ঢাকা, সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

আবার কি সেই ব্রিটিশ ষড়যন্ত্র!

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ০২ জানুয়ারি ২০২০ বৃহস্পতিবার, ০৮:৫৮ পিএম
আবার কি সেই ব্রিটিশ ষড়যন্ত্র!

বিংশ শতাব্দীর গোঁড়ার দিকে গোটা পৃথিবীর চার ভাগের এক ভাগ জুড়ে ছিল ব্রিটিশ শাসন। আর জনসংখ্যার বিচারে ছিল পঞ্চম। ১৯২২ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জনসংখ্যা ছিল ৪৫ কোটি ৮০ লাখ আর সাম্রাজ্যের আয়তন ছিল ৩,৩৭,০০,০০০ বর্গকিমি বা ১,২০,১২,০০০বর্গ মাইল। সবাই জানেন যে, ব্রিটিশ সরকার সাধারণত ব্যক্তি বা ব্যবসায়ীদের দিয়ে কলোনি বানিয়ে পরে সরকারী ভাবে সেটার দখল নিতো। বৃহত্তর ভারতের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয় নি। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি এখানে এলেও পরে ভারতের শাসনভার নেয় ব্রিটিশ সরকার।

ব্রিটিশ কলোনির লক্ষ্য লুটপাট হলেও ১৭৫০ সালের দিকে ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পরে শোষণের ধরণ পরিবর্তন করে কম দামে কাঁচা মাল নিয়ে গিয়ে বেশি দামে তাঁদের শিল্প পণ্য বিক্রির বাজার তৈরি করে উপনিবেশিক এলাকাকে। সেটা কতটুকু নৈতিক তা তাঁদের বিচার্য ছিল না। সেই কারণেই শুধু আফিম বিক্রির অনুমতি না দেওয়ায় জোট বেঁধে চীনের সাথে যুদ্ধ করে তাঁদের হারায়। বাংলাদেশে নীল চাষ, ব্রিটিশ পুলিশ দিয়ে অত্যাচার করে কর আদায়ের লোম হর্ষক কাহিনী আমরা অনেকেই মুরুব্বীদের কাছে বা পত্র পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি।

আমাদের দেশ সেই প্রাচীন কাল থেকেই তাঁরা তাঁদের অর্থনৈতিক ফায়দা নিতে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তার কিছু তথ্য প্রমাণ এখানে হাজির করার চেষ্টা করা যায়। অবিভক্ত ভারতের এই ভূখণ্ডে নিজেদের দালাল তৈরির কাজ তাঁদের অনেক পুরাতন। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় যে, ১৮৫৭ সালের পরে ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারতের শাসনভার নিজ হাতে তুলে নেবার পরেই তাঁরা ভারতীয়দের, বিশেষ করে বাঙ্গালীদের অবিশ্বাস করা শুরু করে। কারণ ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বে ছিল নেতাজী সুভাষ বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও কিছু বাঙ্গালী মুসলমান। কবিগুরুও তাঁর লেখার ভেতর দিয়ে হিন্দুদের সাবধান করেছেন। এছাড়াও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ছিলেন মাওলানা শরিয়তুল্লাহ, মাওলানা আজাদ, খান আব্দুল গফফার খান সহ আরও অনেকে।

তাই ১৯০৫ সালে বাঙ্গালীদের দুর্বল করতে বঙ্গভঙ্গ করে ব্রিটিশরা কিন্তু তুমুল আন্দোলনের মুখে ২০১১ সালে তা রদ করতে বাধ্য হয়। তখন কলকাতা ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। এসময় তাঁরা বাঙ্গালীদের ভয়ে তাঁদের রাজধানী দিল্লীতে সরিয়ে নেবার পরিকল্পনা করে। দিল্লীর পাশে কিছু জমি নিয়ে নয়া দিল্লী নামে নামকরণ করে যেখানে স্থাপনা তৈরি শুরু করে। এখানে শেষ নয় তাঁরা বাঙ্গালীর বাইরে তাঁদের তাঁবেদারি করার মত লোক খুঁজতে শুরু করে।

ব্রিটিশদের প্রত্যক্ষ মদদে ৩০ ডিসেম্বর, ১৯০৬ সালে যদিও নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলেও সেখানে ব্রিটিশদের পক্ষে দালালি করার মত লোকের অভাব ছিল। এমন সময় তাঁরা ব্যারিস্টার মোহন চাঁদ করম চাঁদ গান্ধীর শরণাপন্ন হয়। কারণ বহুগামি, কামান্ধ গান্ধী যিনি এই কারণেই মৃত্যুকালে তার বাবার শেষ ডাক উপক্ষা করে পরবর্তীতে আক্ষেপ করেছেন, সেই তিনি আগেই নিজের বওফাদারীর প্রমাণ রেখেছিল ব্রিটিশদের কাছে। ব্রিটিশদের পক্ষ নিয়ে গান্ধীজী তিন তিন বার যুদ্ধ ক্ষেত্রে সশরীরে হাজির ছিলেন এবং ব্রিটিশ সেনাদের সাহায্য করার জন্যে তিন তিন বার ব্রিটিশদের দ্বারা পুরস্কৃত হন। সেগুলো ছিল- বুয়োর যুদ্ধ, জুলুর যুদ্ধ এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। চাকরির সুবাদে গুজরাটি মুসলিম আব্দুল্লার সাথে তার যোগাযোগ ছিল। সেই মাধ্যমেই গান্ধী আরেক গুজরাটি বাহাই মুসলিম নামে খ্যাত মোহাম্মদ আলী জিন্নাবাইয়ের সন্ধান পান। যিনি পরবর্তীতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নামে পরিচিতই পান, তিনিও ব্যারিস্টার ছিলেন বিধায় খুব সহজেই তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে যায়। জিন্নাহ নিজেও শুকুরের মাংস প্রেমী মদ্য পানের ওস্তাদ ছিলেন বলে সবাই জানেন।

জিন্নাহ রাজনীতিতে আসেন ১৯০৬ সালে। সেসময় ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হিন্দুসমাজের তীব্র প্রতিবাদ মুখর পরিস্থিতিতে কলকাতায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন চলছিল। দাদাভাই নওরোজীর কংগ্রেসের নতুন ব্যানারে তখন ‘স্বরাজ’-এর স্লোগান যুক্ত হয়, জিন্নাহও তাতে সামিল হন।

১৯০৯ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারতীয় কাউন্সিল অ্যাক্ট পাশ হলে রাজনীতিতে জিন্নাহর উত্থান শুরু হয়। এ আইনের মাধ্যমে ভাইসরয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলকে ইম্পেরিয়েল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে রূপান্তরিত করা হয় এবং এতে নতুন ৩৫ জন মনোনীত সদস্য এবং ২৫ জন নির্বাচিত সদস্য অন্তর্ভুক্ত করে এর কলেবর বৃদ্ধি করা হয়। এতে মুসলমানদের এবং জমিদার শ্রেণীর জন্য বিশেষ প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা থাকে। জিন্নাহ বোম্বাইয়ের একটি নির্বাচনী এলাকা থেকে কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর মুসলিম লীগের সঙ্গে জিন্নাহর যোগাযোগ শুরু হয়। মওলানা মোহাম্মদ আলী ও সৈয়দ ওয়াজির হাসানের অনুরোধে জিন্নাহ ১৯১৩ সালে মুসলিম লীগে যোগ দেন।

গান্ধীজী ১৯১৫ সালে ভারতে ফিরলেন ৪৬ বছর বয়সে ২৮ ডিসেম্বর, ১৮৮৫ প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় কংগ্রেসকে নেতাজি মুক্ত করে নিজের দখলে নিতে ব্রিটিশদের পরিকল্পনা মত ভারতে আসেন। এবং নানা কৌশলে মাত্র ৬ বছরের মধ্যেই অহিংসবাদী নেতা হয়ে উঠলেন কংগ্রেসের! ব্রিটিশ অক্টিভিয়াম হিউম সাহেবের নিজের হাতে তৈরি কংগ্রেস দলটা ব্রিটিশদের কাছে ছিল অনেকটা সেফটি ভাল্বের মত, যার গৌণ কাজ যদিও ছিল ভারতীয়দের নিয়ে ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারতীয়দের পক্ষে বিভিন্ন দাবী দাওয়া আদায় করা, কিন্তু তলেতলে মুখ্য কাজই ছিল ভারতীয়দের দ্বারা তৈরি হওয়া ব্রিটিশ বিরোধী ক্ষোভের আগুন ও হিংসাত্মক আন্দোলনকে সীমিত ও স্তিমিত করে দেওয়া! যেটাতে নতুন মাত্রা যোগ করেন গান্ধীজী অহিংস আন্দোলনের নামে। অভিযোগ আর প্রমাণ আছে যে, যখন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে উঠতো তখন গান্ধীজীর অহিংস আন্দোলন জোরদার হতো।

১৯৩৯ সালে কংগ্রেস অধ্যক্ষ পদের নির্বাচন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু এবং মহাত্মা গান্ধীর মনোনীত প্রার্থী ডঃ পট্টভী সীতারামাইয়া-এর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় তখন মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন ডঃ পট্টভী সীতারামাইয়া নির্বাচনে পরাজিত হলে তিনি রাজনীতি থেকে সন্ন্যাস (অবসর) নেবেন। বলা বাহুল্য নেতাজী বিপুল ভোটে নির্বাচনে জয়ী হন কিন্তু পরে পদত্যাগে বাধ্য হন বলে অভিযোগ আছে।

ইংরেজ অর্থনীতিবিদ এংগাস মেডিসন অনুসারে, ১৭০০ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ভারতের ভাগ ছিল ২৪.৪% এতে বাঙলার অংশ ছিল প্রায় অর্ধেকের বেশি। সে কারণেই অবিভক্ত ভারত উপনিবেশবাদী বেণিয়াদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। ব্রিটিশ উপনিবেশের প্রায় ২০০ বছরে ব্রিটিশরা এই বাংলা, পাকিস্তান তথা অবিভক্ত ভারতে অনেক দালাল তৈরি করে রাখে। তাঁদের মাধ্যমে তাঁরা এখন অর্থনৈতিক ফায়দা নিয়ে থাকে। বাংলাদেশ, পাকিস্তানের বড় বড় দুর্নীতিবাজদের শেষ আশ্রয় এখনো ব্রিটেন। মানবতা বিরোধী অপরাধীদের অভয়ারণ্য এখনো সেই বিলেত। ব্রিটিশরা মুখে মুখে সুশাসনের কথা বললেও বাস্তবে তাঁরা যাদের কাছে আর্থিক সুবিধা পাবে তাঁদের দিকেই নিজেদের অবস্থান নেয়। তাঁদের মাটিতে বসেই ড. কামাল, তারেক জিয়া গংদের সাথে রাখে নিবিড় যোগাযোগ। তাঁরা এখনো যোগাযোগ রাখে ৩য় বিশ্বের কামান্ধ, মদ্যপ জুয়াড়ি রাজনীতিকদের সাথে। এখনো বাংলায় তাঁরা গান্ধীজী বা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দের খুঁজে ফেরে। তাঁদের মাটিতে বসেই চলে ষড়যন্ত্রের জাল বোনা, মিথ্যা অপপ্রচার। তথ্য সন্ত্রাসের মাধ্যমে তাঁরা আমাদের মত দেশে তাঁদের তাবেদার রাষ্ট্রও ও সরকার প্রতিষ্ঠায় সক্রিয়। তারা খুনি, রাজাকারদের আওলাদদের সহায়তায় এখনো বাংলাদেশকে অস্থির করে আর্থিক ফায়দা নিতে চায়। তাঁরা চায় ১৯৪৭ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে, টাকায় তার আলামত আস্তে আস্তে স্পষ্ট হচ্ছে।