ঢাকা, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ধেয়ে আসছে ধর্ষকেরা

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ০৬ জানুয়ারি ২০২০ সোমবার, ০৭:০০ পিএম
ধেয়ে আসছে ধর্ষকেরা

আমাদের সমাজে নৈতিকতা আর বিকৃত রুচির ভোগ বিলাসী মানসিকতা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে আমরা সবাই অনিরাপদ হয়ে পড়েছি। আমার আপনার মেয়ে বাসা থেকে বের হয়ে নিরাপদে ঘরে ফিরে আসবে সেই গ্যারান্টি এখন আর নেই। গত কাল রোববার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আবাসিক ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হন। এই ঘটনায় ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা হয়েছে। ধর্ষণের ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ফুঁসে উঠেছে।

নৈতিকতা বা Ethics শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ ethor (character) ও ল্যাটিন শব্দ Mors (custom) থেকে। নৈতিকতা বা Ethics দর্শন শাস্ত্রের একটি শাখা তাই বিশ্বের দার্শনিকগন নানাভাবে নৈতিকতার সংজ্ঞা দিয়েছেন। সংজ্ঞার সংকলনে না গিয়ে আমরা বলতে পারি যে, ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ, সংস্কার, ধর্মীয় বিশ্বাস, ভাল-মন্দ, ভুল-সঠিক, দেশের প্রচলিত আইন, ইত্যাদি মেনে চলার নাম নৈতিকতা।

হতাশা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা-হীনতা, ভোগবিলাসী মানসিকতা, ভোগ বিলাসী পারিবারিক সংস্কৃতি, অনৈতিকভাবে পারিবার প্রধানের অর্থ-বিত্তের মালিক হওয়া, দুর্নীতি আর অন্যায় করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আনুকূল্যে মাফ পেয়ে যাওয়া ইত্যাদি নানা কারণে আমাদের সমাজে অনৈতিক কাজ দিন দিন বেড়েই চলেছে।

এক শ্রেণীর লোক নিজে ও তাঁর পরিবারকে বাঁচানোর জন্য, আর অন্য শ্রেণী ভোগ বিলাসের জন্য, নাম কামানোর জন্য দুর্নীতি বা অনৈতিক কাজ করছেন। আবার কেউ কেউ বাঁচার জন্য দুর্নীতি শুরু ক’রে পরে ভোগ বিলাসী হয়ে যাচ্ছেন। যাঁদের একজনকে দেখে পর্যায়ক্রমে হাজার হাজার ভাল মানুষ দুর্নীতি করতে উৎসাহিত হচ্ছেন। সরকারের এক শ্রেণীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীগন বড় বড় দুর্নীতিতে জড়িত বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত রিপোর্টেও দেখা গেছে। ২০০৭-৮ সালে পত্রিকায় প্রকাশিত দুর্নীতিবাজদের স্বীকারোক্তি থেকে আমরা যে তথ্য পেয়েছি আর গত বছর ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির পরে যে তথ্য পাওয়া গেছে তা পিলে চমকানোর মত।

সৎ ও নৈতিক জীবন যাপনের জন্য পারিবারিক শিক্ষা ও ব্যক্তিগত সদিচ্ছাই যে যথেষ্ট তা আজ আমরা সবাই ভুলতে বসেছি। আজকাল আমাদের সমাজের অপেক্ষাকৃত মুরুব্বীরা আক্ষেপ করে বলেন যে, ব্যক্তি ও সমাজ জীবন থেকে নৈতিকতা মুছে যাচ্ছে। আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষ এখন মূল্যবোধ, সংস্কার, দেশের প্রচলিত আইন, ইত্যাদি মেনে চলার পরিবর্তে বেঁচে থাকার জন্য যেনতেন উপায়ে টাকা আয় করছেন, বিভিন্ন ধরণের সুযোগ সুবিধা নিচ্ছেন। সেটা নৈতিক না অনৈতিক তার বিচার এখানে মুখ্য নয়। বরং কাজে নৈতিকতা প্রয়োগকারী বা উচ্চ-নৈতিকতার অধিকারীকে আমাদের সমাজে বলা হচ্ছে পাগল বা মূর্খ।

আয়ের সাথে সংগতিবিহীন ব্যয় নির্বাহের জন্য আমাদের সমাজের অধিকাংশ লোক অনেক সময় অবৈধ আর্থিক লেনদেন, টেলিফোনে মিথ্যা কথা, অন্যকে ফাঁকি দেয়া, ইত্যাদি পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যদের সামানেই করে থাকেন। রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত রেষারেষির কারণে বা নানা প্রয়োজনে ও অপ্রয়োজনে আমরা মিথ্যাচার করে চলছি। বই পুস্তকে বা জ্ঞানী লোকেরা পত্র পত্রিকায় ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায় সৎ জীবন যাপনের পরামর্শ দিলেও বাস্তবে সৎ লোককে আমাদের সমাজে অহরহ বোকা বা কোন কোন সময় নির্বোধ আখ্যা দেয়া হচ্ছে। এভাবে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক মূল্যবোধ নষ্ট হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে পরিবারের প্রতিটি সদস্যদের উপর।

ব্যক্তি নিয়ে সমাজ গঠিত হয়। সেকারণে ব্যক্তি বা পারিবারিক জীবনে নৈতিকতা না থাকলে সমাজ জীবনে নৈতিকতা আশা করা যায় না। আইন অমান্য করে টিকে থাকাই আমাদের বর্তমান সমাজে ক্ষমতার লক্ষণ। ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবিচার, অন্যায়, মানুষকে ফাঁকি ও ভয় দেখিয়ে তথাকথিত সমাজপতিরা, অবৈধ অস্ত্রধারীরা রাতারাতি প্রচুর টাকার মালিক বনে যাচ্ছেন। অর্থের বিনিময়ে, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও অপশক্তিকে তারা নিয়ন্ত্রণ করে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছেন। সামাজিক কল্যাণমুখী সংগঠনগুলো ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

১৮১৮ সালে কোলকাতা স্কুল বুক সোসাইটি ১৮টি গল্প নিয়ে নৈতিকতা নামে একটি গল্প সংকলন প্রকাশ করে। এটাকে বাংলা ভাষায় নৈতিকতার উপর প্রকাশিত প্রথম বই হিসাবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। স্কুলে শিশুদের পাঠ্য হিসেবে পড়ানোর জন্য বইটি প্রকাশ করা হলেও বইটি শিশুদের জন্য সুখপাঠ্য ছিল না। তবুও বইয়ের মূল কথা বড়দের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের মাঝে ক্রমান্বয়ে প্রচারিত ও প্রসারিত হতে থাকে। যার ফল প্রাচীন কালের শিক্ষিত-স্বশিক্ষিত সকলের জীবনাচরণে কমবেশি তা প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। পরবর্তীতে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ার ছন্দে নীতিকথা প্রচারিত হতে দেখা যায়। যেমন ’সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি/ সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি/ আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে/ আমি যেন সেই কাজ করি ভাল মনে. . . . . ’ ইত্যাদি।

স্বাধীনতা উত্তর বাংলায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষাস্তরের পাঠ্য বইতে ছড়া, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ইত্যাদির মাধ্যমে নানাভাবে কিছুটা নীতিকথা শিক্ষার একাটা প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ইদানীং কালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নীতি শিক্ষার তেমন কোন কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না।

সরকারের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে যেটুকু অবকাঠামোগত সুবিধা এবং যে কারিকুলাম আছে সেই তুলনায় উপযুক্ত শিক্ষা উপকরণের নিয়মিত সরবরাহ ও স্কুলে শিক্ষক উপস্থিতির হার হতাশা ব্যঞ্জক।

মাধ্যমিক স্তরের চিত্রটা একটু ভিন্ন, বিশেষ করে শহর ও বর্ধিঞু গ্রামে। সেখানে স্কুলে শিক্ষকের উপস্থিতি থাকলেও মূলত: আর্থিক অচ্ছলতার কারণে শিক্ষকদের প্রধান আয়ের উৎস প্রাইভেট টিউশনি ও নোট বিক্রি করা। টিউশনি চলাকালীন সময়ে মাত্রা অতিরিক্ত উদারভাবে খাতা দেখে অভিভাবককে বুঝানো হয় যে, ছাত্র পড়াশুনা ভাল করছে।

উচ্চশিক্ষায়, বিশেষ করে এক শ্রেণীর প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট বিক্রির অভিযোগ খুব জোরদার। কারো কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে যে, তাঁরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শাখা খুলে বসেছেন, সাবজেক্টেরও অনুমোদন নেই তবু শুধুমাত্র টাকার লোভে সেসব সাবজেক্টে ছাত্র ভর্তি চলছে। মফস্বল শহরের ছোট্ট একটি ভবনে একাধিক প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড দেখা যায়।

পত্রিকায় প্রকাশিত এক জরিপ প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগন বছরের ছয় মাস ও তাঁদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস নেন না। নানা ধরণের উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করেন অথবা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ড-কালীন শিক্ষকতা করেন।

অবৈধ টাকার প্রভাব, পেশাগত নৈতিকতার অভাব, আইনের ফাঁকফোকর, দেশে বিদ্যমান আইন প্রয়োগে অনৈতিকতার আশ্রয় নিয়ে টাকা বা বিশেষ সুবিধা নিয়ে অপরাধীকে ছেড়ে দেওয়া, মিডিয়ার ও বড় বড় উকিলের মোটা টাকার বিনিময়ে দুর্নীতিবাজদের পক্ষাবলম্বন, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আনুকূল্যে দুর্নীতিবাজদের ছেড়ে দেওয়া, ইত্যাদি নানা কারণে আমাদের সমাজে ধর্ষণের মত চরম অনৈতিক কাজ বেড়ে চলেছে, যার ইতি টানা দরকার। তা না হলে আমাদের লালন করা দুর্বৃত্তরা একদিন আমাদের ঘরে হানা দেবে। এমনিতেই গত বছরের তুলনায় এবছর ধর্ষণের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে এক (১) হাজার ৪১৩জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷ ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিলো ৭৩২জন৷ অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে দ্বিগুণ যা ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি৷ তাই অনুমান করা যায় যে, ধেয়ে আসা ধর্ষকদের হাতে আমার আপনার প্রাণের প্রিয় সন্তান হবে ধর্ষণ বা বলাৎকারের শিকার তা আর বেশি দূরে নয়।

বাংলা ইনসাইডার/এমআরএইচ