ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ও জলবায়ু পরিবর্তন

ড. মিহির কান্তি মজুমদার
প্রকাশিত: ০৯ আগস্ট ২০১৯ শুক্রবার, ০৮:০০ পিএম
ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ও জলবায়ু পরিবর্তন

ডেঙ্গু সংক্রমণের মাত্রা এ বছর পূর্বের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে এক আতঙ্কের পর্যায়ে পৌঁছেছে। বড় আকারের স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এই ডেঙ্গু। যদিও এটি একটি সামাজিক সমস্যা, তবুও বলা যায়, প্রকৃতপক্ষে আমাদের অনেক স্বাস্থ্য সমস্যাই সামাজিক সমস্যা, যা স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে পরবর্তীতে আত্মপ্রকাশ করে। ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, অপুষ্টিজনিত সকল রোগ, দূর্ঘটনাজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা ইত্যাদি সবকিছুই সামাজিক সমস্যা। আর যে কোন সামাজিক সমস্যা নিরসনে সংশ্লিষ্ট সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

ডেঙ্গু রোগের সংক্রমণ এ দেশে শুরু হয়েছে বর্তমান শতকের শুরুতেই। এটি প্রধানত আফ্রিকা মহাদেশের রোগ এবং ঐ মহাদেশের অধিকাংশ দেশে এ রোগের প্রাদুর্ভাব আছে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষে এটি বিভিন্ন ট্রপিকাল ও সাব-ট্রপিকাল দেশে ছড়িয়ে পরে। যেহেতু এটি মশাবাহিত রোগ, কাজেই এ রোগ কখনই পলিও রোগের মত নির্মূল করা যাবেনা। তবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। ডেঙ্গু ভাইরাস এর ৪টি সেরোটাইপ আছে, যেগুলোকে ১,২,৩ ও ৪ নং সেরোটাইপ বলে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। যে সেরোটাইপের ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ডেঙ্গু হবে, পরবর্তীতে অন্য সেরোটাইপের ভাইরাস থেকে ডেঙ্গুরোগ হবার আশঙ্কা থাকবেই। কাজেই, একজন লোক সর্বোচ্চ ৪ বার ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে দ্বিতীয়বার বা পরবর্তীতে পুনরায় আক্রান্ত হলে রোগীর খারাপ অবস্থা হবার বেশি আশঙ্কা থাকে। আমরা জানি এডিস ইজিপ্টাই নামক মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে। এ মশা আরও ৩টি প্রাণঘাতী ভাইরাসের বাহক এবং সেগুলো হচ্ছে চিকুনগুনিয়া, জিকা ও ইয়োলো ভাইরাস। ইতোমধ্যে চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের সংক্রমণ এ দেশে শুরু হয়েছে। কিন্তু জিকা ও ইয়োলো ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হলে এক মহা সমস্যার সৃষ্টি হবে। কাজেই, এডিস ইজিপ্টাই মশা ও ডেঙ্গু রোগের প্রতিরোধ কার্যক্রম সকল সেক্টরকে সম্পৃক্ত করা খুবই জরুরী।

জীবন ধারণের জন্য মশা ফুলের মধু, পাতার রস এ সবের উপরই নির্ভরশীল। যেহেতু বংশবৃদ্ধি যে কোন প্রাণির একটি সহজাত প্রবৃত্তি। সে কারণেই, ডিম পরিষ্ফুটনের জন্য রক্তের প্রয়োজন বিধায় স্ত্রী জাতীয় সকল প্রজাতির মশা রক্তের জন্য মানুষ ও প্রাণির দেহে হুল ফুটায় ও রোগ সংক্রামণ ঘটায়। স্ত্রী প্রজাতির মশা গড়ে কম বেশী দেড় মাস বাঁচলেও একটি পূর্ণাঙ্গ মশা প্রতি তিন দিনে একবার উপযুক্ত পরিবেশ পেলে ডিম পাড়ে। সে কারণেই মশার বংশবৃদ্ধি ও বিস্তার অনেক অনেক বেশি।

ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্য দায়ী এডিস প্রজাতির এ মশা খুবই অল্প পানিতে (১ চা-চামচ) ডিম পাড়তে পারে। তবে পানি হতে হবে পরিস্কার, বদ্ধ পাত্রে এবং অপেক্ষাকৃত ছায়া ও আদ্র পরিবেশে। এ জন্য ঘরের ফুলের টব, ফিজের নিচের জমাকৃত পানি ছাড়াও গাড়ীর অবব্যহৃত টায়ার, অব্যবহৃত বা জব্দকৃত গাড়ী, বাড়ীর অনাচে কানাচে পড়ে থাকা দই, আইসক্রিম, কফি, চা ইত্যাদির ছোট প্লাস্টিক পাত্র এবং এমনকি বোতলের পড়ে থাকা ছিপি, কাচের ভাঙা পাত্র সবকিছুই এ মশার ডিম পাড়ার জন্য উপযুক্ত স্থান। শুধু প্রয়োজন একটু পরিষ্কার বদ্ধ পানি। সে পানির যোগান দিতে জলবায়ু পরিবর্তন বিরাট ভুমিকা রাখছে।

জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে শুরু হয়েছে বেশ আগে। ঝড়, সাইক্লোন, বন্যা, বজ্রপাত ইত্যাদির আধিক্যের পাশাপাশি বৃষ্টিপাতে এসেছে বড় ধরণের পরিবর্তন। একে বলা হয়ে থাকে ভ্রমাত্মক বৃষ্টিপাত। বর্ষাকালে বৃষ্টি নেই। আবার হঠাৎ যখন বৃষ্টি হয়, তখন আর থামেনা। কয়েকদিনের বৃষ্টি কয়েক ঘন্টায় নামে। থেমে থেমে বৃষ্টি হয় কয়েক দিন বা মাস ধরে। এখন শ্রাবণের শেষ। অথচ শ্রাবণের ধারা এখনও চোখে পড়েনি। একদিন একটু বৃষ্টি হচ্ছে, আবার কয়েকদিন নেই। এটাই এডিশ প্রজাতির বংশ বিস্তারের মহা সুযোগ। এক নাগাড়ে বৃষ্টি হলে পাত্রের জল বদ্ধ থাকেনা, উপচিয়ে পড়ে যায়। ফলে এডিশ মশার বংশ বৃদ্ধি ঘটেনা। দেশের বিভিন্ন স্থানে গতকাল এবং আজ ঢাকায় বৃষ্টি হয়েছে। ফলে ডেঙ্গুর সংক্রমণের মাত্রা এখনই কমতে শুরু করবে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবজনিত বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন এডিস মশার বংশ বিস্তার এবং ডেঙ্গুসহ সংশ্লিষ্ট রোগের সংক্রমণে বড় ধরণের প্রভাব ফেলছে।

আমাদের দেশ বর্তমানে যেমন দ্রুত গতিতে উন্নয়নের রাস্তায় অগ্রসর হচ্ছে, তেমনি এর সাথে পাল্লা দিয়ে ভোগ্যপণ্য ব্যবহারের মাত্রা বাড়ছে। ছোট কাপে দই, কফি, আইসক্রিম ইত্যাদি ছোট শহরে পৌঁছে গেছে। পানি এবং বিভিন্ন ধরণের পানীয় ও ফলের রসের বোতল এখন ছোট মুদি দোকানে পাওয়া যায়। শহরে এর ব্যবহার বাড়ছে এবং পর্যায়ক্রমে গ্রাম পর্যায়ে তা সম্প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু এসব ব্যবহারের পর উৎপাদিত বর্জ্য বর্জনের অভ্যাস তেমন পরিবর্তিত হয়নি। বর্জ্য ছুড়ে ফেলার মানসিকতা ও অভ্যাস আমাদের অনেক পুরানো। উন্নয়নের সাথে বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় একই মাত্রায়। ছোটকালে লঞ্চে যাতায়াত করার সময় দেখেছি- লঞ্চ কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তি যা লঞ্চের ভিতরে লাগানো থাকতো। যেমন ‘ময়লা আবর্জনা নদীতে ফেলুন, ডেকে ফেলে নোংরা করবেনা’ ইত্যাদি। এ মানসিকতার খুব একটা উন্নতি হয়নি। গাড়ীর কাঁচ নামিয়ে বর্জ্য এমনকি কলার ছোলা বাইরে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলতে দেখেছি এই সাম্প্রতিককালেও। আমাদের উন্নয়নের সাথে বর্জ্য বৃদ্ধি পাবে, আর আমরা সব বর্জ্য বাইরে ফেলবো এবং সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার মেয়রগণ তা পরিস্কার করার ব্যবস্থা করবেন- এ অসুস্থ্য মানসিকতার পরিবর্তন হতেই হবে। এসব বর্জ্যের মধ্যে ছোট ছোট কোন পাত্র বা এমনকি পানির বোতলের ছিপি বা মুখ বাইরে থাকলে এবং তাতে একটু বৃষ্টির পানি জমলেই এডিস মশার জন্য যথেষ্ট। যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কয়েকদিন বিরতি দিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে, তাই এসব ছোট পাত্রে এবং এমনিক বোতলের ছিপিতে জমা পাত্রে ডেঙ্গু মশার বিস্তার ঘটছে। ভোগ্যপণ্য ব্যবহারের মাত্রা যেহেতু শহরাঞ্চলে বৃদ্দি পেয়েছে, কাজেই এবারে ডেঙ্গু রোগের সংক্রামণ সব জেলা শহরে পৌছে গেছে। আমরা সচেতন না হলে এবং সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ না হলে তা গ্রাম পর্যায়ে ছড়াতে খুব বেশি সময় লাগবে না।

কাজেই, সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা কর্তৃক ড্রেনে ঔষধ ছিটালে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। ঘরের এবং আশেপাশের এসব ছোট পাত্রে পানি জমার উৎস বন্ধ করতে হবে। এ মশা দিনে বা রাতে কামড়ায়না। এর আক্রমণ প্রধানত; খুব সকালে ও সন্ধ্যার আলো আধারীতে। দিনে ও রাতের বেলায় এরা ঘরের মধ্যেই থাকে। থাকার স্থান হচ্ছে পর্দা, কাপড়, দড়ি বা এরূপ কোন ঝুলন্ত বস্তু। কাজেই, ছোট পাত্র ছুড়ে ফেলার অভ্যাস পাল্টানো, ঘরে ও আশেপাশে এরূপ পাত্রে পানি জমার উৎস বন্ধ করা এবং দিনে ও রাত্রে ঘরের পর্দা, কাপড়, দড়ি এবং অন্যান্য ঝুলন্ত বস্তুর উপর মশা মারার ব্যাট চালনা করে বসে থাকা মশা নিধন করাই হবে বর্তমানে প্রধান কাজ। ডেঙ্গু রোগ হলে আতঙ্কিত হওয়ার পরিবর্তে ডেঙ্গু রোগ ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি জেনে পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ। এ মশা যখন আছে এবং থাকবে, কাজেই ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়া, জিকা ও ইয়োলো ভাইরাস আসার যত রাস্তা তৈরী আছে, তা বন্ধ করার জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

ড. মিহির কান্তি মজুমদার, চেয়ারম্যান, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, (সাবেক সচিব)।