ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

ভেজালে শাস্তির তামাশার গল্প!

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ০৮ আগস্ট ২০১৯ বৃহস্পতিবার, ০৫:৫৯ পিএম
ভেজালে শাস্তির তামাশার গল্প!

ডেঙ্গুর তোড়ে ভেসে গেছে সব, আমাদের চোখ অনেক জরুরী খবর এড়িয়ে যাচ্ছে। এমনি একটা সংবাদ হচ্ছে- ভেজাল করে কীভাবে ১০০ লিটার দুধকে ২৮০০ লিটার বানানো হয় র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম সাহেবের অভিযানের বরাতে আজ বৃহস্পতিবার মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে। বুধবার রাতে র‌্যাবের ভ্রাম্যমান আদালতের পরিচালিত অভিযানে আটক হলো ‘বারো আউলিয়া ডেইরী মিল্ক অ্যান্ড ফুড লিমিটেড’ নামক ফ্যাক্টরির ভেজাল দুধের ভাণ্ডার। দেখা গেছে যে, সেখানে ১০০ লিটার দুধের সঙ্গে পানি, স্কিম মিল্ক পাউডার এবং বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে ২৮০০ লিটার পাস্তুরিত দুধ তৈরি করা হচ্ছে। কখনও কোনো দুধ ছাড়াই শুধু স্কিম মিল্ক পাউডার ও সোডিয়াম, লবণ, চিনি ও অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ হাজার লিটার পর্যন্ত পাস্তুরিত দুধ তৈরি করছে তারা।   

এ অপরাধে ফ্যাক্টরিটির পরিচালকসহ ৮ জনকে ২ বছর, ১ জনকে ১ বছর, ৩ জনকে ৬ মাস করে কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমান আদালত। এছাড়াও নগদ ৫৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আক্কাস আলী ও এমডি আজগর আহমেদ পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানান ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম।

মিল্ক ভিটার দুধের দাম লিটার প্রতি ৬৫ টাকা। এই মূল্য উৎপাদন খরচ, লাভ, কর্মচারীর বেতন ইত্যাদি সব ধরেই নির্ধারণ করা হয়। ভেজাল করতে পণ্য ভেদে সাধারণত ৭০ থেকে ৮০% লাভ থাকে। তা হলে এভাবে হিসাব করলে প্রতি লিটারে কম করে হলেও ৪৫ টাকা হিসেবে ২০ হাজার লিটারে দৈনিক লাভ হয় ৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাসে ২৭ লাখ টাকা। বছরে লাভ হবার কথা ৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা। সেখানে শাস্তি হচ্ছে ৬ মাস থেকে ২ বছরের জেল বা ৫৮ বা ৬০ লাখ টাকা জরিমানা! কী জনস্বাস্থ্য বান্ধব আইন রে বাবা। এমন সুযোগ থাকলে গরীব মেধাবী অনেকেই এই ঝুঁকি নেবেন তাতে সন্দেহ আছে কী? একটা সত্য ঘটনার (নাম আর জেলার নাম বাদে) কথা দিয়ে লেখা শেষ করবো।

ঢাকার পাশের একটা জেলা। বিধবা মায়ের একমাত্র ছেলে, রহিম (ছদ্ম নাম) মেধাবী কিন্তু লেখাপড়া করার মত টাকা পয়সা নেই। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পরে আর পড়া হল না। একটা ওষুধ কোম্পানিতে সেলস এ চাকরি নিলেন। বাজারের কোন কোন ওষুধ ভালো চলে জানলেন। অভাব যায় না। এমন সময় একদিন মফঃস্বলের এক জেলার গ্রামে তাঁর স্কুলে বন্ধু সেলিমের সাথে সাথে দেখা। সে সদ্য স্নাতক পাশ করে ভালো চাকরীর সুবাদে ঐ এলাকা সফরে গেছে বিদেশি বসের সাথে। যে দামী মিটসুবিশি পাজেরো গাড়িতে রহিমের বন্ধু সেলিম গেছে তাতে তার পক্ষে নিজেকে সেলিমের বন্ধু বলে পরিচয় দিতেও ভয় পেলো। সেলিম কিন্তু রহমকে চীনে ফেললো। রহিমকে কাছে ডেকে নিয়ে কুশল বিনিময় করে এক সাথে দুপুরে খেলেন পাশে বসিয়ে বসের সাথেই।      

এই ঘটনার ১০ বছর পরের ঘটনা, ছুটির দিন হাল্কা কেনাকাটার জন্য নিউ মার্কেটে গেছে। একটা নতুন ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ির জানালে খুলে সেলিম সেলিম বলে কেউ তাঁকে ডাকছে। দেখল স্যুটেড বুটেড রহিম, ডাকছে তাঁকে। সেলিম হতবাক হয়। রহিম এইভাবে কী করে এই গাড়ী থেকে নামে! নিজেকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও এগিয়ে যায়। রহিম হাত ধরে সেলিমকে টেনে হিঁচড় নিয়ে গেল পাশের এক চাইনিজ রেস্তরাঁয়। বললো আয় কথা আছে। সেলিম ও মন্ত্রমুগ্ধের মত রহিমের পিছু নিলো। খাবারের অর্ডারের পরে সেলিম পরম আগ্রহে জিজ্ঞাসা করলো তর এই অবস্থা কী করে? রহিম জানাল সে এখন কয়েক কোটি টাকার মালিক। মাঝে ৩ সাড়ে তিন বছর জেল খেটেছে ২ দফায়। এখন আর সমস্যা নেই। কী ভাবে সে এতো টাকার মালিক হল তা জানতে উৎসুক সেলিম খুব সংকোচে জিজ্ঞাসা করলো কি করে এতো উন্নতি করলি রহিম, বলা যাবে? রহিম মৃদু হেসে বলল কেন নয়? অনেকেই জানে তুই জানলে অসুবিধা কি!

এবার আসল কথা শুরু। রহিমের ৫ বছর চাকরির পরে একটা প্রোমোশন পায়। এর মধ্যেই ওর মায়ের শরীর খারাপ হয়ে পড়ে। মায়ের চাপেই শেষে বিয়ে করে রহিম। যৌতুক হিসেবে বৌয়ের কিছু গয়না আর একটা মোটরসাইকেল পায় রহিম। বিয়ের পরেই সে বউকে ম্যানেজ করে রহিম। মায়ের চিকিৎসার টাকা জোগাড় করা একটু ভালো থাকার জন্য একটু ঝুঁকি নিতে চায় সে। বউ রাজী হয়।

বৌয়ের গয়নাগুলো বেঁচে একটা শহরের এক বস্তি এলাকায় বড় এক রুমের একটা বাসা ভাড়া নেয়। শুরু করে প্যারাসিটামল, ট্যাবলেট আর হিস্টাসিনের মতি কিছু পপুলার আইটেম তৈরি করা। ১ টা প্যারাসিটামল আর এক কেজি ময়দা দিয়ে তৈরি হয় বহু প্যারাসিটামল ট্যাবলেট। একইভাবে তৈরি হয় হিস্টাসিন। উচ্চাভিলাষী দক্ষ কিছু সেলসম্যানকে বাড়তি বেতন আর টার্গেট সহ কমিশন দিয়ে ১০ জন ছেলেকে নিয়োগ দেয়। তাঁরা গরীব এলাকায় যেখানে বড় কোম্পানির সেলস ম্যানেরা খুব কম যান, সেখানে পুশ সেল করে এই ভেজাল ওষুধ বিক্রি শুরু করে। যে সেলস ম্যান যে এলাকায় একবার যান তাঁকে আর ঐ এলাকায় পাঠান না। এভাবেই চলে দুই বছর। কারখানা পরিবর্তন হতো  প্রতি তিন মাসে। টাকা দিয়ে বৌয়ের নামে অনেক জমি আর বাড়ি করে। শশুর শাশুড়ির নামে, নিজের নামে সামান্য কিছু টাকা ব্যাংকে রাখ। ২ বছরেই সে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হলেই সবার চোখে পড়ে তাঁদের চাল চলন দেখে। এর পরে ধরা পড়ে জেল খাটে দুই বছর। জেল থেকে বের হয়েই আবার শুরু অন্য এলাকা টার্গেট করে। এই দফায় আবার আড়াই বছর পরে ধরা পড়ে। আবার দুই বছরের জেল। ইতোমধ্যে অনেক পুঁজি হয়ে যায়, তাই আর ভেজাল করার দরকার হয় না। রহিম মৃদু সেসে বলে, ‘জেল থেকে বেরিয়ে চায়না থেকে বিভিন্ন মাল আমদানি করি। নিজেদের বাড়ি থেকে বাসা ভাড়া পাই মাসে ৭/৮ লাখ টাকা। তাই এখন আর আগের মত নিজের ওখানে থাকি না। সবাই বাঁকা চোখে তাকায়।  ঢাকায় থাকি, ঢাকায় কে কাকে চেনে। আমি জানতাম জালিয়াতি আর ভেজাল করলে যে জেল বা জরিমানা হয় তা লাভের তুলনায় কিছুই না। ঐ জেল জরিমানার আইনি তামাশার সুযোগ নিয়েছি আমি। আমার কোন পাপ বোধ নেই কারণ আইন অনুসারেই আমি সাঁজা খেটেছি, এখন আমি নিষ্পাপ’।

বাংলা ইনসাইডার