ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৮ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

অদূরদর্শী নেতৃত্ব ও বিশ্ববাসীর অস্বস্তি

জাকির হোসেন
প্রকাশিত: ০৯ জানুয়ারি ২০২০ বৃহস্পতিবার, ০৮:০০ এএম
অদূরদর্শী নেতৃত্ব ও বিশ্ববাসীর অস্বস্তি

যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অপরাধমূলক নির্লজ্জ মাস্তানি কূটনীতির স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। নতুন বছরের শুরুতেই ৩ জানুয়ারী ইরাকের রাজধানী  বাগদাদের বিমান ঘাঁটিতে হত্যা করা হয়েছে ইরান থেকে বিশেষ বিমানে উড়ে আসা মেজর জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে। তিনি ইরানের রেভ্যুলেশনারি গার্ডের শাখা  আল কুদস্ ফোর্সের প্রধান এবং সামরিক বিষয়ে ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত ছিলেন।  প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে ইরাকের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে ড্রোন হামলা চালিয়ে কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করা হয়। একটি দেশের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব‌্যক্তি অপর দেশে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া মাত্রই কোনো তৃতীয় দেশ তাদের সামরিক উপস্থিতির সুযোগ নিয়ে ওই ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে হত্যা করার মত ভয়াবহ ও নিকৃষ্ট উদাহরণ সম্ভবত পৃথিবীতে আর নেই। এই ঘটনায় নিঃসন্দেহে ইরাকের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হয়েছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈরী সম্পর্ক দীর্ঘ দিনের। উভয় দেশ কখনো কখনো প্রায় যুদ্ধাবস্থায় পৌঁছে গেলেও যুদ্ধ বাঁধেনি। জেনেভা চুক্তি অনুযায়ী যুদ্ধ চলাবস্থায়ও কিছু কর্মকাণ্ড যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় যা আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারযোগ্য গুরুতর অপরাধ। যুদ্ধাবস্থায় শত্রু পক্ষের কোনো সৈনিক ধৃত হলে তাকে যুদ্ধ বন্দী হিসেবে তার প্রতি মানবিক আচরণ করতে হবে। তার প্রতি অমানবিক আচরণ বা তাকে হত্যা করা গুরুতর যুদ্ধাপরাধ। ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে ইরাকে সরকারি সফরকালে তাঁকে হত্যার আদেশ দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প যা তিনি দম্ভ করে স্বীকার করেছেন। এই দুষ্কর্মের জন্য ট্রাম্প বিনা প্রশ্নে বিনা বিচারে পার পেতে পারেন না।

এবছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ডোনাল্ড ট্রাম্প পরবর্তী মেয়াদের জন্য প্রার্থী হতে আগ্ৰহী। কিন্তু তাঁর চলতি মেয়াদের পুরো সময়ব্যাপী তিনি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বহু বিষয়ে সমালোচিত ও বিতর্কিত। তদুপরি একাধিক অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে পার্লামেন্টের নিম্ন কক্ষ কংগ্রেসে অভিসংশনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। কিন্তু উচ্চ কক্ষ অর্থাৎ সিনেটে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তিনি বেঁচে যাবেন। তথাপি অভিসংশিত  প্রেসিডেন্টের তালিকায় তার নাম লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে। এখন ইমেজ সংকট থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন ইরান- আমেরিকা সংকটকে। অকস্মাৎ গত ২৯ ডিসেম্বর/১৯ ইরাকের মার্কিন ঘাটি থেকে বিমান হামলায় হিজবুল্লাহ ব্রিগেডের ২৫ জন যোদ্ধা নিহত হন। উত্তপ্ত হয়ে উঠে ইরাক। ৩১ ডিসেম্বর ইরাকের স্থানীয় যোদ্ধা, ইরানপন্থী ইরাকী জনগন ও ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ ব্রিগেডের সদস্যরা উক্ত ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ প্রদর্শনের এক পর্যায়ে বাগদাদের মার্কিন দূতাবাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই ঘটনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দায়ী করে এবং এর জন্য চড়া মূল্য দিতে হবে বলে হুমকি দেয়। এবং এর পর  ৩ জানুয়ারীর দুষ্কর্মটি ঘটায় মার্কিন বাহিনী। উল্লেখ্য, ইরাকের ইরানপন্থী হিজবুল্লাহ ব্রিগেডের পরোক্ষ নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। এছাড়া সিরিয়ায় তাঁর নেতৃত্বে হিজবুল্লাহ ব্রিগেডের হাতে মার্কিন বাহিনীসহ পশ্চিমা যৌথবাহিনী যথেষ্ট নাকানিচুবানি খেয়ে সিরিয়া ছেড়েছে।

বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মার্কিন ড্রোন হামলায় কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার ঘটনায় ইরাকের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হয়েছে বলে ইরাক জাতিসংঘে অভিযোগ দায়ের করেছে। ইতোমধ্যে ইরাকি পার্লামেন্ট একটি বিল অনুমোদন করেছে যাতে বলা হয়েছে মার্কিন ঘাঁটি প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য। এর প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর অবরোধ আরোপের হুমকি দিয়েছে।

ইরানের জনগণ, সামরিক বাহিনী ও সরকার যথোপযুক্ত প্রতিশোধ গ্রহণের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। ইতোমধ্যে ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালে একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেয় এবং পূর্ববৎ ইরানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলতঃ চুক্তি টি মূলতঃ তখনই অকার্যকর হয়ে যায়। 

২০০৩ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাক আক্রমণ করেছিলেন এক ভূয়া অভিযোগের ভিত্তিতে। বলা হয়েছিল ইরাকের হাতে গনবিধ্বংসী অস্ত্র (WMD= Weapons of Mass Destruction) রয়েছে। যুদ্ধ শেষে তার কোনো আলামতই পাওয়া যায়নি। অবশ্য বুশ জাতিসংঘের একটি রেজুলেশন (১৪৪১) বোগলদাবা করে ইরাক আক্রমণের বৈধতা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প সাহেবের হাতে কোনো তুরুপের কার্ড নেই। তিনি একা এবং একতরফা আর বেশি দূর অগ্রসর হতে পারবেন বলে মনে হয় না। যদিও তিনি হুমকি দিয়ে রেখেছেন যে ইরান কোনো প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিলে তিনি ইরানের ৫২টি নিশানায় আঘাত হানবেন। কী নির্বোধসুলভ উক্তি! শাহ রেজা পাহলভীর পতনের পর ১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর থেকে ১৯৮১ সালের ২০ জানুয়ারী পর্যন্ত ৪৪৪ দিন ইরানের মার্কিন দূতাবাসের কুটনীতিক ও সিভিল নাগরিকসহ মোট ৫২ ব্যক্তিকে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল। ৪০ বছর পার হয়ে গেল কিছু করতে পারলেন না। এখন আপনি যখন ৫২ নিশানা ঠিক করেছেন তো আপনার শত্রুরা এই ৪০ বছর পরে ৫২ জনের স্থলে ১০৪ জন বা তারো বেশি এবং গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে জিম্মি করা বা আরো ভয়ঙ্কর কিছু করার ক্ষমতা অর্জন করে থাকতে পারে তা ভেবে দেখেছেন কি?

যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে এমন অদূরদর্শী নেতারা ক্ষমতার মসনদে আরোহন করেন- ভাবতে অবাক লাগে! এদের অদূরদর্শিতা ও অবিমৃশ্যকারিতার কারণে বিশ্ববাসীকে আতঙ্কে উৎকণ্ঠায় থাকতে হয়।

জাকির হোসেন
অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেল সুপার