ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

কৃষক ও পকেটমারের গল্প

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ২০ মে ২০১৯ সোমবার, ০৯:০০ পিএম
কৃষক ও পকেটমারের গল্প

ধানের দাম নিয়ে কিছু ‘আবাল রাজনিতিক’ খুব উচ্চ স্বরে চিৎকারের চেষ্টা করছে ইদানিং। এরা কিন্তু তাঁরা যারা গণপরিবহনে চাঁদাবাজি করে জীবিকা নির্বাহ করে। এরা তাঁরা যারা শ্রমঘন শিল্পের শ্রমিকদের বিভিন্ন সুবিধা আদায় করে দেবে বলে তোলাবাজি করে জীবিকা চালান। এরা তাঁরা যারা নিজেরা দামী ব্র্যান্ডের গাড়ি চড়ে, দামি সিগারেট খান, দামি পোশাক পরেন, বিদেশে পাঠিয়ে ছেলে মেয়ের উচ্চ শিক্ষা সব চলে তাদের গরীবের রক্ত চোষা টাকায়। নিজেরা পেশাজীবী নন কিন্তু উনারা বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতা। হাল চাষ করতে বা জমিতে নিড়ানী দিতে পারেন না, কিন্তু বড় কৃষক নেতা।     

দেশের কৃষির উন্নয়ন এবং কৃষকের স্বার্থ রক্ষার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১৯ এপ্রিল বাংলাদেশ কৃষক লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর বৃহত্তর কুষ্টিয়ার ব্যরিস্টার বাদল রশিদ কৃষক লীগ করার আগ্রহ দেখান। তখন বঙ্গবন্ধু তাকে বলেন যে, কৃষক লীগ করতে হলে গ্রামে গিয়ে থাকতে হবে, কৃষকদের সমস্যা জেনে সংসদে তা জানাতে হবে। কৃষক লীগ করতে গিয়ে ব্যরিস্টার বাদল রশিদ তাঁর বাকী জীবন বর্তমান চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাংগা এলাকায় কাটিয়ে দেন। তিনি তাঁর আইন পেশা জলাঞ্জলি দিয়ে কৃষকের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন বাকী জীবন। কিন্তু এখন কৃষকদের নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা কি গ্রামে ষকদের সাথে থাকেন! এমন কী বঙ্গবন্ধুর গড়া কৃষক লীগ যারা করেন তাদের সাথে কী কৃষকদের কোন আত্মিক যোগাযোগ আছে! সন্দেহ আছে অনেক বড়।        

তাই যদি থাকতো তাহলে বাংলাদেশ সরকার চলতি মৌসুমে প্রতিমন বোরো ধানের দাম ১০৪০ টাকা নির্ধারণ করার পরেও ৪৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা মন দরে ধান বিক্রি হতো না। সেচ দিয়ে যারা বোরো মৌশুমে ধান চাষ করেন তাদের ধান উৎপাদন খরচ ওঠে না। এর নানা কারণ আছে। টাকার অভাবে অনেক সময় তাঁরা সঠিক সময়ে জমিতে সেচ, সার দিতে পারেন না। পারেন না সঠিক সময়ে সঠিক পরিচর্চা করতে। কোন কোন সময়ে যে বীজ তাঁরা কেনেন, তাতে বা সারে এ থাকে ভেজাল, সঠিক উৎপাদন হয় না ভালো পরিচর্চার পরেও। যা হোক ধরে নিলাম চাষির লোকসান হয় নি কিছু লাভ হয়েছে। সেই কিছুটা কত ভাগ? হিসাব রাখেন কোন কৃষক নেতা? এক বিঘা জমিতে ধান উৎপাদনে খরচ এলাকা ও জমির প্রকৃতি ভেদে ১৫-১৬ হাজার টাকা। আর যে ধান পাওয়া যাচ্ছে, তার বর্তমান বাজার মূল্য ১০ হাজার টাকাও নয়। তাহলে লাভ হয় কার? যাদের টাকা আছে তাঁরা এখন ধান কিনে মজুত করে ১/২ মাস পরেই ১০০০ টাকা মন দরে বিক্রি করবেন। সেখানে লাভ প্রায় ১০০%। আবার যদি ধান না বেঁচে মিল মালিকগণ তা চাউল করে বেচেন, তাহলে তো কোন কথাই নেই। প্রতি কেজি ৩২ থেকে ৩৪ টাকা দরে পাইকারী চা’ল বিক্রি করেন। লাভের কি কোন শেষ আছে?  

এক মণ বা ৪০ কেজি ভালো মানের ধানে (বি আর ২৮) প্রায় ২৭-২৮ কেজি চাল হয়। বর্তমানে উন্নত মেশিন দিয়ে ভাঙা হয় বলে তুষ প্রায় হয়ই না। এখন এক মণ ধানে ১২-১৩ কেজি কুড়া বা খূদ হয়, যার দামও কম না। বাজারে কৃষক উৎপাদিত ধানের দাম আর ভোক্তা পর্যায়ে চালের দামে বিস্তর পার্থক্য। দু’ক্ষেত্রেই চালের দাম বিবেচনা করা হলে পার্থক্য কমপক্ষে ২২ থেকে ২৪ টাকা। এর সিংহভাগই চলে যায় মধ্যসত্ত্বভোগীদের পকেটে। 

রাজধানীর কয়েকটি চালের বাজার ঘুরে দেখা যায়, সাধারণ গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে বেশি চাহিদা বিআর ২৮ চালের। খুচরা বাজারে এই চালের সর্বনিম্ন দাম ৪২ টাকা কেজি। খুচরা বাজারের সাথে পাইকারি বাজারের এই চালে দামের পার্থক্য ৫ থেকে ৬ টাকা। পাইকাররা আড়ৎদার বা মিল মালিকদের কাছ থেকে এ চাল কেনেন ৩২ থেকে ৩৪ টাকা দরে। অর্থাৎ কৃষকের বিক্রি করা ধান চালে পরিণত করার প্রক্রিয়ায় দামে পার্থক্য দাঁড়ায় ১৪ থেকে ১৬ টাকা।   

খুচরা বিক্রেতা, পাইকার এবং মিল মালিকদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিআর ২৮ ধান কৃষক বিক্রি করছেন সাড়ে চারশ থেকে ৫শ টাকা মণ। অর্থাৎ কেজি প্রতি চালের দাম হিসেবে পাচ্ছেন ১৮ টাকার মত। এভাবে বাজার মূল্যের চেয়ে প্রতি কেজি চালে ২২ থেকে ২৪ টাকা কম পাচ্ছেন কৃষক। ধানের মান ভেদে এই পার্থক্য আরো বেশি। বাজারে ধান ও চালের দামের এমন তারতম্যকে কি বলবেন শিক্ষিতজনেরা! 

সব সরকারের আমলেই কৃষিতে ভর্তুকি দেওয়া হয়। আসলে সেই ভর্তুকির টাকার কতভাগ কৃষক পান তা সবার জানা। এখানেও ‘রুপুরের বালিশ কেনা আর ওঠানো’র ঘটনা যে ঘটে তা ১০০ ভাগ নিশ্চিত। 

কোন দেশের অর্থনীতি ২য় স্তরে পৌঁছালেই মানে শিল্পের বিকাশের সাথে সাথেই গ্রামের কৃষি শমিক চলে আসে শহরে, শিল্পে কাজের জন্য। আমাদের দেশেও তাই হয়েছে তাই কৃষি শ্রমিকের দৈনিক হাজিরা দাঁড়িয়েছে ৮০০ থেকে ১০০ টাকায়। তাই উন্নত দেশে এমন ভাবেই কৃষিতে ভর্তুকি দেওয়া হয় যাতে কৃষকরা শহরে মাইগ্রেট না করে। ইউরোপ আমেরিকায় এমন কি এশিয়ার জাপানেও তাই দেখা যায়। এতে দুটি লাভ হয়। এক- বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে খাদ্য আমদানী করা লাগে না। দুই- শহর জনারণ্য হয়ে ওঠে না। খাদ্য আমদানী নিয়ে ১৯৭৪ সালের মত রাজনীতি করার সুযোগ থাকে না কারো।   

এখন প্রশ্ন হল তবুও কেন কৃষকরা ধান বা অন্যান্য চাষ করেন? এক কথায় জবাব হচ্ছে উপায় নেই। কৃষক তাঁর জমির বার্ষিক ইজারা মূল্য ধরেন না। ধরেন না তাঁর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের শ্রমের মূল্য। এভাবেই তাঁরা টিকে থাকেন। পরে একটু সুযোগ পেলে ছেলে মেয়েদের শহরে, বিদেশে পাঠান চাকরি করতে। খুব প্রান্তিক চাষি হলে রাজধানীতে আসেন তাদের ছেলেরা রিক্সা চালাতে। কারণ একজন প্রান্তিক চাষির গড় মাসিক আয় ঢাকার একজন রিক্সা চালকের ১০ ভাগের এক ভাগ বলে জানা যায়। তাই শহর হয় জনারণ্য। যান জোটে নাকাল নগরী। হাজার হাজার শ্রম ঘন্টা হয় নষ্ট। দূষিত হয় নগর, প্রান্তর।        

একটা গল্প দিয়ে লেখা শেষ করতে চাই। একবার এক চোর তার পকেটমার বন্ধুকে বলছে, ‘তুই খুব ধৈর্যশীল, অনেক পিটুনি হজম করতে পারিস। আমি হলে পারতাম না’। পকেটমার বন্ধু বলছে, ‘ঠিক বলেছে দোস্ত, তবে আমার মত হাত পা বেঁধে তোমাকে পিটালে তুমিও আমার মত পিটুনি খেতে পারবে, সে বিশ্বাস আমার আছে’। আমাদের দেশের গরীব আর প্রান্তিক কৃষকদের অবস্থা সেই পকেটমারের মত। ফসলের দামে মাইর খাওয়া ছাড়া তাদের আর কোন বিকল্প নেই বলেই এখনো তাঁরা গ্রামে পড়ে আছেন। তাঁরা ততদিন থাকবেন যতদিন না বড় বড় ব্যবসায়ীরা তাদের জমি কিনে নিয়ে আধুনিক খামার গড়ে তোলেন।