ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৮ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

করোনা ভাইরাস, চীন ও রাজা কৃষ্ণচন্দ্র

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ২৯ জানুয়ারি ২০২০ বুধবার, ০৯:০০ এএম
করোনা ভাইরাস, চীন ও রাজা কৃষ্ণচন্দ্র

দুইটি খবর অনেকের চোখে পড়তে পারে। এর একটি হচ্ছে- মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন টাইমস ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর একজন সাবেক কর্মকর্তা ড্যানি শোহাম বরাত দিয়ে বলেছে যে, জৈব রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির গোপন কর্মসূচি চলা একটি ইন্সটিটিউট থেকে প্রাণীবাহী করোনা ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে।

চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান থেকে নতুন করোনা ভাইরাসটি ইতোমধ্যেই সে দেশের রাজধানী বেইজিংসহ ২৯টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, নেপাল, ফ্রান্স, সৌদি আরব, কানাডাসহ অন্তত ১২টি দেশে এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মিলেছে।

অন্যটি হচ্ছে, তারা করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কারে সফল হয়েছে বলে চীন দাবি করেছে। চীনের দাবি , ভাইরাসটির নির্মূলে যে নতুন ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেছেন তাতে তারা সফল হয়েছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন শিনহুয়া নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে বিজ্ঞানীদের এ দাবি প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদমাধ্যমটিতে বলা হয়েছে, দুটি হাসপাতালের সাতজন মেডিকেল স্টাফের ওপর এ নতুন ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এসব রোগীর দেহে সংক্রামিত ভাইরাসের লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। তারা বর্তমানে সুস্থ আছেন।

ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরে অর্থনৈতিক শোষণের লক্ষ্যে সেই প্রাচীন কাল থেকেই গোষ্ঠী গোষ্ঠী, জাতি জাতি বা দেশের সাথে দেশের যুদ্ধ চলে আসছে। আর শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হিসেবে সে বেছে নেয় শক্তি আর ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে। ক্ষমতা প্রয়োগে যুগে যুগে নানান কৌশল আর অস্ত্র ব্যবহার করেছে যুদ্ধবাজ মানুষেরা। এরই সূত্র ধরে বা ধারাবাহিকতায় এসেছে বায়োলজিক্যাল উইপন বা জীবাণু অস্ত্র। শুরুতে তারা এটাকে এই নামে না ডাকলেও পরে এই অস্ত্রের নামকরণ এভাবে হয়েছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় যে, প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে মধ্য প্রাচ্যের একদল যোদ্ধার হাত ধরেই এই জীবাণু অস্ত্র প্রথম পরিচিতি পায়। সে সময় হিত্তিত নামে পরিচিত এই জাতির যোদ্ধারা তাদের শত্রু শহরের কাছে পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী ছয়টি ভেড়া ছেড়ে দিয়ে আসতো। স্থানীয় অধিবাসীরা যখন এগুলোকে কোনো ধরনের সন্দেহ না করেই তাদের শহরে নিয়ে অন্য গবাদিপশুর মতো করে পালতে শুরু করতো তখনই ভেড়ার গায়ে আগে থেকে প্রবেশ করানো র্যাবিট ফিভার এর জীবাণু শহরের অধিবাসীদের মধ্যে সংক্রমিত হতো। আর এই রোগের কারণে অল্প কিছুদিনের মাঝেই মারা যেত শহরের অর্ধেকেরও বেশি অধিবাসী যা হিত্তিতদের জন্য শহরের দখল নেওয়াটাও সহজ করে দিত।

হিত্তিতদের পর বহু শতাব্দীর ইতিহাসে জীবাণু অস্ত্র ব্যবহারের কোনো সরাসরি প্রমাণ না পাওয়া গেলেও জীবাণু-যুদ্ধের প্রথম ব্যবহার লক্ষ করা যায় ১৩৪৬ সালে। তৎকালীন তাতার বাহিনী প্লেগ রোগে মৃত সৈন্যদের কাফা শহরের মধ্যে ফেলে দিয়ে সব প্রবেশপথ বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়েছিল। ১৭৬৭ সালে সংঘটিত ফরাসি ও ভারতীয়দের মধ্যকার যুদ্ধে ফরাসি সৈন্যরা গুটিবসন্তের জীবাণুতে ভরা কম্বল তৎকালীন স্থানীয়দের মাঝে বিতরণ করেছিল। যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ জনগণের মাঝে গুটি বসন্ত ছড়িয়ে দেয়া। ১৯০০ সালে এসে যখন মাইক্রোবায়োলজি বা অণুজীব-ভিত্তিক সংক্রামক রোগের উদ্ভব হলো, তখন থেকেই আধুনিক জীবাণু অস্ত্রের ধারণার শুরু। ১৯২৫ সালের জেনেভা প্রটোকলে জীবাণু অস্ত্র গবেষণা ও ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও উন্নত দেশগুলোতে এর ব্যবহার থেমে থাকেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চীনের ওপর জাপানের জীবাণু অস্ত্র ব্যবহার করে। সে সময় ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে স্কটল্যান্ডের গ্রুইনার্ড দ্বীপে ভয়ংকর অ্যানথ্রাক্স জীবাণুকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের পরীক্ষা চালানো হয়। এই জীবাণু সংক্রমণের পরীক্ষাটি এতোটাই ভয়াবহ ছিল যে পরবর্তী ৪৮ বছর ধরে দ্বীপটিকে কোয়ারেন্টাইন করে রাখতে হয়। একই রকম ভাবে ১৯৩০ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিচালিত এক পরীক্ষার কারণে এরাল সাগরের একটি দ্বীপ চিরতরে মানুষ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে যেখানে র্যাবিট ফিভার, প্লেগ, টাইফাস এবং ভেনিজুয়েলান ইকুইন এনসেফালাইটিস এর মতো একাধিক জীবাণু ছড়ানো হয়েছিল। এ ছাড়া ১৯৭১ সালে রাশিয়ায় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য তৈরি গুটিবসন্তের জীবাণু দূর্ঘটনাক্রমে ছড়িয়ে পড়লে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর পরীক্ষাগারে এ ধরনের জীবাণু মজুদ থাকার বিষয়টি আলোচনায় আসে। জানা যায় যে, ১৯৬০ সালে ব্রিটেন, ১৯৬৯ সালের ২৫ নভেম্বর এক বিবৃতিতে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এর ঘোষণার পরে অবশেষে ১৯৯২ সালে রাশিয়া জীবাণু অস্ত্রের গবেষণা ও ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞার দাবি মেনে নেয়।

প্রাণঘাতী রোগের প্রতিরোধ আর চিকিৎসার পদ্ধতি ও ওষুধ দুটোই আবিষ্কার হয়ে যায় কিছুদিনের মধ্যেই। তাই যারা জীবাণু যুদ্ধের পরিকল্পনা করেন তারা পরিচিত জীবাণুকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে জীবাণুগুলোকে জেনেটিক্যালি বদলে ফেলে তাদের আরো ভয়ঙ্কর রূপ দেয়। ফলে বিদ্যমান ওষুধে আর কোন কাজ হয় না। তাই যারা আইনত নিষিদ্ধ এই জীবাণু যুদ্ধের পরিকল্পনায় প্রাণঘাতী জীবাণুগুলোকে জেনেটিক্যালি বদলে ফেলার গবেষণা করে তারা একই সাথে তার প্রতিরোধের ব্যবস্থাও করে রাখে।

২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে রুশ সীমান্তে যুক্তরাষ্ট্রের জীবাণু অস্ত্রের পরীক্ষায় ৭৩ জন নিহত হয় বলে দাবি করে রাশিয়া। রাশিয়া দাবি, পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র জর্জিয়াতে জীবাণু অস্ত্রের পরীক্ষাগারে নিহতের এ ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এ দাবি করে। এর পরে এ নিয়ে আর কোন খবর পাওয়া যায়নি। রাশিয়ার দাবি তাঁদের হুশিয়ারির পরে যুক্তরাষ্ট্র এটা নিয়ন্ত্রণে এনেছিল।

বাংলার অন্যতম প্রসিদ্ধ নগরী নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র (১৭১০-৮৩) এর সভাসদগনের মধ্যে গোপাল ভাঁড়ের সাথে একজন বিজ্ঞানীও ছিলেন। কৃষ্ণচন্দ্র একবার তার বিশেষ প্রয়োজনে বিজ্ঞানীকে এমন একটা তরল কেমিক্যাল আবিষ্কার করতে বললেন যে তা দিয়ে যা ধরা যাবে তাই সোনা হয়ে যাবে। এটা শুনে গোপাল ভাঁড় বিজ্ঞানীকে বললেন সোনা তৈরির তরল ক্যামিক্যাল বানানোর পাশাপাশি কেমিক্যালের স্পর্শে যা সোনা হবে তা পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য যেন আরেকটি তরল কেমিক্যাল তৈরি করেন। তা না হলে রাজা এক সময় সোনা তৈরি করতে করতে এমন অবস্থায় চলে যাবেন যা ভয়ংকর বিপদে রূপ নেবে। বিজ্ঞানী গোপালের কথা মত তাই করে রাখলেন। এর পরে কৃষ্ণচন্দ্র বিজ্ঞানীর কাছে কেমিক্যাল পেয়ে হাতের কাছে যা পান তাই সোনায় রূপান্তরিত করতে থাকেন। এক পর্যায়ে তার খাবারও সোনায় পরিণত হয়। রাণীকে ছুঁয়ে দেবার ফলে রাণীর শরীরের একটা অংশ সোনায় পরিণত হয়ে অসাড় হয়ে গেলে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র চরম হতাশ হয়ে এর প্রতিষেধক চান বিজ্ঞানীর কাছে। পরে প্রতিষেধক দিয়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র আবার সব কিছু পূর্বের অবস্থায় এনে মুক্তি পান।

চীন কী তাহলে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দশায় পড়েছিল, আর একইভাবে তার মুক্তি হল! নাকি জীবাণু ছড়িয়ে প্রতিষেধক বিক্রি করে অঢেল টাকা কামানোর চেষ্টা তা স্পষ্ট হতে সময় লাগবে।

 

সায়েদুল আরেফিন

কলামিস্ট, উন্নয়নকর্মী