ঢাকা, রোববার, ১৮ আগস্ট ২০১৯, ২ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি

বিমলেশ চৌধুরী
প্রকাশিত: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ মঙ্গলবার, ১২:০৮ পিএম
প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি

বাংলায় দুইশত বছর বৃটিশ রাজত্ব ছিল, তৎপূর্বে নবাব আমল এবং তার পূর্বে অনেক রাজত্বের কথা আমাদের সকলেরই কমবেশী জানা আছে। এ দেশে ঢাল তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধের কথাও জানেন। সভ্যতার ক্রম বিবর্তনে পৃথিবী জুড়ে অত্যাধুনিক যুদ্ধও চলেছে। এ কথাগুলোর অবতারণা করছি এই কারণে যে যুগের পরিবর্তন হচ্ছে। সভ্যতার বিকাশ ঘটছে। পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে বর্তমান সরকারের হাত ধরে বাংলাদেশও এগিয়ে যাচ্ছে সমান গতিতে। তবে প্রশ্ন হলো এ এগিয়ে যাবার গতিতে অনেক সময়ই বাধা আসে। আমরা আবার সেটা কাটিয়েও উঠছি। তাহলে আমরা আজ কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? কোন সম্ভাবনা আছে আমাদের? আমরা আজ গর্বিত আমরা বাঙালী। আমরা বাংলাদেশের মানুষ। বৃটিশ শাসনের পর তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার এদেশে শাসন করেছে দীর্ঘ ২৪ বছর। আবার আমরা বাঙালী, বাংলাদেশের বয়স ৪৭ পেরিয়ে গেছে। আজ এর সার্বভৌমত্ব নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলার চিন্তাও করতে পারে না বা তার সুযোগও কোনদিন নেই তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। বরেণ্য কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বলে গেছেন ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি’।  তার এই অমোঘ বাণী একটু চিন্তা করে দেখা যেতে পারে, তাহলে যে মাটি থেকে সোনার ফসল ফলে, যে নদীতে মিঠা পানির প্রবাহ, যেখানে সবুজের সমারোহ চোখের চারধারে নিয়মিতভাবে আমাদের জীবনে দোলা দিয়ে যায়। যে সমুদ্রের ধারে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলে মনে হয় আমি যদি পাখি হয়ে উড়ে যেতে পারতাম, সেই সমুদ্রের দিগন্তে! বাংলার প্রতিচ্ছবির কল্পনায় অনেক দূরে চলে গেছি কিন্তু পেছনে ফিরে কী দেখতে পাই?

আমরা বাঙালী-মনে হয় এত সহজ, সরল, হৃদয়বান মানুষ ক’টা দেশের আছে আমার সন্দেহ হয়। তাহলে কি সেটাই আমাদের দুর্বলতা? তাহলে আমরা নিজেরাই এত সুন্দর দেশটাকে কেন ঠিকমতো চিনতে পারছি না? এর কারণ অনুসন্ধান করা উচিত। যে দেশের স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এতটা আন্তরিক, সে দেশের উন্নয়ন আরো বেশী হওয়ার কথা বৈকি! আমাদের দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যক্তি যদি সংখ্যা লঘুদের সম্মান দিতে না থাকেন তবে নিজেকে সম্মান পাওয়ার আশা করা যায় কি? আবার লঘিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের কিন্তু কিছুটা সীমাবদ্ধতা থাকে। ইচ্ছামত আবদারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া সেটা কিন্তু সবসময সম্ভব না। সবকিছুরই একটা পরিমিত ভাষা আছে। যা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। তবে পারতঃপক্ষে ক্ষমতাসীনদের চেষ্টা করা উচিত সংখ্যা লঘিষ্ঠদের সম্মান দেওয়া। নিন্দুক আছে বলেই কিন্তু মানুষের নিন্দার ভয় থাকে। সমালোচনা আছে বলেই নিজের ভুল শোধরানোর সূযোগ থাকে।

স্বাধীনতা অর্থটিকে সঠিক বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হই আমরা সবসময়। সরকারের কাছে চাওয়ার অনেক কিছুই থাকে কিন্তু বিরোধীদল কি তাদের দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করেছে ৪০ বছরের কোন আমলে? না মোটেই না। সরকার ভাবে বেশী সমর্থনই সব আর বিরোধীদল করে ওয়াক আউট। এই চিন্তার অবসান দরকার। সংসদ বর্জন কিংবা রাজপথে আন্দোলন। তাতে কতটুকু দেশের উন্নতি হয়েছে? কি পেয়েছে সাধারণ জনগন? আগেই বলেছি এ দেশের জনগণ সহজ-সরল, তাইতো সবই সহ্য করে নেয়। তারা ভালো বলেই দুর্নীতিবাজরা আজও দেশটাকে অস্থিতিশীল করে রেখেছেন কিংবা পারছেন। তা না হলে পারতেন না। তাই জনগণকে বুঝতে শিখতে হবে সবার আগে। আর এভাবে চলতে দেওয়া ঠিক নয়। আজ আমরা আশাবাদী কারণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার শক্ত হাতে নেমেছেন জনগণের জন্য। প্রতিদিন টেলিভিশন চ্যানেল গুলোতে অনেক ভালো ভালো টকশো হয়। তাতে লাভ কী? কে শুনছে কার কথা? আমাদের সমাজ থেকে সুবচন নির্বাসনে গেছে অনেক আগে থেকেই, শোডাউন শক্তিশালী করতে পারলেই একেবারে বাজিমাত। কত জ্ঞাণী ব্যক্তির দর্শন আজ শাস্ত্রে পরিণত হয় এর চেয়ে আর কি দুঃখ আছে? তাদের দর্শনের মুল্য কি এতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে? না হচ্ছে না। শুধু দলের নেতৃবৃন্দ কতটুকু বাচনভঙ্গি দিয়ে ভোলাতে পারে? তাদের বক্তব্য কি বাচনমুলক নাকি নতুন দর্শন দিয়ে দেশের কল্যাণ করতে পারছে? হোক সরকার দল না হোক বিরোধী দল। 

অতীতে দেখেছি সংসদে বসে দুই দলের বাচনভঙ্গি শুনতে বেশ ভালোই লাগে। কারণ মনে হয় ভালোই তো আমাদের দেশে বক্তার অভাব নেই। আর এর প্রশিক্ষণ হয় নির্বাচনের পূর্বে যেখানে জনমত শ্রেষ্ঠ বক্তাকে প্রাধান্য দেয়। সেখানে ব্যক্তিত্যের ওজন নয় বরং বক্তার ওজনই প্রাধান্য লাভ করে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে। তাইতো সংসদে বক্তৃতার ঝড় ওঠে কিন্তু জনকল্যাণকর কিছুই হয় না সবসময়। দলকে জাগিয়ে ওঠানোই মুখ্য, দেশকে নয়। তবে যে এর ব্যতিক্রম হয় না তা নয়। দেশে জনগণকে বক্তৃতা দিয়ে শুধু ভোলাতে চেষ্টা করলে তার ফল খুব বেশী ভালো হয় না আর সংসদের মতো পবিত্র এবং ব্যয়বহুল জায়গায় বসে নিজেদের গুণগান না করে জনগণের কথা বলুন, দেশকে এগিয়ে নেয়ার কথা বলুন। সাধারণ মানুষ আজ এটাই চায়। আপনারা জনগণের কাছে ওয়াদা করে সংসদে গিয়েছেন। নিজেদের কথা ভুলে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হন সবক্ষেত্রে।

একটি কথা না বলে পারছি না। সত্যকে স্বীকার করতে শিখুন। যাদের বয়স ৫০ এর উপরে তারা বাংলাদেশের ইতিহাস স্বচক্ষে দেখেছেন কিংবা বোঝার বয়স তখন হয়েছিল। দেশটার রূপকার কে তাকে স্বীকার করার সৎসাহস প্রত্যেকের থাকা উচিত সবসময়। না হলে সত্যকে অস্বীকার করা হবে। একদিন সাড়ে সাত কোটি মানুষ একমত হয়ে এক পথ দিয়ে হেঁটেই কিন্তু গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে পেরেছিল, নইলে আমরা কোথায় থাকতাম একবার ভেবে দেখুন। পাপকে ঘৃণা করে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে তবেই আমরা মুক্ত স্বাধীন, সচেতন মানুষের মর্যাদা লাভ করে চিরদিন মাথা উচু করে বিশ্বকে দেখিয়ে দেব আমার সোনার বাংলা, রূপসী বাংলার কি অপরূপ রূপ!

আমাদের দেশে যা সম্পদ আছে তাতে সোনার থালায় না হোক রূপোর থালায় খাবার কথা। সবাই সুখে দুঃখে এক হয়, প্রাসঙ্গিক বন্ধনে শত্রু নয়, বন্ধু হয়ে থাকতে পারি এই প্রত্যাশাই রইল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কখন হয় যখন নিজেদের মধ্যে অবিশ্বাস দেখা দেয়। তিন বার তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা চালু হয়েছে অর্থাৎ পনের বছর আমাদের মধ্যে অবিশ্বাস আছে। নিজেদের যখন মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে তোলা হয় তখন আমাদের ভাবমূর্তি খুব বেশী উন্নত হয় না বহিঃবিশ্বের কাছে। কারণ আমরাতো নিজেদেরকেই নিজেরা বিশ্বাস করি না। তার অবশ্য অনেক কারণও আছে। যখন দেখা যায় কোন দল ক্ষমতায় আসলে একতরফাভাবে সবক্ষেত্রে দলীয়করণ করা হয়। উচুপর্যায় থেকে একেবারে নিচ পর্যন্ত সবকিছু নিজেদের দখলে নেয়া চাই। এ লজ্জা থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে। জনগণকে সৎ হতে হবে দেশকে বাঁচাতে হলে। নইলে কোনদিনই অন্ধকার তিমির থেকে আলোর মুখ দেখতে পারবো না। বিশ্বের কাছে আমরা দুর্নীতিমুক্ত জাতি হিসেবে পরিচয় দিতে পারবো না। কাজেই আবার পরীক্ষা হোক। সবাইকে নিয়ে এক সাথে কাজ করার মধ্যেই সার্থকতা লুকিয়ে আছে। ক্ষমতায় যাওয়া আর না যাওয়া মূল বিষয় নয়। হিংসা বিদ্বেষ ভুলে সবাইকে একসাথে এগিয়ে আসতে হবে, সাহায্য করতে হবে সরকারকে। আর রাজনীতি যদি করতেই হয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে রাজনীতিতে নামতে হবে। এটি দল আর দেশ উভয়ের জন্যই মঙ্গলকর। আর এমন প্রত্যাশা একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে নতুন সরকারের কাছে সবসময়, আশা রাখি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের নিরাশ করবেন না কখনই। কারণ সবাই মিলে সোনার বাংলা গড়তে হবে নতুন প্রজন্মের জন্য।    

 

বিমলেশ চৌধুরী

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শিল্প সমালোচক।