ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

বাংলাদেশের সফলতা দেখে ভারত যা শিখতে পারে

মার্ক টালি
প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ মঙ্গলবার, ১০:০৭ পিএম
বাংলাদেশের সফলতা দেখে ভারত যা শিখতে পারে

ভারতীয় অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে খারাপ সংবাদের লাঙল চলছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরী পোষাক রপ্তানিকারক দেশ, যার কাছ থেকে ভারত শিখতে পারে। যেসব সংস্থা চীনা শ্রমিকদের ব্যয়বহুল মনে করছে তারা বাংলাদেশ এবং ভিয়েতনামে যাচ্ছে। ভারত আবারো সস্তায় উৎপাদনক্ষমতা হারিয়েছে। একটি স্বাধীন জাতি হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে আমরা ফিরে তাকাতে পারি, এর রফতানি সাফল্য লক্ষণীয়, কিছু ক্ষেত্রে অলৌকিকও বলা যায়। ভারতের চেয়ে অনেককিছুতেই বাংলাদেশ এগিয়ে। বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচী সফল হয়েছে। এমনকি লিঙ্গ সমতাও ভারতের থেকে বাংলোদেশ এগিয়ে। এই দুটি অর্জনই ধর্ম বর্ণের বিপরীতে চলেছে।

১৯৭০ সালে আমি নিয়মিত বাংলাদেশে যেতাম। মুক্তিবাহিনী-পাকিস্তান আর্মি যুদ্ধে বেশিরভাগ ব্রিজ, কালভার্ট, ফেরী ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল নদীমাতৃক দেশটিতে। আইন শৃঙ্খলার চুড়ান্ত অবনতি হয়েছিল। তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানায়। দীর্ঘ নয়মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরে জয়লাভ করে বাংলাদেশ। যুদ্ধের সময় অর্থনীতি ধসে পড়েছিল এবং ফলস্বরূপ, ১৯৭৪ সালে একটি দুর্ভিক্ষও হয়েছিল। সরকার বলেছে, ২৭ হাজার মানুষ অনাহারে মারা গেছেন। যার বেসরকারী হিসেব ছিল ১ লক্ষ ৮০ হাজার। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পুরো পরিবারকে হত্যা করার ফলে দেশে সামরিক অভ্যুত্থান এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হয়। যার কারণে একটা লম্বা সময় বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সংকটে ভোগে।

এই চূর্ণবিচূর্ণ অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে দুটি উল্লেখযোগ্য এনজিও তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশ জন্মের পর প্রথম বছরে ফজলে হাসান আবেদ ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করেন। এটি বাংলাদেশের বঞ্চিতদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জীবিকা এবং দুর্যোগের প্রস্তুতি প্রদানের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ব্র্যাক বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুধু বাংলাদেশ নয়, ব্রাক এশিয়া এবং আফ্রিকার আরো কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭৪ সালে ড. মোহাম্মদ ইউনুস প্রতিষ্ঠা করেন গ্রামীন ব্যাংক। যা নারীর ক্ষমতায়ণের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করতো। যদিও নানা কারণে পরবর্তীতে ড. মোহাম্মদ ইউনুস সমলোচিত হয়েছে।

ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেছেন যে, ১৯৯০ সালে দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়ার ফলে ভারত উপকৃত হয়েছিল কারণ এই সংকট তাকে এবং প্রধানমন্ত্রী নরসিমহ রাওকে বিরোধী দলের ক্ষেত্রে কিছু সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করায়। যার ফলে সেই সংকট তারা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাংলাদেশও তেমনি অর্থনৈতিক সংকট থেকে উপকৃত হয়েছে বলে মনে হয়। একটা সময়ে বাংলাদেশকে সহায়তার উপর নির্ভর করতে হয়েছে এবং সহায়তার সঙ্গে আসা পরামর্শটিও গ্রহণ করতে হয়েছিল। সর্বদা এটি একটি সুখের সম্পর্ক ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশি এনজিওগুলি প্রায়শই আন্তর্জাতিক দাতাদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। বাংলাদেশিরা ন্যায়সঙ্গতার সাথেই দাবি করেছে, তারা জানে যে তাদের দেশের জন্য সবচেয়ে ভাল কি?

এমন অভিযোগও এসেছে যে বাংলাদেশ একটি সহায়তা নির্ভর দেশ হতে চলছে। তেমনই লক্ষ্য দেখা যাচ্ছে। এই সময় কিছু দাতা সংস্থা খারাপ পরামর্শ দেয়, বাংলাদেশের স্বার্থের চেয়ে তাদের দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থে উৎসাহিত করার চেষ্টা চালায়। তবে সহায়তার উপর বাংলাদেশের নির্ভরতার অর্থ হ`ল রাজনীতিবিদদের পক্ষে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তকে রাজনীতিকরণ করা তবে নিজস্ব সুবিধার্থে মোচড় দেওয়া নয়। রাষ্ট্র এনজিওগুলোকে বাংলাদেশের উন্নয়নে কাজ করার পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়। এনজিওগুলো তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে মাঠে কাজ করার সুযোগ পায়। এমনকি তাদের নীতি সরকারকেও প্রভাবিত করে।

অন্যদিকে ভারত বরাবরই সাহায্য গ্রহণে অনিচ্ছুক ছিল। ভারত জোর দিয়ে বলে, অন্যের সাহায্য দেশের উন্নয়নে সংযুক্ত হওয়া উচিত নয়। এমনকি কোন পরামর্শও দরকার নেই। ভারতীয় সরকার এনজিওগুলোকে বরাবরই সন্দেহর চোখে দেখে। যার কারণে ভারতে আন্তর্জাতিক সাহায্য ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে।

একজন বিদেশি উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ আমাকে বলেছিলেন, ‘ভারতে এনজিওগুলিকে নিয়ন্ত্রণকারী আইনগুলি বাংলাদেশের আইনগুলির চেয়ে অনেক বেশি কঠোর মনে হয়’। ভারতের এনজিওর ব্যাপারে আরো খোলামন এবং সন্দেহপ্রবণতা কমানো উচিত বলে মনে করি।

বি:দ্র: মার্ক টালির বিশেষ কলামটি ভারতের ‘হিন্দুস্থান টাইমস’- এ প্রকাশিত হয়েছে। 

মার্ক টালি বিবিসির নয়া দিল্লীর সাবেক প্রতিনিধি। প্রায় ২০ বছর তিনি বিবিসিতে কর্মরত ছিলেন। তিনি একজন কলামিস্ট এবং রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ।

বাংলা ইনসাইডার/এমআরএইচ