ঢাকা, বুধবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২০, ১৬ মাঘ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

সামাজিক ব্যাধি নির্মূলে প্রধানমন্ত্রীর নতুন পরিকল্পনা!

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯ মঙ্গলবার, ০৬:০০ পিএম
সামাজিক ব্যাধি নির্মূলে প্রধানমন্ত্রীর নতুন পরিকল্পনা!

একটা কথায় আমার মত অনেকেই তাঁদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানের ইঙ্গিত পেয়েছেন। কারণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক আর দুর্নীতির মতো সমাজের এই সমস্ত অসুস্থতাগুলো দূর করতে হবে। এসবের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্পেনে স্থানীয় সময় রোববার সন্ধ্যায় হোটেল ভিলা ম্যাগনায় প্রবাসী বাংলাদেশীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় কালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

রাষ্ট্রনায়কদের কথা শুধু কথা না। এর আগে পিছে অনেক কথা থাকে, থাকে অনেক ঘটনা, অনেক সমীকরণ, অনেক প্রত্যাশা। তাহলে এই প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির যোগ কীভাবে হবে! কীভাবে তা বাস্তবে রূপ নিতে পারে তা নিয়েই একটু আলোচনা করা যেতেই পারে। কারণ উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের দেশে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক আর দুর্নীতি লাফিয়ে লাফিয়ে বিস্তার লাভ করছে। উন্নয়নশীল বা মধ্যম আয়ের দেশ যারা হয়েছে তাদের প্রায় সবার নাকি এই অবস্থার মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে। ইউরোপে শিল্প-বিপ্লবের গড়ার দিকেও এমন অবস্থা ছিল।

উন্নয়নকে আমরা যদি মোটা-দাগে দুই ভাগে ভাগ করি তাহলে দেখি অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা দৃশ্যমান উন্নয়ন যা সবাই চোখে দেখতে পান। আর আত্মিক উন্নয়ন বা মানবিক উন্নয়ন তথা অদৃশ্য উন্নয়ন যা দেখার নয়, অনুভবের।

আমরা সবাই দেখছি যে খুব দ্রুততার সাথে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন চলছে। ঠিক একইসাথে আমরা এও দেখছি যে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক আর দুর্নীতির মতো খারাপ দিকগুলো আমাদের সমাজে বেড়েই চলেছে, অনেকটা লাগামহীন ভাবে। সমাজের এই উন্নয়ন যেমন এক দিনে হয়নি ঠিক তেমনি মানুষের এই অধঃপতনও রাতারাতি হয়নি। তাই এর থেকে বেরিয়ে আসাও রাতারাতি সম্ভব নয় বলে সারা দুনিয়ার মানুষের অভিজ্ঞতায় জানা যায়।

আমরা দেখে নিতে পারি যে, যারা উন্নত হয়েছে সেই সব দেশগুলো কীভাবে তাদের দেশের সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক আর দুর্নীতির মতো সমস্যাগুলোর সমাধান করেছে!

উন্নত দেশগুলো প্রথমে সমস্যার ডালপালা ধরে শিকড়ে যাবার চেষ্টা করেছে। সমস্যাগুলোর সাথে জড়িত পক্ষগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছে। এটা অনেকটা ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরিতে রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষার মত। তাঁরা তাঁদের ‘সামাজিক ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরিতে’ সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক আর দুর্নীতির মতো সামাজিক ব্যাধির কারণ ও তা নির্মূল বা সহনীয় পর্যায়ে আনার উপায় খুঁজে পেয়েছে। একই ওষুধ যেমন সব রোগ সারাতে পারে না, তেমনি একই ফর্মুলা সব দেশের সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক আর দুর্নীতির মতো সামাজিক সমস্যার সমাধান দিতে পারে না। তবুও দীর্ঘ চর্চার মাধ্যমে সামান্য পরিবর্তন বা সংযোজন বিয়োজনের মাধ্যমে একটা কর্মসূচী তৈরি করা যায়।

একটি সূত্রের দাবি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী মনে করেন যে, শুধু আইন করে দেশে চলমান অপরাধ দমন বা নির্মূল সম্ভব না। তার জন্য দেশের দরকার উন্নত চারিত্রিক গুন সম্পন্ন মানুষ, জাগ্রত বিবেকের নাগরিক সমাজের একটি জাতি। তিনি দুটি উপায়ে সমাজ থেকে স্বল্পতম সময়ে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক আর দুর্নীতির মতো সামাজিক ব্যাধি নির্মূলের চিন্তা করছেন এবং সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছেন।

প্রথমত হচ্ছে টপ ডাউন এপ্রোচ, যা এখন চলমান আছে। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক আর দুর্নীতি, নিজের দলে শুদ্ধি অভিযানের মত কাজ এখন খুব শক্তভাবে চালানোর চেষ্টা তিনি করে চলেছেন সরকারের মধ্যে থাকা কিছু ভালো মানুষ সাথে নিয়ে। এর জন্য প্রয়োজনে নতুন নতুন আইন প্রণয়ন করা এবং নিয়মিত তা সংশোধনের প্রক্রিয়া শক্তভাবে চালু রাখা। তিনি আরও মনে করেন যে, অপরাধকারীরা অনেক মেধাবী আর তাদের হাতে আছে অবৈধভাবে অর্জিত অনেক টাকা। সেই টাকায় অসৎ উকিল নিয়োগ করে তারা আইনের ফাঁক দিয়ে শাস্তি এড়িয়ে মাফ পেয়ে যায়, জেল থেকে বেরিয়ে যায়। একবার বেরুলে যাতে তার রিপিট না হয় তার জন্য আইনের সংশোধন এবং সংশোধিত আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরী।

দ্বিতীয়ত তিনি সারা দেশে শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে বিশেষ করে প্রাথমিক মাধ্যমিক স্তরের কারিকুলামে/ সিলেবাসে নৈতিকতা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। আর উচ্চ শিক্ষার স্তরে পেশাগত নৈতিকতা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। পরে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক আর দুর্নীতির মতো অপরাধের বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ খুব শক্ত হাতে নিশ্চিত করা। আমাদের মত দেশে যেখানে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে দেশের সব নাগরিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা সম্ভব হয় না, সেখানে কিছু কৌশল নিতেই হয়। প্রাথমিকের শিশুদের নৈতিক শিক্ষায় বলিয়ান করলে নিজ নিজ বাসায় শিশুদের বাবা মা সতর্ক হবেন, পারিবারিক নৈতিকতা শক্তিশালী হবে। কারণ কোন বাবা মা তাঁদের সন্তানদের কাছে তাঁদের কুৎসিত চেহারা দেখাতে চান না। এভাবে কাদার মত নরম, কোমল মনের শিশুদের মনে নৈতিকতার শক্ত বীজ বপন করা গেলে ক্রমান্বয়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক নৈতিকতা শক্তিশালী হবে। নিকট ভবিষ্যতেই উন্নত নৈতিকতা সম্পন্ন এক ঝাঁক তরুণ তরুণী দেশের মধ্যে চলমান সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক আর দুর্নীতির মতো খারাপ দিকগুলো নিয়ন্ত্রণে আনবে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একটি সহযোগী সংগঠনের উচ্চ পর্যায়ের কিছু নেতা আগামী জানুয়ারি থেকেই প্রাথমিকে নৈতিকতা শিক্ষার উপকরণ তৈরি নিয়ে কাজ শুরু করবে বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। সূত্র জানায় যে, প্রধানমন্ত্রী অর্থনৈতিক ও নৈতিক শিক্ষায় বলিয়ান একটি দেশ ও জাতি গঠনের স্বপ্ন দীর্ঘদিন তার হৃদয়ে লালন করেন বলেই তার মুখ থেকে সামাজিক অসুস্থতা দূর করার এমন কথা উচ্চারিত হয়েছে।

বাংলা ইনসাইডার/এমআরএইচ