ঢাকা, সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২ পৌষ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

কবি শেখ মুজিব!

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ০২ ডিসেম্বর ২০১৯ সোমবার, ০৭:০৭ পিএম
কবি শেখ মুজিব!

আমি যখন সাহিত্য নিয়ে পড়ি, তখন বিশেষ করে নাটক আর কবিতা নিয়ে জানার চেষ্টা করতাম একটু বেশি। রাজনীতি আর লেখাপড়া একসাথে করতে গেলে খুব ভালো কিছুতেই করা যায় না। তাই মোটামুটি একটা ধারণা নিয়েই লেখাপড়া শেষ করতে হয়েছিলো। এই সময় আমি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ পড়ার বা শুনার উপর আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। টেপ রেকর্ডারে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ছাড়া অন্যসব ভাষণ খুব একটা শুনতে পারিনি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি তারিখ গঠিত কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক ও সাংবাদিক মরহুম শফিকুল আজিজ মুকুলের দীর্ঘ সান্নিধ্যের ফলে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে একটু জানার সুযোগ বেড়ে যায়। কারণ মুকুল ভাইয়ের ব্যক্তিগত লাইব্রেরী ছিল ঈর্ষা করার মত বড়।

অনেকের মতই বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ আমাকে খুব আন্দোলিত করে। এখনো আমি অবাক হই, বিস্মিত হই অন্য কারণে; রাজনীতি ছাড়াও ৭ই মার্চের ভাষণের সাহিত্য গুণ অর্থাৎ কাব্যগুণ দেখে। তাই বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে কেন এত স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে মানুষ জমায়েত হতো তা নিয়ে গবেষণার একটা চেষ্টা করি। কারণ তখন ইন্টারনেট ছিল না কিন্তু রেডিও আর পত্রিকা থাকলেও সেখানে সেন্সরের খড়গ ছিল খুব ধারালো। তবুও কী কারণে গ্রামের মানুষ মাইলের পরে মেইল হেঁটে আসতেন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে! যা হোক, সফল হতে পারিনি নানা কারণে। বঙ্গবন্ধুর জন্ম শত বার্ষিকী উপলক্ষে কাজটা করার জন্য সিনিয়র কিছু সাংবাদিক সম্মতি দিলেও নানা কারণে সেটা হয়ে ওঠেনি।

আমার কাছে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের কবিতা একটা সুদীর্ঘ গদ্য কবিতা। যা কবিতার নানা উপাদানে ঠাঁসা। পুরা নিয়ম মেনে আবৃত্তির ঢংএ তিনি তাঁর ভাষণটি দেন। সে কথা বলার আগে বাংলায় গদ্য কবিতার কিছু উপাদানের কথা আমরা জেনে নিতে পারি।

অলঙ্কার কবিতার প্রাণ। যা তাকে কালের গণ্ডি পেরিয়ে নিয়ে অমর করে দেয়। কবিতায় সাধারণত অনুপ্রাসের ব্যবহার খুব বেশি থাকে।, থাকে রস আর ভাব। শিল্প উপভোগের পর শ্রোতার মনে যে অনুভূতি জাগ্রত হয় তাকে রস বলে। দয়া, ধর্ম, দান, দেশভক্তি ও সংগ্রাম বিষয়ে উৎসাহবিষয়ক ভাবের নাম বীররস। ইষ্টবিয়োগ বা অপ্রিয়সংযোগে যে শোকসঞ্চার হয় তাকে করুণরস বলে। আশ্চর্য বিষয়াদি দর্শনে যে বিস্ময়াত্মক ভাবের উদয় হয়, তাকে অদ্ভুত রস বলে। বিকৃত আকার, বাক্য ও চেষ্টা দ্বারা যে ভাবের উদয় হয়, তা হাস্যরস নামে পরিচিত। আর কবি বা নাট্যকারের মনোগত বিষয় সম্পর্কে বাক্য দ্বারা, অঙ্গভঙ্গি দ্বারা, মুখের অভিব্যক্তি দ্বারা কিংবা অভিনয় দ্বারা দর্শক শ্রোতাকে যদি ভাবায় তবে তাকে ‘ভাব’ বলে।

রস, ভাবে আর শব্দালঙ্কারে ঠাঁসা বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শুনে বা পড়ে অনেকেই অবাক হবেন। লেখাটা যাতে দীর্ঘ না হয় সেজন্য আমি বঙ্গবন্ধুর ভাষণের অংশ বিশেষ তুলে ধরে সেটি যে একটি উন্নতমানের গদ্য কবিতা তা প্রমাণের চেষ্টা করবো।

এবার বলি কবিতায় অনুপ্রাস কী? বাক্যের মধ্যে একই ব্যঞ্জনধ্বনির পৌনঃপৌনিক ব্যবহারকে অনুপ্রাস বলে। অর্থাৎ একই বর্ণ বা বর্ণগুচ্ছ যুক্ত বা বিযুক্তভাবে একাধিকবার ধ্বনিত হলে অনুপ্রাস অলঙ্কার হয়। এর ফলে সৃষ্টি হবে একটি সুন্দর ধ্বনি সৌন্দর্যের। যা শ্রোতা বা পাঠককে আকৃষ্ট ও মুগ্ধ করবে।

আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাসের খুব জনপ্রিয় কবিতা বনলতা সেন এর একটা লাইন এখানে তুলে ধবি বিষয়টি পরিস্কার করার জন্য। “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নেশা মুখ তার স্রাবস্তির কারুকার্য” -এখানে ‘র’ ধ্বনি ছয়বার এসেছে যা অলঙ্কার অনুপ্রাস।

এবার আসি বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ১৮ মিনিট স্থায়ী ভাষণে তিনি যে কী অসাধারণ রস, ভাব আর অলংকার দিয়ে রচিত কবিতা পাঠ করেছিলেন তা জানার চেষ্টা করি।

করুণ রস দিয়ে শুরু এই কবিতায় তিনি বলেন, "আজ দুঃখ-ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বুঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি- আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর ও যশোরের রাজপথ আমার ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে।“

অনুপ্রাসের সার্থক ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি বলেন, “আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়-তারা বাঁচতে চায়। তারা অধিকার পেতে চায়। নির্বাচনে আপনারা সম্পূর্ণভাবে আমাকে এবং আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছেন ............। কিন্তু ২৩ বছরের ইতিহাস বাংলার মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ...।২৩ বছরের ইতিহাস বাংলার মানুষের মুমূর্ষু আর্তনাদের ইতিহাস, রক্ত দানের করুণ ইতিহাস। নির্যাতিত মানুষের কান্নার ইতিহাস। কী চমৎকার করে তিনি ইতিহাস শব্দের কাব্যিক প্রয়োগ করেছেন।

“আমি বললাম, তবুও আমরা জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যাব এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হওয়া সত্বেও কেউ যদি ন্যায্য কথা বলে আমরা তা মেনে নেব, এমনকি তিনি যদি একজনও হন”।

বীর রসের কী অসধারণ প্রয়োগ দেখুন- ”... কিন্তু কি পেলাম আমরা? বাংলার নিরস্ত্র জনগণের উপর অস্ত্র ব্যবহার করা হলো। আমাদের হাতে অস্ত্র নেই। কিন্তু আমরা পয়সা দিয়ে যে অস্ত্র কিনে দিয়েছি বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্যে, আজ সে অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে আমার নিরীহ মানুষদের হত্যা করার জন্য। আমার দুখি জনতার উপর চলছে গুলি।“

আবার অনুপ্রাসের ব্যবহার দেখুন- “.........আমি আগেই বলে দিয়েছি কোন গোলটেবিল বৈঠক হবে না। কিসের গোলটেবিল বৈঠক? কার গোলটেবিল বৈঠক? যারা আমার মা বোনের কোল শূন্য করেছে তাদের সাথে বসবো আমি গোলটেবিল বৈঠকে ?”

“.................সেক্রেটারীয়েট, সুপ্রীম কোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট সহ সরকারী, আধা-সরকারী এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলো বন্ধ থাকবে। শুধু পূর্ব বাংলার আদান-প্রদানের ব্যাঙ্কগুলো দু-ঘন্টার জন্য খোলা থাকবে। পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে টাকা যেতে পারবেন না। টেলিগ্রাফ, টেলিফোন বাংলাদেশের মধ্যে চালু থাকবে। তবে, সাংবাদিকরা বহির্বিশ্বে সংবাদ পাঠাতে পারবেন।..................।

তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ কিছু বলবেনা। গুলী চালালে আর ভাল হবে না। সাত কোটি মানুষকে আর দাবীয়ে রাখতে পারবা না। বাঙ্গালী মরতে শিখেছে, তাদের কেউ দাবাতে পারবে না।“

বীর রসে জারিত শব্দমালাঃ ...”কিন্তু হুঁশিয়ার, একটা কথা মনে রাখবেন, আমাদের মধ্যে শত্রু ঢুকেছে, ছদ্মবেশে তারা আত্মকহলের সৃষ্টি করতে চায়। বাঙ্গালী-অবাঙ্গালী, হিন্দু-মুসলমান সবাই আমাদের ভাই, তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের। রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্র যদি আমাদের আন্দোলনের খবর প্রচার না করে তবে কোন বাঙ্গালী রেডিও এবং টেলিভিশনে যাবেন না।“

পূণরায় অনুপ্রাসের ব্যবহার-“আমার অনুরোধ প্রত্যেক গ্রামে, মহল্লায়, ইউনিয়নে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গড়ে তুলুন। হাতে যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।

এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’’


বাংলা ইনসাইডার/এমআরএইচ