ঢাকা, বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতবে ১১ কারণে

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ বৃহস্পতিবার, ০১:৫৫ পিএম
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতবে ১১ কারণে

বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ৩০শে ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে। নির্বাচনী জ্বরে আক্রান্ত সারা দেশের মানুষ। নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের মনে কোন না কোন বিষয়ের প্রতি দুর্বলতা থাকে। অনেকটা ইচ্ছা অনিচ্ছার দোলায় আমরা সেখানে ভোট দিই। আমরা অনেক কিছুর প্রতি অনেক সময় যৌক্তিক কারণে বা কারণ ছাড়াও দুর্বলতা দেখাতে পারি। তবে যে যাই বলুক না কেন, মোটা দাগে ১১টি প্রধান কারণে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট ২০০৮ সালের মত বিপুল ভোটে ক্ষমতায় আসবে বলে অনেকেই মনে করছেন। কারণগুলো হলো-           

১. বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা ও অবাধ তথ্য প্রবাহঃ ১৯৯০ সালে জাতীয় সংসদ কর্তৃক ‘প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক আইন’ গৃহীত হয় এবং ঐ বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশ গেজেটের এক অতিরিক্ত সংখ্যায় বিজ্ঞাপিত হয়। ১ জানুয়ারি, ১৯৯২ সাল থেকে সারা দেশের ৬৮টি থানায় একসঙ্গে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন করা হয়। ১৯৯২ যে শিশু জন্ম নিয়েছে এখন তাঁদের বয়স ২৭ বছর। এর অর্থ হল আমাদের দেশের ৩৪ বছর বয়সীর নীচের জেনারেশন প্রায় পুরোটাই কম বেশী শিক্ষিত। শিক্ষা মানুষের ব্রেইনের এনালিটিক্যাল ফ্যাকাল্টি শার্প করে। তাই বর্তমান অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে বাংলাদেশের মানুষ বুঝতে শিখেছেন কোনটা সঠিক বা সত্য আর কোনটা বেঠিক বা মিথ্যা। সরকারী দল আর প্রধান প্রধান বিরোধীদলের মিথ্যাচার তারা ধরতে পারে। রক্তের বা পরিবেশের বাধ্যবাধকতা না থাকলে মানুষ সত্যের পথ নেবে, তাই তাঁদের ভুল করার কোন কারণ নেই। এই হিসেবে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ তুলনামূলকভাবে সত্যের পথে থেকে ভোটের রাজনীতিতে বেশ এগিয়ে।

২. বেপরোয়া মনোনয়ন বাণিজ্যের প্রভাবঃ মানুষ সত্য সুন্দরের পূজারী। উপায় থাকলে কেউ মিথ্যার আশ্রয় নিতে চান না, অসৎ পথে পা বাড়ান না। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিএনপি, মান্না সাহেবের ‘লাশের রাজনীতির’ দল, আর এরশাদ সাহেবের জাতীয় পার্টি অনেকটা প্রকাশ্যেই বেপরোয়া মনোনয়ন বাণিজ্য করে দলের ত্যাগী নেতাদের বঞ্চিত করেছেন। এতে শুধু তাঁদের দলের নেতারাই নন অনেক কর্মী সমর্থক হতাশ হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। অনেকেই দল বদল করেছেন। এভাবেই বাংলাদেশের ক্ষুদ্র একটা শ্রেণি বিশ্বের অন্যতম সৎ সরকার প্রধান শেখ হাসিনার দলের দিকে ঝুঁকেছেন।               

৩. স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে জোটঃ বাংলাদেশের মানুষ মহান স্বাধীনতায় বিরোধীদের বা ১৯৭১ সালের খুনি, অগ্নিসংযোগকারী, ধর্ষক, লুটেরাদের খুউব অপছন্দ করেন। তাঁর প্রমাণ ২০০৮ সালের নির্বাচনের ফল, আর গণজাগরণ মঞ্চের বিপুল জনপ্রিয়তা। ড. কামাল বা তারেক জিয়ার স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াতের সঙ্গে জোট বাংলার মানুষ ভালভাবে নেননি। তাঁরা তাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির দিকে ঝুঁকবেন, তা অনুমান খুবই সহজ।

৪. বিরোধীদলের মাত্রাতিরিক্ত পাকিস্তান প্রীতিঃ পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর সঙ্গে ড. কামাল (যার স্ত্রী পাকিস্তানী) ও তারেক জিয়ার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে বলে সাধারণ মানুষের মনে করার যৌক্তিক কারণ আছে। পাকিস্তান সরাসরি মানবতাবিরোধী অপরাধীদের পক্ষ নিয়ে তাদের সংসদে বিল পাশ করেছে। আইএসআই এর সঙ্গে জামায়াত, বিএনপি তথা তারেক জিয়ার ও তাঁর দলের নেতাদের হট কানেকশন এখন ওপেন সিক্রেট। ঢাকাস্থ পাকিস্তান দূতাবাসের কর্তাদের মঙ্গে সশরীরে বৈঠক আর টেলি সংলাপের অডিও রেকর্ড নেট দুনিয়ায় ভাইরাল। এটা বাংলাদেশের মানুষ পছন্দ করেন না। তাই তাঁরা পাকিস্তান বিরোধীদের পক্ষ নেবেন।

৫. বিরোধীদলের দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়াঃ বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাংকিং খাতে ২২ হাজার কোটি টাকা লোপাট বা দুর্নীতির যে অভিযোগ আনা হয় তা আংশিক সত্য। এর বেশীরভাগই আগের সরকারের আমলের। বরং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা বর্তমান সরকারের আছে। প্রতিটি ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ার পরে সরকার আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু বিএনপির তারেক জিয়া, কোকোসহ বহু নেতা যে মহাদুর্নীতিবাজ তা পানামা পেপারস আর প্যারাডাইস পেপারে এসেছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার বাইরেও কোকোর দুর্নীতির কথা জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের হ্যান্ডবুকে রয়েছে। এগুলো বাংলাদেশে মানুষ ভালোভাবে নেন না তার প্রভাব পড়বে ব্যালটে ২০০৮ সালের মত করে।              

৬. সন্ত্রাসের পৃষ্টপোষকতাঃ সবাই জানেন যে বর্তমান আওয়মি লীগ সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র খুব একটা পছন্দ করে না। তবুও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি, জামাত ও ঐক্যফ্রন্টের ৪৭ জন প্রার্থীর ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশের মার্কিন দূতাবাস। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেনের কাছে গত সোমবার এই ৪৭ প্রার্থীর তালিকা পাঠিয়েছে তারা। দূতাবাসটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেসব ব্যক্তি কিংবা দল সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত সে বা তারা কখনোই গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক হতে পারেনা। বরং গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক তারা। এই ৪৭ জনের মধ্যে ২৪ বা ২৫ জন জামায়াতের বাকীরা সবাই বিএনপি’র। এদের সঙ্গে আইএস বা এ ধরণের ধর্মীয় সন্ত্রাসী জঙ্গি সংগঠনের বিশেষ যোগাযোগের প্রমাণ আছে। বর্তমান সরকার সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কারণে সারা দুনিয়ায় প্রশংসিত। অন্যদিকে বাংলার মানুষ ধার্মিক কিন্তু ধর্মাশ্রয়ী সন্ত্রাসের চরম বিপক্ষে। তাই তাদের সমর্থন বর্তমান সরকারের দিকে ঝুঁকেছে।

৭. মিথ্যাচার করাঃ ছয় কংগ্রেসম্যানের স্বাক্ষর নকল করে বিবৃতি জালিয়াতি, ভারতীয় জনতা পার্টির প্রধান অমিত শাহের সঙ্গে ফোনালাপের মিথ্যা দাবি, আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পর বেগম খালেদা জিয়ার কথিত ইনজেকশনের দাবি কিংবা জাতিসংঘ মহাসচিবের দাওয়াত নিয়ে হালের ফখরুল সাহেবের আমেরিকায় যাওয়া বিএনপি’র মিথ্যাচারের কয়েকটি নমুনা মাত্র। আওয়ামী লীগের গায়ে জামায়াতের নোংরা গন্ধ লাগানোর চেষ্টার এই মিথ্যাচার নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ মুখ টিপে হাসেন, তাই বিএনপি’র পক্ষ নিতে তাঁরা ইচ্ছুক হবেন না এটাই স্বাভাবিক।             

৮. উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করাঃ বিদেশী বিনিয়োগ বা ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) যে কোন উন্নয়নকামী দেশে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দেশী বিনিয়োগকারীদের ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করে, তাঁদের নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করে, আর্থিক সামর্থ্য বাড়ায়। উদাহরণ হিসেবে টাটার কাছে চাঁদা দাবি, সাবমেরিন কেবল বসানোর জন্য বিদেশী কোম্পানির কাছে চাঁদা দাবি, সিমেন্সের কাছে চাঁদা নেওয়াসহ বিদেশী বহু কোম্পানির কাছে চাঁদা নেয়ার খবর বাংলাদেশের ব্যবসায়ী মহলের মানুষ ভাল ভাবে নেয়নি। দেশি কোম্পানিও তাঁদের চাদার হাত থেকে রেহাই পায় নি তাঁর প্রমান ভুরি ভুরি।           

৯. বঙ্গবন্ধুকে অসম্মান করাঃ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বঙ্গবন্ধু নিয়ে খারাপ কথা বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ পছন্দ করেন না। সেই বঙ্গবন্ধুকে বিতর্কিত করতে খালেদা জিয়া ১৫ আগস্ট, বঙ্গবন্ধু নিহত হবার দিন নিজের ভুয়া জন্মদিন পালন করেন। তারেক জিয়া বঙ্গবন্ধুকে অসম্মান করে কথা বলেন। তা বাংলার মানুষ এমন কি তাঁর দলের নেতারাও ভালোভাবে নেন না। যারা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে যত বেশী বাজে কথা বলবেন তাদের জনপ্রিয়তা ততো কমবে, আমাদের দেশের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিসংখ্যান তাই বলে। 

১০. রাজনৈতিক স্থিতিশিলতাঃ ২০০৮ সাল থেকে প্রায় ৯ বছর (২০১৪ বাদে) দেশে বড় ধরণের কোন গোলযোগ বা হরতাল, ধর্মঘট, বন্ধ পালিত হতে পারেনি বর্তমান সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপের কারণে। এটার ফলে দলমত নির্বিশেষে সকল ব্যবসায়ী খুশি। ইচ্ছা না থাকলেও তাঁরা এই সরকারের উন্নয়ন যাত্রার ধারাবাহিকতা চান, তাঁদের রাজনৈতিক মতাদর্শের উপরে উঠে। সারা দেশে যে উন্নয়নযজ্ঞ চলছে তাতে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী মোটা দাগে আর্থিকভাবে লাভবান। তাঁরা রাজনৈতিক স্থিতিশিলতা রক্ষায় বর্তমান সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা চান।       

১১. দেশের সব শ্রেণির মানুষের আয় বৃদ্ধিঃ আগেই বলা হয়েছে, দেশে উন্নয়নের মহাযজ্ঞ চলছে। ফলে বহু মানুষের কর্মসংস্থানই শুধু হয়নি, বাংলাদেশের বাজারে টাকার প্রবাহ বা মানি সার্কুলেশন বেড়ে গেছে যার ছিটেফোঁটার অংশ একেবারে রিকশাওয়ালাও পাচ্ছেন, পাচ্ছেন গ্রামের কৃষি শ্রমিকেরাও। বাংলাদেশ কৃষির আংশিক আধুনিকায়ন, বিকাশমান শিল্পের কারণে সারভিস সেক্টরও অনেকটা এগিয়ে গেছে। যাতে করে গ্রামের কৃষিতে শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, তাঁদের শ্রমের মূল্য বেড়েছে। কৃষি শ্রমিকেরা তাই খুশি। শহরের রিক্সাওয়ালার আয় ভালো। অন্যান্য শিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরী নির্ধারণে শিল্প মালিক আর শমিক উভয়েই একটু একটু নাখোশ। এর অর্থ এই যে তাঁরা উভয়েই খুশি। সরকারী চাকুরীর বেতন বেড়েছে। বেসরকারী চাকুরীজীবীগণ পেনশন পাবেন এমন সরকারী সিদ্ধান্তে তাঁদের মাঝেও একটা প্রশান্তির সুবাতাস বইছে।

বিদেশি কোন পত্রিকা বা কোন দেশের সরকার শেখ হাসিনা সরকারের প্রশংসা করে কী বললেন তার চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় কারণ (কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার স্বীকৃতি দেশের একটা বিরাট ধর্মভীরু দরিদ্র শ্রেণিকে সম্মানের সঙ্গে বাঁচার আশা জাগিয়েছে)। উপরের সব কিছুর সঙ্গে আরো কিছু কারণ আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচনে মহাজোটের পক্ষে ভোটের রাজনীতিতে একটা ভাল প্রভাব ফেলবে। তাই অনেকেই মনে করেন যে, বড় কোন অঘটন না ঘটলে আগামী ৩০শে ডিসেম্বর ২০০৮ সালের মত বিপুল ভোটেই মহাজোট জিতবে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।   

বাংলা ইনসাইডার