ঢাকা, সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ, নুরু ও মান্না

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারি ২০২০ রবিবার, ০৬:০০ পিএম
ঢাবি ছাত্রী ধর্ষণ, নুরু ও মান্না

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে গ্রেফতার মজনুকে নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দিতে, পুলিশ বাহিনী তথা সরকারকে বিব্রত করতে ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুরু আর ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে কি নতুন অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন! এমন প্রশ্ন এখন সামনে চলে এসেছে।

রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতাল এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার মজনু একজন সিরিয়াল রেপিস্ট। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মজনু নিজেই র‌্যাবের কাছে একথা স্বীকার করেছে। কারওয়ানবাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানায় র‌্যাব।

র‌্যাবের মুখপাত্র সারওয়ার বিন কাশেম জানান, কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের আগেও মজনু বেশ কয়েকজনকে ধর্ষণ করেছে। তিনি বলেন, মজনু একজন সিরিয়াল রেপিস্ট। এর আগেও তিনি এই কাজ করেছেন। রাস্তায় প্রতিবন্ধী নারী, ভিক্ষুকদের ধর্ষণ করত মজনু।

র‍্যাবের এই মুখপাত্র বলেন, ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় মজনু আগে থেকেই ওঁৎ পেতে ছিল ঘটনাস্থলে। মেয়েটিকে জোরপূর্বক সেখান থেকে ধরে নিয়ে যায় সে। এরপর ঝোপের এক পাশে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। এর আগেও একই জায়গায় কয়েকজন নারীকে ধর্ষণ করে সে।

তিনি বলেন, ছবি দেখিয়ে ভিকটিমের কাছ থেকে আসামিকে শনাক্ত করা হয়েছে। ভিকটিম বলেছে, সব চেহারা ভুলে গেলেও এই চেহারা তিনি কোনোদিন ভুলবেন না।

ভিকটিমের কাছ থেকে পাওয়া ভিডিও ফুটেজ দেখে তদন্ত সংস্থার কর্মীরা সন্দেহ করে তারা মজনুকে প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করে। ভিকটিমের মোবাইল সেটের অবস্থান সনাক্ত করে তারা অপরাধীর কাছে পৌঁছান। এর পরে তদন্ত সংস্থার কর্মীরা অপরাধীর ছবি ভিকটিমকে দেখিয়ে সনাক্ত করে নিয়ে তার পরেই তাকে ধর্ষণ মামলায় আটক দেখান।

সিরিয়াল কিলার ও ধর্ষক রসু খা’র কথা অনেকের মনে আছে। সীম কার্ড ও টেলিফোন সেটের অবস্থান ট্র্যাকিং করেই রসু খা’কে গ্রেফতার করা হয়েছিলো। রসু খাঁ হল বাংলাদেশের প্রথম ধারাবাহিক খুনি[ নারীদের হত্যা করার পূর্বে ধর্ষণ করত। সে ১১ জন নারীকে হত্যা করেছে বলে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিল। রসু খাঁয়ের হত্যার শিকার নারীরা ছিলেন ১৭ থেকে ৩৫ বছর বয়সের পোশাক কর্মী। রসু মিয়ার আসল নাম রশিদ খাঁ। তার বাবা আবুল হোসেন ওরফে মনু খাঁ ছিলেন একজন খেতমজুর। রসু খাঁর বাড়ি চাঁদপুর সদর উপজেলার চান্দ্রা ইউনিয়নের মদনা গ্রামে। ২০১৫ সালে তার ফাঁসি আদেশ দেন মহামান্য আদালত। সেই রাশি খাঁ কি খুব শিক্ষিত সুদর্শন ছিল বা রাজনৈতিক কর্মী ছিল!

প্রথম আলো আর ডেইলি স্টারের মালিক ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান শিল্পপতি লতিফুর রহমানের মেয়ে ও স্কলাস্টিকা স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রী শাজনীন ধর্ষণ ও হত্যা করে লতিফুর রহমানের গৃহপরিচারক শহিদুল। ১৯৯৮ সালের ২৩ এপ্রিল রাতে গুলশানে লতিফুর রহমানের বাড়িতে খুন হয় শাজনীন।

ভাগ্যিস তখন নুরু ডাকসুর ভিপি ছিলেন না। থাকলে হয়তো বলত স্কলাস্টিকা স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রী শাজনীনকে কেন শহিদুল ধর্ষণ করলো! কেন কোন সুদর্শন কোন পুরুষ বা রাজনৈতিক কোন কর্মী তাঁকে ধর্ষণ আর হত্যা করলো না।

নুরু এবং ডাকসুর সাবেক ভিপি মান্না সাহেব ধর্ষক মজনুর শারীরিক শক্তি নিয়ে প্রশ্ন তলার ইঙ্গিত দিয়েছেন। মানুষের মাঝে সন্দেহের বীজ বপনের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমরা সবাই জানি যে, মাদক নিলে ‘অমানুষদের’ মানসিক ও শারীরিক শক্তি ভিন্ন মাত্রায় বেড়ে যায়। আমরা দেখেছি যে, ক্যাপ্টাগন ও অ্যাম্ফিটামিন নামের বড়ি উচ্চ ক্ষমতার নেশায় আসক্ত হয়েই আইএস জঙ্গিরা বিবেক বিবেচনা বর্জিত নানা নৃশংসতায় মেতে উঠছে। হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে সারা দুনিয়া জুড়ে। এত শক্তি আর সাহসের মূলে ছিল ক্যাপ্টাগন ও অ্যাম্ফিটামিন নামের ওষুধের বড়ি, তা কি নুরু আর মান্না সাহেবরা ভুলে গেছেন না ভুলে থাকার ভান করছেন!

অনেকে মন্তব্য করেছেন যে, ডাকসুতে ঘটানো বিভিন্ন অপকর্মে তার বিরুদ্ধে হওয়া মামলা, টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন ঠিকাদারের কাজ পাইয়ে দেবার তদ্বির, তথাকথিত আন্টির কাছে টাকা নিয়ে গাড়ি কেনার কথা ছাড়াও টাকা আয়ের নানা ধান্দা, এক লাখ টাকার উপরের ভাড়ায় নিজের জন্য ফ্ল্যাট বাসা ভাড়া নেওয়ার কথা আর তারেক জিয়ার সাথে তার আলাপের স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়েছে। ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল নামে চারটি আইডির গ্রুপ চ্যাটের কিছু স্ক্রিনশট পায়া গেছে। হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট গ্রুপটির নাম `টিম ফোর`। এগুলোর মত নানা কেলেঙ্কারির ঘটনা থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে প্রবাহিত করার জন্য কি ভিপি নুরু এগুলো করছেন

জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের নেতা ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্নার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছিল। বিশ্বজুড়ে চলা `হ্যাশট্যাগ মিটু’তে মান্নার যৌন হয়রানির ঘটনাগুলো তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছেন দেশি কিছু প্রাক্তন জাসদ-বাসদ কর্মী। একজন প্রাক্তন নারী জাসদ কর্মী বলেছেন, ‘মান্না ভাই এত লম্বা লম্বা নীতি বাক্য দিচ্ছেন। তিনি কি এটা একবার আয়নায় দেখেছেন। এই মিষ্টি কথার আড়ালে যে লুকিয়ে আছে একজন হিংস্র দানব, তা কি নতুন প্রজন্ম জানে?’

ঐ নারী কর্মীর বক্তব্যের সূত্র ধরে এক অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। জাসদ থেকে বেরিয়ে আ. ফ. ম মাহাবুবুল হকের নেতৃত্বে গঠিত হয় বাসদ। মাহমুদুর রহমান মান্না, আখতারুজ্জামান, জিয়া উদ্দিন আহমেদ বাবলু, আলী রিয়াজের মতো তুখোড় ছাত্রনেতারা জাসদ ছেড়ে বাসদে চলে যান। বলা হয়েছিল, ‘ জাসদ সমাজতান্ত্রিক শ্রেণি চরিত্র হারিয়েছে।’

জানা গেছে, বাসদ কোনো আদর্শিক কারণে নয়, স্রেফ মান্নার পরকীয়া এবং লাম্পট্যের কারণে ভেঙেছে। বাসদের আহ্বায়ক প্রয়াত আ.ফ.ম মাহাবুবুল হকের স্ত্রী কামরুন্নাহার বেবীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন মান্না। এই সম্পর্কে হাতেনাতে ধরাও পড়েন তিনি। এ সময় নীতি নৈতিকতার প্রশ্নটি সামনে আসে। দলের দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টার নীতি নির্ধারণী সভায় বেরিয়ে আসে মান্নার বিরুদ্ধে একাধিক যৌন নিপীড়নের অভিযোগ , তাঁর লাম্পট্য। এ সময় মান্নার ‘অরাজনৈতিক সুলভ’ আচরণের জন্য বাসদ ভেঙে বেরিয়ে যান কমরেড খালেকুজ্জামান। ঐ ১৮ ঘণ্টার বৈঠকের বিবরণীতে পাওয়া যায়, মান্নার বিরুদ্ধে ৮ জন নারী ‘অশোভন’ এবং ‘অশ্লীল’ আচরণের অভিযোগে বাসদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।

পুলিশ বাহিনীর ইমেজ সংকটকে পুঁজি করে, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সমর্থক আইনজীবীদের নানা কারসাজীতে আদালতে মামলার দীর্ঘসূত্রিতায় সৃষ্ট জনমনের ক্ষোভকে আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কাজে লাগাতে সরকারকে চাপে ফেলে কিছু ‘মালপানি’ আমদানির জন্য নুরু, মান্নারা এগুলো করছেন কি না তা বুঝা যাচ্ছে না।