ঢাকা, সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০১৯, ৯ বৈশাখ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বিদিশার না বলা কথা

বিদিশা সিদ্দিক
প্রকাশিত: ১৬ এপ্রিল ২০১৯ মঙ্গলবার, ০১:৫৩ পিএম
বিদিশার না বলা কথা

খুব ছোট বেলার একটি ঘটনা।

আমি তখন ক্লাস ফোর বা ফাইভ - এ পড়ি।

আমরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসের কোয়ার্টারে থাকতাম। নিত্য দিনের কেনাকাটার প্রয়োজনে আমাদের বাড়ির পাশের মুদি দোকানে যেতে হতো।

সংসারের বড় মেয়ে বিধায় আমাকেই দোকানে বেশি পাঠানো হতো। ছোট দোকানে সবসময় মানুষের ভিড় লেগে থাকতো। একদিন কি একটা জিনিস কিনতে মা আমাকে দোকানে পাঠালেন, দোকানদার আমাকে বলল,‘দোকানের পিছনের দরজায় আসতে”। সম্ভবত আমি ফ্রক পরা ছিলাম। হাটু পর্যন্ত জামা পরতাম তখনকার দিনে। দোকানদার আমার হাতে একটি লাঠি চকোলেট দিয়ে একটা টুল দেখিয়ে বসতে বললো। আমি খুশি মনে খেতে ছিলাম লাঠি চকোলেট। আজকাল আমরা যেটা ললিপপ বলি। একটু পরে দোকানদার আমার কাছে জানতে চায় আমার কি লাগবে? জিনিস দেওয়ার আগেই সে আমার খালি হাঁটুতে তার হাত দিয়ে ছুয়ে দেয়। আমি কি বুঝবো সেই বয়সে? বুঝার মতো বয়স হয়ওনি। হয়তো দৌড় মেরে জিনিস না নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম অজানা আতংকে, ফিরার ফল ছিল আরো ভয়াবহ,আমার মায়ের হাতের মার।

মা ভেবেছিলেন দস্যু, ডানপিটে হয়তো আমি টাকা হারিয়ে ফেলেছি, নয়তো রাস্তায় ফকির কে টাকা দিয়ে দিয়েছি। পরে মায়ের রাগ পরলে আমাকে আদর করে জানতে চাইলেন আমি টাকা কি করেছি, আর মায়ের কাছে আদর ও নিশ্চয়তা পেয়ে আমি সব বলে দিলাম আসলে কি হয়েছিল আমার সাথে দোকানে। আমার মা সেদিন যা করেছিলেন তা হয়তো সব মায়েদের পক্ষে করা সম্ভব হতো না। আমার বাবা শিল্প , সাহিত্যমনা প্রগতিশীল কবি মানুষ, তাই প্রতিবাদ করা তালিম বাড়িতেই আমাদের পাওয়া। মা আমাকে সাথে নিয়ে ওই দোকানে তখনই গেলেন এবং মানুষের ভিড়ের মধ্যে মায়ের পায়ের দুই ফিতের স্যান্ডেল দিয়ে মারতে শুরু করলেন ওই দোকানদারকে।

মা বলতে পারেননি অন্য লোকজনদের কেন উনি দোকানদারকে মারলেন। কিনতু আজও আমার মনে আছে সবার সামনে মা আমাকে শিখিয়েছিলেন এই ভাবে প্রতিবাদ করতে। সেদিনের ওই ঘটনার পরে আমাকে আর কোনদিন দোকানে পাঠানো হতো না। মা আরেকটি কাজ করেছিলান ওই দিনের পর আমার ফ্রক গুলির বুকের কাছে থেকে ঝালর বা কুচি দিয়ে ফ্রিল লাগায় দিয়ে দিলেন। এতোকিছু পরে ও কিন্তু মা আমাকে ডেকে বুঝালেন না কেন আমাকে সাবধানতার সাথে বড় হতে হবে।

আমি খুব গাছে উঠে বসে থাকতাম ছোট বেলায়। আম, লিচু, বরই, নারকেল এমনকি তাল গাছও। একবার গাছে উঠার সময়ে আমার দুই ক্লাস বড় এক বোন প্রথম আমাকে মানা করে দেয় নিচে থেকে ছেলে বন্ধুরা যেন না দ্যাকে আমাকে কখনো গাছে ওঠার সময়। সেই বড় বোনও সেদিন আমাকে বুঝিয়ে বলেনি বড় হওয়া বা শারিরীক পরিবর্তন সাথে সাথে আমার মানসিক পরিবর্তন ও করতে হবে।

আজ আমিও দুই মেয়ের মা। বড় মেয়ে ইজাবেলা বড় হয়েছে সিংগাপুর। সিংগাপুর শহরে তালা লাগিয়ে ঘুমাতে হয়নি কোনোদিন এত সেফ দেশ সেটি ।সেই দেশ- এ মানুষরা কখনো আইন অমান্য করে না । কারণ সব থেকে কম সাজা গুলো হতো পশচাতে ১০০,২০০ বেতের আঘাত । জেলে যাওয়া পরের কথা।

আমার বড় মেয়ে আজ বিবাহ যোগ্য। এই ২৪.২৫ বছর বয়স। আমার ইজাবেলাকে কোনোদিনও সাবধান করতে হয়নি। সমাজ নিয়ে, কোন পুরুষ বা ছেলে নিয়ে বা ওর বেড়ে ওঠা নিয়ে । কারন ওই যে বললাম সিংগাপুরের সমাজে আইন এর ব্যাবহার টা খুবই শক্ত ও কঠিন। কোন ইভটিজার ও মনে হয় না ছিল সেই সময়। ও বড় হয়েছে ছেলে মেয়ে, এক সাথে।

সেই মেয়ে লেখা পড়া শেষে, গত কয় বছর আগে ঢাকায় চাকরি নিয়ে আসে আমার ও মায়া সাথে থাকবে বলে।মুলত মায়ার ছেলেবেলা টা উপভোগ করতো আর আমাকেও হেল্প করতো বিভিন্ন কাজে।

তিনটি বছরে উঠতে বসতে বাজারে, মার্কেটে রেস্টুরেন্ট, এয়ারপোর্টে বিরক্ত হতে হতো ওকে প্রতি নিয়ত। চুরি করে মানুষ মোবাইল এ ছবি তুলতো ওর। মেয়ের গলার scarfs ছোটো থেকে বড় ওড়না হলো তাও মেয়ে নিস্তার পেতোনা।

 

বিদিশা সিদ্দিক, ১৫ এপ্রিল,ঢাকা।