ঢাকা, বুধবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২০, ১৬ মাঘ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

স্বৈরাচার পতনের দিনে অস্বস্তির অরণ্যে রোদন

প্রণব সাহা
প্রকাশিত: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯ শুক্রবার, ০৮:০৪ এএম
স্বৈরাচার পতনের দিনে অস্বস্তির অরণ্যে রোদন

১৯৯০ থেকে ২০১৯, উনত্রিশ বছর কি বড় বেশি সময়? নাকি বাঙালি সব দ্রুত ভুলে যায়, সেই অপবাদ আমরা মেনে নিচ্ছি সব সময়? কথাগুলো আসলো আজ ৬ ডিসেম্বর, ক্যালেন্ডারের এই দিনটিকে স্মরণ করে। বাংলাদেশের জন্য ডিসেম্বর মাস বিজয়ের মাস। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে লাল-সবুজের পতাকা, বাংলার ভূখণ্ড শত্রুমুক্ত হয়েছিল। আর আজকের এই দিনে একাত্তরে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছিল ভূটান ও ভারত।

৬ ডিসেম্বর আরও একটি কারণে স্মরণীয়। কারণ ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ প্রায় ২১ বছরের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসন থেকে মুক্ত হয়ে নতুন করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছিল। সামরিক স্বৈরাচার লে. জেনারেল (অব.) এইচ এম এরশাদ গণঅভ্যুত্থানে নথি স্বীকার করে গদি ছেড়েছিলেন। এমনকি সাংবিধানিক বিধান না থাকা সত্ত্বেও তখনকার প্রধান বিচারগতি শাহাবুদ্দিনকে প্রথমে উপ-রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়ে তার কাছেই ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন। তখন জনতার চাওয়াই ছিল ‘আইন-সংবিধান’। কিন্তু জনগণের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তখনকার আটদল, বিএনপির নেতৃত্বে সাতদল ও বামপন্থীদের পাচদল এখন আর তেমন করে ‘স্বৈরাচারের পতন দিবস’ পালন করে না। উল্টো সবার আগে এইচ এম এরশাদের তৈরী করা জাতীয় পার্টি প্রেস রিলিজ দিয়ে জানিয়েছে যে তারা আজ ৬ ডিসেম্বর সংবিধান সংরক্ষণ দিবস পালন করবে।

১৯৯০ সালে পতন হলেও, একজন সামরিক স্বৈরশাসক হয়েও মৃত্যুর আগে এইচ এম এরশাদ তার গা থেকে দুঃশাসনের গন্ধ দুর করতে পেরেছিলেন, দেশের সাধারণ মানুষের কাছে না হলেও অন্তত কিছু রাজনৈতিক, এবং দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে। তাই তারা ভুলে গেছেন নব্বইয়ের ‘তিনজোটের রূপরেখা’। এমনকি নিজের কারিশমায় ‘সফল রাজনীতিক’ এরশাদ বুকে জাতীয় পতাকা, সংসদ ভবনে সব্বোর্চ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান নিয়ে বিদায় নিতে সক্ষম হয়েছেন। হয়তো সেই কারণেই জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা শহীদ নূর হোসেনকে অপমান করতে দ্বিধা করেন নাই। তবে শেষ পর্যন্ত জাতীয় সংসদে দাড়িয়ে তাকে ক্ষমা চাইতে হয়েছে।

দেশের ইতিহাস রাজনীতি আর রাষ্ট্র পরিচালনায় এইচ এম এরশাদের অবদানের মূল্যায়ন করবে। কিন্তু এটাতো ঠিক যে পচাত্তরের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর পরোক্ষ সামরিক শাসনকে দ্বিতীয় ধাপে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত টেনে নিয়েছিলেন এইচ এম এরশাদই। এখন দেশে শুদ্ধি অভিযান চলছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নিজের ঘরে। কিন্তু রাজনীতিবিদের দলে টানার জন্য ‘মন্ত্রীত্বের লোভসহ’ আরো অনেক কিছুর মাধ্যমেই রাজনীতিকে কালিমামুক্ত করেছিলেন গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত এইচ এম এরশাদ। আজ সেই ৬ ডিসেম্বর।

এটা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হতে পারে, আবার এলাকাপ্রীতির নেতিবাচক প্রভাব হতে পারে কিন্তু বাস্তবতা ছিল যে ১৯৯০ সালে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থেকেও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ১৯৯১ সালে রংপুরের ৫টি আসনে বিজয়ী হয়েছিলেন। আর বর্তমান সংসদেরওতো বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবেই বিদায় নিয়েছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক বা সমাজবিজ্ঞানীরা রাজনীতিতে এইচ এম এরশাদের পুর্নবাসন নিয়ে গবেষণা করবেন। কিন্তু শহীদ ডা. শামসুল আলম মিলন, নূর হোসেন, রাউফুন বসুনিয়া এবং তাজুল ইসলামসহ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যান্য শহীদদের পরিবারের কাছে আমাদের কৈফিয়ত কি? কেন নূর হোসেনের মা-ভাইদেরকেই প্রেসক্লাবের সামনে ছুটে যেতে হলো? জাফর-জয়নাল-দিপালী সাহার মত গুচ্ছ গুচ্ছ শহীদদের আত্মারা কি আমাদের ধিক্কার দেয় না, যখন দেখে স্বৈরাচারের পতন দিবসে রাজনীতিকরা এমনকি নব্বইয়ের ছাত্র আন্দোলনের রাজপথের যোদ্ধারা লজ্জায় মুখ ঢাকেন।

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় জাসদ-ছাত্রলীগের শীর্ষনেতা এবং এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত শফি আহমেদ ফেসবুকে একটি ছবি দিয়েছেন। এরশাদের পতনের পর পল্টন মোড়ে স্থাপিত হয়েছিল ‘জনতার জয় সম্প্রচার কেন্দ্র’। সেই গণমঞ্চের যে ছবিটি শফি আহমেদ ফেসবুকে দিয়েছেন সেখানে দেখা যাচ্ছে এখনকার বিএনপির নেতা আমান উল্লা আমান, তখনকার ছাত্র ইউনিয়নের নেতা মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, ছাত্রলীগের হাবিবুর রহমান হাবিব (দুজনই এখন বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত), ডা. মুশতাক আহমেদ, নূর আহমেদ বকুলসহ আরো অনেককেই। এই সব রাজনীতিকরা কি নিশ্চুপ থাকবেন ৬ ডিসেম্বরে? রাজনৈতিক স্বার্থে আমরা অতীতের সবকিছু ভুলে যাবো? নির্বাচনে ‘জয়ের রসায়ন’ বা প্রতিপক্ষকে যেকোনো মূল্যে ঘায়েলের আদর্শহীন রাজনীতিই কি আমাদেরকে বাধ্য করছে গড্ডালিকায় গা ভাসাতে? জানিনা সে কারণেই কি দশ বছর একটানা ক্ষমতায় থাকার পর ক্ষমতাসীন দলের ভেতর থেকো শুদ্ধি অভিযান শুরু করতে হলো। হয়তো জাতীয় পার্টির নেতারা ৬ ডিসেম্বরের এমন লেখাকে অহেতুক পুরনো কাসুন্দি বলে নাক সিটকাতে পারেন বা মশিউর রহমান রাঙ্গার মত কেউ দুটো গালিও দিতে পারেন, কিন্তু তাদেরও মনে রাখতে হবে যে তাদের নেতা যাকে দেশের মানুষ বুলেট-বেয়নেট আর কাঁদানে গ্যাসের ধোয়ার সাথে জেল-জুলুম মোকাবেলা করেই গণআন্দোলনকে সফল করেছিল। আর হত্যা ও দুর্নীতি মামলার আসামি হিসেবেই এইচ এম এরশাদের মৃত্যু হয়েছে।

 

বাংলা ইনসাইডার