ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৯ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

আরেকটি ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপট

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সোমবার, ০৪:০৮ পিএম
আরেকটি ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপট

কৌশলী বামাতি, জামাতি, নষ্ট-ভ্রষ্টরা আবার একাট্টা হয়েছেন। যেমনটির শুরু হয় ১৯৭২ সালে ৩১শে অক্টোবর আদর্শচ্যুত মুক্তিযোদ্ধা মেজর মোহাম্মদ আবদুল জলিলের নেতৃত্বে সাত সদস্য বিশিষ্ট জাসদের আহ্বায়ক কমিটি গঠনের মাধ্যমে। যার ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিল দেশের তাবৎ স্বাধীনতা বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকরা।   

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর জলিল। ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী হিসেবে মেজর জলিলকে বন্দী করা হয় নৈতিক স্খলনের অপরাধে। কেড়ে নেয়া হলো তাকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেয়া সম্মানসূচক পদক। মেজর জলিলের অপরাধ ছিল মারাত্মক নৈতিক স্খলনের তাই সদ্যস্বাধীন দেশে তা প্রকাশ করতে বারণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। সংবাদের সিনিয়র সাংবাদিক সন্তোস গুপ্তকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন এই সত্য প্রকাশের ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হতে পারে।

যা হোক, আদর্শচ্যুত মুক্তিযোদ্ধা মেজর মোহাম্মদ আবদুল জলিলের নেতৃত্বে ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাসদের যাত্রা শুরু হলেও ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত অতিরিক্ত কাউন্সিলে ১০৫ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই সম্মেলনে জাসদ তার ঘোষণাপত্রও অনুমোদন করে। সেই ঘোষণাপত্রে সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র তথা শ্রেণিহীন শোষণহীন কৃষক শ্রমিকরাজ প্রতিষ্ঠা করার ঘোষণা দেয়া হয়। এর মাত্র কয়েকদিন আগেই অসাম্প্রদায়িক এক বাংলাদেশ গড়ার প্রয়াসে বঙ্গবন্ধু নিষিদ্ধ করেন একাত্তরে ধর্মের নামে ব্যভিচারী, ধর্ষক, নিপীড়ক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগসহ এ দেশে ক্রিয়াশীল ধর্মভিত্তিক সব রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। জাসদের আত্মপ্রকাশে স্বাধীনতা বিরোধী ধর্মভিত্তিক দল আর চৈনিক বামেরা, যাদের অধিকাংশই ছিল মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে, সবাই জাসদের ছায়াতলে সমবেত হতে থাকে। ১৯৭১ সালে যারা সামাজিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় পারিবারিকভাবে বাধ্য হয়ে নিজেদের আদর্শের বাইরে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, তাঁরা স্বাধীনতার অব্যহতি পরেই নিজ নিজ ঘরে ফিরেছে, যেতে চেয়েছে জাসদের  ঘাড়ে ভর করে। তাই এর ফলে ৭ মার্চ ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ২৩৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, শতকরা ৭ ভাগ (১,২২৯,১১০) ভোট পেয়ে ৫টি আসনে বিজয়ী হয়ে তাক লাগিয়ে দেয়। আসলে এই ৫টি আসনে জাসদের বিজয় ছিল মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী আর বিভ্রান্ত বা আদর্শচ্যুত মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বিত প্রয়াসের ফসল।  

জাসদ ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ পল্টন ময়দানের জনসভা শেষে প্রায় হাজার ত্রিশ উত্তেজিত জনতার এক বিক্ষোভ মিছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দেয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। মিছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ির সামনে পৌঁছলে পুলিশের সঙ্গে জনতার খণ্ডযুদ্ধ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রক্ষীবাহিনী তলব করা হয় এবং রক্ষীবাহিনীর গুলিতে প্রায় ২২/২৩ জন জাসদ কর্মী নিহত হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। এরই প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়া এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ড্রেজার বিভাগের পরিচালক পদে চাকরিরত অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল আবু তাহেরকে ফিল্ড কমান্ডার এবং জাতীয় কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক হাসানুল হক ইনুকে ডেপুটি কমান্ডার করে জাসদের গণবাহিনী গঠন করা হয়। মাঠ পর্যায়ে এই গণবাহিনীতে যোগ দেয় স্বাধীনতা বিরোধী ধর্মভিত্তিক দল আর চৈনিক বামের স্থানীয় কর্মীরা। সারা দেশজুড়ে এমন অরাজক পরিস্থিতি তৈরী হয় তাতে জাসদের গণবাহিনীর কেন্দ্রীয় বা জেলা কমাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ছিল না যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে। জাসদের গণবাহিনীর গ্রাম এলাকার সশস্ত্র সদস্যরা খুন খারাবী, ছিনতাই, ডাকাতি ইত্যাদিতে জড়িত হয়ে পড়ে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ তাদের আরও বেপরোয়া করে, জনমনে বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রতি ক্ষোভের আগুন জ্বলতে থাকে। জাসদের গণবাহিনীর সশস্ত্র সদস্যদের অত্যাচার থেকে গ্রামের সাধারণ জনগণকে নিরাপত্তা দিতে অনেক এলাকায় রক্ষীবাহিনী নামানো হলেও তাতে ফল আশানারূপ হয় না। বরং খারাপ হয়। দিনে রক্ষীবাহিনী আর রাতে জাসদের সশস্ত্র গণবাহিনীর অত্যাচারে সারা দেশে বিভিন্ন এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। গণবাহিনীতে যোগ দেওয়া স্বাধীনতা বিরোধী ধর্মভিত্তিক দল আর চৈনিক বামের স্থানীয় কর্মীরা ১৯৭১ সালে তাদের পরাজয়ের পরিশোধ নিতে এতোই মরিয়া ছিলো যে, তাঁরা তাদের অনেক নেতার কথাই মানত না। এটা নিয়ে বিরোধ চরমে উঠলে জাসদের সশস্ত্র গণবাহিনীর স্থানীয় পর্যায়ে অনেক ছোট ছোট উপদল তৈরী হয় অমুক বাহিনী, তমুক বাহিনী নামে।  

১৯৭২ সালের পরে স্বাধীনতা বিরোধী ধর্মভিত্তিক দল আর চৈনিক বামের কর্মী সমর্থকরা জাসদে যোগ দিয়েছিলেন বা ছায়াতলে ছিলেন, তাঁদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরে ধীরে ধীরে নিজেদের আদর্শের দলে ফিরে যান। জাসদের প্রতিষ্ঠাতা মেজর এম এ জলিল নিজেও ইসলামী দল গঠন করেন। জাসদের পত্রিকা গণকন্ঠের সম্পাদক সদ্য প্রয়াত কবি আল মাহমুদ তাঁর নিজের ঠিকানা জামায়াতে ফিরে যান।

বিএনপিতে যোগ দিয়ে এমপি হন ৫০ জনেরও বেশী। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, শাজাহান সিরাজ, রাবেয়া সিরাজ, স্পিকার মরহুম শেখ রাজ্জাক আলী, আবদুস সালাম, ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন, কলিমউদ্দিন মিলন, আবুল হোসেন খান, জি এম ফজলুল হক, অ্যাডভোকেট গৌতম চক্রবর্তী, লুত্ফর রহমান খান আজাদ, ভিপি জয়নাল আবেদীন, মারুফ কামাল খান সোহেলসহ অনেকে।       

জাতীয় পার্টিতে-যোগদানকারীদের মধ্যে এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, এ বি এম শাহজাহান, আজম খান, বর্তমান এমপি লক্ষ্মীপুর-২ আসনের নোমান মিয়া ও বগুড়া-২ আসনের শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ, শামসুল আলম মাস্টার, আবদুস সাত্তার মিয়া, রেজাউল ইসলাম ভূইয়া, অধ্যাপক ইকবাল হোসেন রাজু, দিদারুল আলম দিদার, গোলাম মোহাম্মদ রাজু, শাহ ই আযম, মুন্সীগঞ্জের জামাল হোসেন, নোয়াখালীর ফজলে এলাহী, চট্টগ্রামের মাজহারুল হক, বগুড়া সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম জাকারিয়া খান অন্যতম। 

এছাড়া জাসদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আসম আব্দুর রব, মাহামুদুর রহমান মান্নাসহ আরও অনেকেই জামায়াতের সাথে জোট করে ধানের শীষ প্রতীকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। আর এদের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছেন ড. কামাল হোসেনের মত মানুষ। তবে এখনো যারা অন্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ ও লালন করেন তাঁদের অনেকেই আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন বা আওয়ামী লীগের সাথে জোট করে নির্বাচন করেছেন। 

১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর থেকে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে এ পর্যন্ত অন্তত ১৯ বার হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছে। এছাড়া দেশি-বিদেশি পর্যায়ে তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছে আরও অন্তত পাঁচ দফা। শেখ হাসিনার ওপর এসব হামলার ঘটনায় অন্তত ৬৬ জন দলীয় নেতা-কর্মী নিহত হওয়ার হিসাব আছে। উইকিলিক্স তাদের প্রকাশিত পিলখানা সিক্রেটে পিলে চমকানো খবর দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় যা এখন ভাইরাল। খবরে বলা হয়েছে যে, পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর বরাদ্দ করা ৬০ কোটি পাকিস্তানী রুপি ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ১৫ জন শ্যুটার যোগান সহায়তায় বিএনপি-জামায়াত জোট ২০০৯ সালে ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহের নামে পিলখানা হত্যাকাণ্ডে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের ৭৪ জন কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয় যার মধ্যে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ছিল ৫৭ জন। আসল লক্ষ্য ছিল সরকারের পতন। এটা করতে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই প্রায় ২০০ ইমেইল যোগাযোগ করে। পিলখানা ঘটনায় সরকারের পতন না হলে নিরাপত্তাহীন হতে পারেন এই আশঙ্কা থেকে হত্যাকাণ্ড শুরুর দুই ঘণ্টা আগেই খালেদা জিয়াকে তাঁর ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে পাকিস্তান হাইকমিশন হয়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন তারেক জিয়া বলে উইকিলিক্স দাবি করেছে। হত্যাকাণ্ডের পরে এবং মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রেও বিএনপি-জামায়াতের আইনজীবীরা পিলখানা হত্যাকাণ্ডের আসামীদের পক্ষ নিয়ে লড়েছেন, লড়ছেন।

এমতাবস্থায় জামায়াতের বিলুপ্তির মাধ্যমে বিএনপিতে একীভূত হওয়ার কথা প্রচার, জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার রাজ্জাকের পদত্যাগ, কোন জামায়াত নেতাকে বহিষ্কার, ১৯৭১ সালের গণবিরোধী ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য জামায়াতের ক্ষমা চাওয়ার কথা কিংবা বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়ার দলের পদ ছেড়ে উপদেষ্টা হওয়ার গুঞ্জন, ড. কামাল আর তাঁর জামাতার গতিবিধি, সব কিছুই যেন আরেকটি ১৯৭৫ সালের জন্য অপেক্ষা বা ১৯৭২ সালের মত স্বাধীনতা বিরোধী ধর্মভিত্তিক দল আর চৈনিক বাম বা বর্তমান বিএনপি-জামায়াতের ২০ দলীয় জোটের জন্য একটি জাসদ আদলের প্ল্যাটফর্ম খুঁজে ফেরা। যাতে করে পরে যার যার ঘরে ফেরা সহজ হয়, বর্তমানেও টিকে থাকা যায়। যেমনটি হয়েছিল ১৯৭৭ সালে। ১৯৭১ এর পূর্বে জামায়াতের তৎকালীন ছাত্রসংস্থার নাম ছিল ইসলামী ছাত্রসংঘ। পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তারা ১৯৭৭ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে ‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। তাই ইতিহাস বলে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পানি ঘোলা করে ড. কামালে উপর ভর করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে নিজেদের অপকর্ম লুকিয়ে সাময়িক চুপ থাকা বামাতী-জামাতীদের অনেক পুরাতন কৌশল।

বাংলা ইনসাইডার/এমআর