছক্কা মারতে হবে। সেটা যেকোন উপায়েই হোক না কেন। জিপিএ ফাইভ চাই’ই চাই। নাহলে সমাজে ইজ্জত থাকবে না।

পাবলিক পরীক্ষায় কিংবা ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষার আগে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ দেখা যায়। কিন্ত সেসব কথিত প্রশ্ন পাওয়া যায় মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে। কিন্ত একজন শিক্ষার্থী সেই বড় অংকের টাকার জোগানটা কোথায় পান? খুবই স্বাভাবিক বিষয়। এই টাকাটার যোগান অভিভাবকরাই দিয়ে থাকেন। ছেলে-মেয়ে কোন পরীক্ষায় খারাপ করলে বলতে শোনা যায়, ‘তোমার জন্য সমাজে আমার মাথা নিচু হয়ে গেছে।‘ অথচ সন্তানকে নিয়ে প্রশ্নফাসের মত গর্হিত কাজ করে সন্তানের সামনে সেই সমস্ত বাবা-মা’র লজ্জায় মাথা নিচু হয়না।

আমাদের সমাজে বেশিরভাগ মানুষকেই পরিবারের প্রধানদের মেনে চলতে হয়। যেকোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিবারের প্রধানের সিদ্ধান্তই চাপিয়ে দেওয়া হয় নিজস্ব মতামত যাইহোক না কেন। এদেশের অধিকাংশ ছেলে বা মেয়ে নিজের পড়শুনা শেষ করার পর যখন চাকরীক্ষেত্রে অগ্রসর হতে যাবে তখনো পরিবারই নির্ধারণ করে দেয় সে কি ধরনের চাকরি করবে। অথচ ছেলেটি বা মেয়েটি কিন্তু স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি সব জায়গাতেই নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দিয়ে বাবা-মা’র ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে এসেছেন। এখানেও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই। পরিবারের প্রধানও আবার সমাজের ভয়ে চুপসে যান। 

আবার কেউ যখন পড়াশুনা শেষ করেও প্রত্যাশিত চাকরি পাননা তখন বাবা-মা, চাচা,মামা শুরু করে পাশের বাসার, এলাকার লোকজন কানাঘুষা শুরু করে দেন। আবার অনেকে সরাসরি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বিষিয়ে তোলেন। এসব ঘটনায় অনেকেই হতাশায় ভোগেন। চরম অপমানে কেউ কেউ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিতেও পিছপা হননা। গোটা সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়াই আমাদেরকে ধীরে ধীরে আত্মঘাতী করে তুলছে। আমরা ভালো মানুষের চেয়ে বেশি ভালো জিপিএ, ভালো চাকরি, ভালো বাড়ি, ভালো গাড়ি, সুনাম সর্বোপরি খ্যাতির পেছনে ছুটছি। বাড়ছে প্রত্যাশা। সেইসঙ্গে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হতাশা। অতি হতাশাই আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে।

বাংলা ইনসাইডার/এসআর/জেডএ