ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য সুখবর

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ০২ জানুয়ারি ২০২০ বৃহস্পতিবার, ০৬:১৩ পিএম
তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য সুখবর

সন্তান জন্মের পরে আনন্দের যে বন্য বয়ে যায় তার ঠিক উল্টা বিষাদে মনকে দুমড়ে মুচড়ে খায় যখন বাবা–মা বা পরিবারের মানুষেরা টের পান যে, শিশুটি তৃতীয় লিঙ্গের। নতুন জন্ম নেওয়া শিশুটি কিছু বুঝে উঠার আগের তার নিজের পৃথিবীতে ছেয়ে যায় অবহেলা আর অবজ্ঞার কালো মেঘে। আমাদের সমাজে তাঁকে দেখা হয় ভিন্ন রূপে। যদিও এই তৃতীয় লিঙ্গের হয়ে জন্ম নেওয়াতে শিশুটার কোন দায় নেই। দায় থাকলে হয় তার বাবা মায়ের বা পরিবেশের, কিংবা অজানা কোন কারণের। তবুও এই দুর্বিষহ জীবন তাঁকে যাপন করতে হয় বেঁচে থাকার জন্য, কারণ এই সুন্দর পৃথিবীতে কেউ মরতে চায় না। কেন শিশুরা তৃতীয় লিঙ্গের বা হিজড়া হয়ে জন্মায় তার নানাবিধ ব্যাখ্যা আছে। বিভিন্ন মিডিয়া আর জার্নালের খবর থেকে এর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। যেমন-

হরমোনগত ব্যাখ্যা: সাধারণত জন্মের সময় ভ্রূণের একই টিস্যু থেকে পুরুষ এবং স্ত্রী জননাঙ্গের সৃষ্টি হয়। ভ্রূণ বিকাশকালে যদি টেস্টোস্টেরন হরমোন নিঃসরণের মাত্রা অধিক হয়, তাহলে পুং জননাঙ্গ তথা পেনিস, স্ক্রোটাম ও পিনাইল ইউরেথ্রা তৈরি হয় যা পুরুষের পরিচয় বহন করে। আর যদি টেস্টোস্টেরন হরমোন কম নিঃসৃত হয় বা একেবারেই নিঃসৃত না হয়, তাহলে স্ত্রী জননাঙ্গ তথা ক্লিটোরিস, লেবিয়া মেজোরা এবং ভ্যাজাইনা তৈরি হয়, যা একজন নারীর পরিচয় বহন করে।

ব্যতিক্রম ঘটে তখন, যখন টেস্টোস্টেরন হরমোন নিঃসরণের পরিমাণ খুব বেশিও হয় না, আবার কমও হয় না, একটি মাঝামাঝি পর্যায়ে থাকে। এর ফলে জীনগত ভাবে পুরুষের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত ছোট পেনিস ও টেস্টিস তৈরি হয় এবং পেনিস ছোট হওয়ার কারণে তা স্ক্রোটাম এর সাথে সংলগ্ন না থেকে বেশ খানিকটা উপরে থাকে। নারীদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক ভাবে প্রশস্ত ক্লিটোরিস থাকে যা লেবিয়ার সাথে সংযুক্ত অবস্থায় থাকে। আবার কিছু মানুষের অপরিণত পুং এবং স্ত্রী জননাঙ্গ উভয়ই থাকে।

ক্রোমোজোম গত ব্যাখ্যা: ক্রোমোজোম হলো বংশগতির ধারক ও বাহক। এর কাজ হচ্ছে মাতা-পিতার জিনগত বৈশিষ্ট্য সন্তানের মাঝে বহন করে নিয়ে যাওয়া।মানুষের প্রতিটি দেহকোষে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম রয়েছে। এর মধ্যে সেক্স ক্রোমোজোম অন্যতম যা সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ করে। প্রতিটি মানুষের শরীরে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোমের মধ্যে একজোড়া সেক্স ক্রোমোজোম থাকে। সেক্স ক্রোমোজোম দুটিকে X এবং Y দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। ভাবছেন বাকি ক্রোমোজোমগুলোর কাজ কী? বাকি ক্রোমোজোমগুলো জীবের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বহন করে থাকে।

মায়ের শরীরে এক জোড়া XX সেক্স ক্রোমোজোম এবং বাবার শরীরে XY সেক্স ক্রোমোজোম থাকে। মা ও বাবা উভয়ের X ক্রোমোজোম মিলিত হলে কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। আর মায়ের X ক্রোমোজোম ও বাবার Y ক্রোমোজোম মিলিত হলে পুত্র সন্তানের জন্ম হয়।

বিপত্তিটা ঘটে তখন, যখন ক্রোমোজোম স্বাভাবিক নিয়মে বিন্যস্ত হয় না। যার ফলে ভূমিষ্ঠ সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ নিয়ে তৈরি হয় এক ধরনের জটিলতা। সন্তানটিকে মেয়ে বা ছেলে হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। ক্রোমোজোমের অস্বাভাবিক বিন্যাসের উপর ভিত্তি করে লিঙ্গ জটিলতা সম্পন্ন মানুষ অর্থাৎ হিজড়াদের ৫টি গোত্রে ভাগ করা যায়।

১) XXY পুরুষ – এরা পুরুষদের মতো দেখতে হলেও শারীরিক গঠনে পুরুষদের সাথে রয়েছে ভিন্নতা। স্বাভাবিকের তুলনায় লম্বা হয় এবং পুরুষের ন্যায় জননাঙ্গ থাকলেও তা পরিপূর্ণ নয়। একজোড়া সেক্স ক্রোমোজোমের জায়গায় এদের শরীরে আরও একটি সেক্স ক্রোমোজোম বেশি থাকে অর্থাৎ দুটি X ক্রোমোজোম ও একটি Y ক্রোমোজোম থাকে।

২) XX পুরুষ – এদের ঈষৎ স্ফীত বক্ষ থাকে, তবে তা কখনোই সুডৌল হয় না। এরা বেঁটে আকৃতির হয় এবং অনেকটা স্বাভাবিকের ন্যায় পুরুষাঙ্গ থাকলেও শুক্রাশয়ে শুক্রাণু উৎপন্ন হয় না। XX ক্রোমোজোম থাকলেও অস্বাভাবিক ক্রোমোজোম বিন্যাসের কারণে এরা কখনো পুরোপুরি নারী হয়ে উঠতে পারে না। পুরুষালি গুণ বেশি প্রকাশিত হয়।

৩) ক্লাইনেফেলটার সিনড্রোম – এদের স্ফীত বক্ষ থাকে এবং অপেক্ষাকৃত ছোট পুরুষাঙ্গ থাকে। এদের দাঁড়ি-গোঁফ খুবই কম গজায় এবং জননাঙ্গের আশেপাশেও চুলের পরিমাণ অনেক কম থাকে। এরা স্বভাবত লম্বা হয়ে থাকে। এদের শরীরে দুটি X ক্রোমোজোম ও একটি Y ক্রোমোজোম থাকে এবং X ক্রোমোজোমের প্রকটতার কারণে নারীর গুণ অধিক প্রকাশ পায়।

৪) টার্নার সিনড্রোম – এদের প্রথম দেখায় নারী বলে মনে হলেও স্ত্রী যৌনাঙ্গের সাথে তাদের যৌনাঙ্গের অনেক অমিল রয়েছে। এদের বুকের ছাতি পুরুষদের মতো প্রশস্ত হলেও তাতে স্ফীত বক্ষ পরিলক্ষিত হয়। এরা খাটো প্রকৃতির হয়ে থাকে। এদের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র একটি X ক্রোমোজোম অর্থাৎ একটি সেক্স ক্রোমোজোম থাকে। প্রয়োজনীয় আরও একটি সেক্স ক্রোমোজোমের অভাবে পুরুষ এবং নারী উভয়েরই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

৫) মিশ্র যৌন গ্রন্থির বিকৃতি – এদের দেখতে পুরুষের মতোই মনে হয় এবং অনেকটা স্বাভাবিক পুরুষাঙ্গই থাকে। কিন্তু এর সাথে স্ত্রী জননাঙ্গও বিদ্যমান থাকে। অ্যাড্রেনাল গ্ল্যান্ডের অস্বাভাবিক নিঃসরণ এবং অস্বাভাবিক ক্রোমোজোম বিকাশের কারণেই এমন যৌনাঙ্গ জটিলতা তৈরি হয়।

আমাদের মত দেশে শিক্ষার অভাবে তৃতীয় লিঙ্গের শিশুর জন্মকে নিজেদের পাপ বা বংশের অভিশাপ বিবেচনা না করে শিশুকে পরিণত বয়সে যাওয়ার আগে যদি যথাযথ মেডিকেল ট্রিটমেন্ট করা হয় তাহলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাকে সুস্থ করা সম্ভব। কিন্তু যখন বোঝা যায় সে সাধারণ আর দশজনের থেকে আলাদা তখন আসলে অনেক দেরী হয়ে যায়। তবে আশার কথা এই যে, এখন কোন পুরুষ বা নারী হিজড়াও অপারেশনে মাধ্যমে তার সেক্স চেঞ্জ করতে পারেন।

দুনিয়া জুড়ে এটা নিয়ে অনেকদিন ধরেই এসব শিশুদের নিয়ে মানবিক চিন্তা ভাবনা চলছে। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের বা তাঁদের স্বজনদের মানসিক নির্যাতন থেকে মুক্তি দিতে তাই ১৯২১ সালে জার্মানির ডোরা আর ম্যাগনাস হির্সফেল্ডের তত্ত্বাবধানে একটি সার্জিকাল ট্রানজিশন শুরু করেছিলেন, যা ১৯৩০ সালে একটি যৌনাঙ্গে পুনর্নির্মাণের একটি সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শেষ হয়েছিল। ১৯৩০ সালে, হির্সফেল্ড দ্বিতীয় যৌনাঙ্গে পুনর্নির্মাণ শল্যচিকিৎসার তদন্ত করেছিলেন ডেনমার্কের লিলি এল্বের একটি পিয়ার-রিভিউ জার্নালে বিস্তারিতভাবে রিপোর্ট করার জন্য। ১৯২৩ সালে, হির্সফেল্ড (জার্মান) শব্দটি "ট্রান্সসেক্সুয়ালিজমস" প্রবর্তন করেন, পরে ডেভিড অলিভার ক্যালডওয়েল ১৯৪৯ এবং ১৯৫০ সালে ইংরেজিতে "ট্রান্সসেক্সুয়ালিজম" এবং "ট্রান্সসেক্সুয়াল" প্রবর্তন করেন।

আমাদের পাশের ভারত, থাইল্যাণ্ডও এটি ইদানীং খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আমেরিকায় ২০১৪ সালে এক দশকের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবার পরে ২০১৫ তুলনায় ১৯% বেড়ে গেছে এই অপারেশন। মার্কিন হিসেবে ২০২৪ সাল নাগাদ এই খাতে ৯৬৮ মিলিয়ন ডলারের একটা বাজার তৈরি হবে সে দেশে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এই অপারেশনে গড় খরচ ধরা হয় ১,০০,০০০ মার্কিন ডলার। যার অধিকাংশ ইনস্যুরেন্স থেকে কভার করা হয়। থাইল্যান্ডে একমাত্র যৌনাঙ্গে পুনর্গঠনের জন্য ২৫,০০০ মার্কিন ডলার থেকে ৩০,০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত খরচ হয়। এর সাথে যদি স্তন বৃদ্ধি এবং ভয়েস ফেমিনিসেশন সার্জারি যুক্ত করতে হয় তবে ৫০,০০০ মার্কিন ডলারেরও বেশি খরচ হতে পারে। সাধারণভাবে, থাইল্যান্ডের এই অপারেশশনের খরচ যুক্তরাষ্ট্রের খরচের তুলনায় প্রায় এক তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেকের জন্য ব্যয় হয়। ভারতেও এই অপারেশন চলছে। যেখানে খরচ আরও কম ১০,০০০ মার্কিন ডলারের মত। যৌনাঙ্গে পুনর্নির্মাণের জন্য কোন কৌশলটি পছন্দ করা হবে তার উপর নির্ভর করবে খরচের পরিমাণ।

তবে যৌনাঙ্গে পুনর্নির্মাণ শল্যচিকিৎসার পরে হরমোন চিকিৎসা ও অন্যান্য ঝক্কি ঝামেলা কম না। রোগীকে একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকতে হয়। এতে অনেকে হতাশ হয়ে পড়েন। অনেক সময় ধরে তাঁকে সাবধানে চলাফেরা করতে হয়। নিজ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলে সামাজিক সমস্যাও আর থাকে না, কিন্তু মন থেকে এটা দূর করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও কালের পরিক্রমায় এটি আরও পরিণত রুপ নেবে এই আশা জেগে উঠেছে সবার মাঝে।

বাংলা ইনসাইডার/এমআরএইচ