ঢাকা, রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

পেঁয়াজের ঝাঁজে নাকাল সরকার!

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯ রবিবার, ১০:০০ পিএম
পেঁয়াজের ঝাঁজে নাকাল সরকার!

অসময়ের বৃষ্টির কারণে উৎপাদনে ঘাটতি, দেশে মজুত কম থাকায় আর ভারতের পেঁয়াজ রফতানি না করার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের পেঁয়াজের বাজারে আগুণ লেগেছে। এবছরের আগে বাংলাদেশে আমদানির প্রায় ৭৫ শতাংশই আসতো ভারত থেকে, কিছু মিয়ানমার থেকে। ভারতের পিঁয়াজ রফতানি নিষিদ্ধের কারণে বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম কেজি প্রতি ২২০ বা তার চেয়ে বেশিতে টাকায় (প্রায় ৩ ডলার) গিয়ে ঠেকেছে।

পেঁয়াজ নিয়ে জনগণের মাঝে সৃষ্ট অসন্তোষ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার জরুরি ভিত্তিতে মিয়ানমার, তুরস্ক, চীন ও মিশর থেকে বিমানে পেঁয়াজ আমদানি করছে। ভারতের পেঁয়াজ রফতানি নিষিদ্ধের পর, বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকেও পেঁয়াজ আমদানি করেছে। দ্য নিউজ ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, প্রায় ১৫ বছরের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো পাকিস্তান থেকে পেঁয়াজ আমদানি করছে বাংলাদেশ। প্রথম চালান বিমানযোগে ঢাকায় পৌঁছেছে ২০ নভেম্বর।

বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ দপ্তর টিসিবি আমদানি করা পেঁয়াজ ভর্তুকি দিয়ে খোলা বাজারে কম দামে বিক্রি করছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, তাঁদের স্ত্রীদের সংগঠন পুনাক কম দামে পেঁয়াজ বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে চট্টগ্রাম এলাকায় এখন থানায় পেঁয়াজ কিনতে পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি উঠেছে, সময়মত পেঁয়াজ আমদানির পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে ব্লেইম গেম শুরু হয়েছে।

অন্যদিকে এই অঞ্চলের অন্যতম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী দেশ ভারতেও পিয়াজের ঘাটতি দেখ দিয়েছে। পেঁয়াজের দাম বাড়তে বাড়তে এবার তা ভারতের কোথাও কোথাও ২০০ রুপি ছুঁতে চলেছে। পেঁয়াজ ইস্যুতে সরকার বিরোধীদের আক্রমণের মুখে অস্বস্তিতে নরেন্দ্র মোদী সরকার। এবার সেই ঝাঁজ গড়িয়েছে আদালতে। ভারতের কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রী রামবিলাশ পাসোয়ানের বিরুদ্ধে বিহারের এক আদালতে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি ইস্যুতে ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়েছে। এতে খাদ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে `প্রতারণা ও বিভ্রান্ত করার` অভিযোগ আনা হয়েছে। মুজ্জাফ্ফরপুর মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে মামলাটি করেছেন এম রাজু নায়ার নামে এক সমাজকর্মী। আগামী ১২ ডিসেম্বর মামলার শুনানির দিন স্থির করেছেন বিচারক মৌর্য কান্ত তিওয়ারি।

ভারতে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে গঠিত রাজ্য সরকারের টাস্ক ফোর্সও জানিয়েছে, চলতি মাসে পেঁয়াজের দাম কমার সম্ভাবনা কম। মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়া বাজারে ৫ ডিসেম্বর পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে কেজি-প্রতি ১৫০ রুপিতে। নওদার আমতলা বাজারেও পেঁয়াজের দাম ১৪০-১৫০ রুপি প্রতি কেজি। কলকাতায় রাজডাঙা বাজারেও পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১৫০ রুপি কেজি দরে।

৫ ডিসেম্বর বিবিসি বলেছে, হঠাৎই গত বুধবার থেকে পেঁয়াজের দাম বেড়ে ভারতে ১৫০ টাকা (রুপি) কিলো হয়ে গেছে। কলকাতা আর পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু বাজারে পেঁয়াজের এই দামই নেওয়া হচ্ছে। কোথাও সেটা দশ টাকা কম।

বাংলাদেশের টিসিবি’র মত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যে সবজি বিপণন ব্যবস্থা আছে, সেখানে প্রতি কিলো ৫৯ রুপি দরে পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। ৮৮ রুপিতে কেনা ওই পেঁয়াজ ভর্তুকি দিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। তবে ঐ সরকারি দোকান আর চলমান ভ্যান হাতে গোনা, যার ফলে সাধারণ মানুষকে ১৫০ বা ১৪০ রুপি দিয়েই পেঁয়াজ কিনতে হচ্ছে। ওদিকে দিল্লিতেও পেঁয়াজের দাম ১০০ রুপি পেরিয়েছে।

মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, মধ্য প্রদেশ ও ভারতের অন্যান্য পেঁয়াজ উৎপাদনকারী রাজ্যগুলোতে মওসুমের বাইরে ভারি বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে পেঁয়াজের দাম এমনভাবে বেড়ে গেছে, যেটা ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত কখনও হয়নি। পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ, যেহেতু তিনি অর্থনীতির নিম্নগতি ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছয় বছরের মধ্যে নিম্নতম পর্যায়ে চলে গেছে, এবং অনেকেই অর্থনীতির অবনতির আশঙ্কা করছেন।

দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে অধিকাংশ খাবারেই পেঁয়াজ অনেকটা বাধ্যতামূলক। পেঁয়াজের কারণে ভারতে সরকার পতনের নজিরও ইতিহাসে রয়েছে। ১৯৯৮ সালে দিল্লী আর রাজস্থানে এ কারণেই সরকারের পতন হয়েছিল। ১৯৮০ সালে পেঁয়াজের উচ্চমূল্যের কারণেই ইন্দিরা গান্ধীর জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ রাখাটা সহজ হয়েছিল। অনেকেই সে বারের নির্বাচনকে ‘পেঁয়াজের নির্বাচন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

দেশের ভেতরের চাপ ও চাহিদার কারণে ভারত সরকার সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে পেঁয়াজ রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। উল্টা ঘোষণা দেয়া হয় যে, আফগানিস্তান, তুরস্ক, ইরান ও মিশর থেকে ১০০,০০০ টন পেঁয়াজ আমদানি করবে ভারত। কিন্তু, পেঁয়াজের সঙ্কট বেড়ে যাওয়ায় ভারতের বর্তমান সরকার আবারও আঙ্কারার কাছে ফিরেছে। দ্য প্রিন্টের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের প্রাইস স্ট্যাবিলাইজেশান ফান্ড ম্যানেজমেন্ট কমিটি (পিএসএফএমসি) ২২ নভেম্বর তুরস্কের কাছ থেকে ১১,০০০ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানির জন্য টেন্ডার দিয়েছে।

অতীতে ভারত নিজেও প্রতিবেশী পাকিস্তান থেকে আমদানি করেছে। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের আমলে পেঁয়াজের দাম যখন বেড়ে গিয়েছিল ভারতে তখন পাকিস্তান থেকে পেঁয়াজ আমদানি করেছিল।

বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া আমদানির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পেঁয়াজ এনে অসদুপায়ে বিপুল মুনাফা করার অভিযোগ উঠেছে আমদানি-কারকদের বিরুদ্ধে। টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ ট্রাকে ওঠা পর্যন্ত কেজি-প্রতি খরচ পড়ে মাত্র ৪০-৪৫ টাকা। অথচ বিস্ময়কর-ভাবে সেই পেঁয়াজ খুচরা বাজারে বিক্রির সময় তার দাম উঠে যায় ২০০-২৩০ টাকায়। অর্থাৎ কেজিতে লাভ ১৬০-১৮০ টাকা। ভোক্তারা একে ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হওয়া বলে বিদ্রূপ করছেন। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, দীর্ঘ দুই মাস ধরে মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি বাড়লেও টেকনাফ-কক্সবাজারের স্থানীয় বাজারে বাড়তি আমদানির কোনো প্রভাব পড়েনি। বিভিন্ন সময় ‘সিন্ডিকেটের কারসাজি’র কথা উঠলেও এর বিরুদ্ধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ সরকার নিতে পেরেছে বলে সাধারণ মানুষ-বিশ্বাস করে না।

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া খবরে যা পাওয়া যাচ্ছে তাতে পেঁয়াজের ঝাঁজ এবার বাংলাদেশের রাজনীতিতেও ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই পেঁয়াজ ঘটতির সুযোগ নিয়ে চালের দাম বা লবণের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করেছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। সুযোগ নিতে চেয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক দল আর আওয়ামী লীগের মধ্যে যারা শুদ্ধি অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন তারাও সরকার বিরোধীদের সাথে তলে তলে হাত মিলিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। এমতাবস্থায় ভোজনবিলাসী বাঙ্গালীর মনের চাপা ক্ষোভ কাজে লাগাতে লন্ডনে পলাতক বিএনপি নেতা তারেক রহমান নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যাতে করে পেঁয়াজের ঝাঁজের উপর ভর করেই সরকারকে নাকাল করা যায়।

বাংলা ইনসাইডার/এমআরএইচ