ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২০, ১৯ চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

কম ভোটে আস্থা বাড়লো না!

প্রণব সাহা
প্রকাশিত: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ শনিবার, ১০:০০ পিএম
কম ভোটে আস্থা বাড়লো না!

ভোটের ফলাফল যাই হোক শনিবারের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয়ী হয়েছে ইভিএম, আর প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে নির্বাচন। মানুষ ভোট বিমুখ হয়ে পড়েছে তারই প্রমান মিললো ভোটকেন্দ্রে কম ভোটারের উপিস্থতি। আর যখন খোদ সিইসির আঙ্গুলের ছাপে ইভিএম সচল হয় না, ড. কামাল হোসেনের হাতের ছাপের জটিলতায় তার ভোট নিয়েও প্রশ্ন ওঠে তখন বলতেই হয় যে এসব যন্ত্রের আরো বেশি উন্নয়নের সুযোগ আছে। বুথ দখল নাই, নাই আগের রাতে ভোটবাক্স ভরানোর অভিযোগ , ছিনতাই হয়নি কোনো ব্যালট পেপার, এজেন্ট বের করে দেয়ার ঘটনা ঘটলেও তা দিয়ে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে, তেমনটাও বলা যাচ্ছে না। বরং ভোটারের কম উপস্থিতিতে বিজয়ী দুই মেয়রও অস্বস্তি প্রকাশ না করে থাকতে পারেননি।

 দিন শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ কে নুরুল হুদা নিজের বলেছেন শতকরা ৩০ ভাগের বেশি ভোট পড়েনি। আর আলাদা করে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার দাবি করেছেন ভোটের হার শতকরা ২৫ ভাগের বেশি নয়। এই স্বল্পহারের ভোটের সমালোচনায় অনেকদিন ভুগতে হবে নির্বাচন কমিশনকে।

এবারের রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সকল কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট করার নির্বাচন কমিশনের উচ্চভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলো ভোট নিয়ে ভোটারদের অনাগ্রহকে প্রমানিত করে। ২১ দিনের প্রচার প্রচারনায়  যত মানুষকে আমরা মেয়র বা কাউন্সিলরদের মিছিলে, সমাবেশে দেখেছি, ভোটের দিন কিন্তু তত সংখ্যক ভোটার আমরা পাইনি। তবে ভোট কেন্দ্রের বাইরে তরুন বয়সীদের জটলা পাকানো উপস্থিতি চোখে পড়েছে। 

সকাল আটটায় ভোট শুরুর পরের দেড়ঘন্টায় নিজের ভোট দিয়ে আর সাতটি ভোট কেন্দ্রের ৯টি বুথে সর্বোচ্চ ভোট পড়তে দেখেছি মাত্র ১১টি। ৩০ বছরেরও বেশি সময় নির্বাচন পর্যবেক্ষণে এবারই প্রথম কোনো বুথে বা একটি ভোট কেন্দ্রে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কত ভোট পড়লো তা জানতে এতদিন সাংবাদিকদের প্রতিটি বুথের পোলিং অফিসার বা কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসারের দ্বারস্থ হতে হতো। কিন্তু প্রথম একটি বুথে ঢকলেই সেখানকার ইভিএমের মনিটরিংয়ে স্পষ্ট করে চোখে পড়েছে যে ঐ বুথে মোট ভোট কত, আর ঐ সময় পর্যন্ত কতটি ভোট পড়েছে। এটা ডিজিটাল ইভিএম মেশিনের সুফল। আর আঙ্গুলের ছাপ ছাড়া ভোট দেযাটা কঠিন তাই ভোট কেন্দ্র দখল করে, ব্যালটে একজনই ১০/২০/৫০টি সিল মারার সুযোগ কম ইভিএমে। কিন্তু দল বেধে প্রভাব বিস্তার করে বা প্রিসাইডিং অফিসার বা আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি সহায়তা না করে তবে ইভিএমে কোনো একক প্রার্থী পক্ষে ব্যাপকভাবে জাল ভোট দেয়া খুব কঠিন। আর বিএনপির পক্ষ থেকে ইভিএমে আগে থেকে কারচুপির যে তুমুল অভিযোগ উঠেছিল, তা অনেকাংশেই দুর্বল হয়ে গেছে ভোট কম পড়ায়।

দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে তাদের দলীয় প্রতিকের ভোটযুদ্ধে ভোটের এই স্বল্পহার পুরো নির্বাচনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। তবে নির্বাচন কমিশন বা ভোট গ্রহন প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা যে কমে গিয়েছিল , সিটি নির্বাচনের শতকরা ৩০ ভাগ ভোট (নির্বাচন কমিশনারদের দাবি) সেই আস্থা যে বাড়াবে না তা নিশ্চিত। এবার অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন হয়েছে , বিচ্ছিন্ন হাতে গোনা কয়েকটি বিশৃংখল ঘটনা ছাড়া ব্যাপক কোনো সংর্ঘষও হয়নি। উত্তর-দক্ষিণে বিএনপির দুই মেয়র প্রার্থী অভিযোগ করেছেন, তাদের পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। পাল্টা বলেছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবীর নানাক। তিনি বলেছেন এজেন্ট দেয়ার মত সাংগঠনিক সার্মথ্য বিএনপির নাই।

রাজধানীর সিটি নির্বাচনে ভোটের হার কম হওয়ার আরো কয়েকটি কারণকেও সামনে আনা যায়। এর মধ্যে আছে যানবাহনের সমস্য। ঢাকায় বেশিরভাগ মানুষ ভাড়াটিয়া, তাদের ঠিকানা বদল হয় ঘন ঘন। তাই হয়তো ভোটার তালিকায় পরিবর্তিত ঠিকানা হালনাগাদ হয়নি, ফলে যারা দুরে চলে এসেছেন তারা জনপরিবহনের অভাবে ভোট দিতে যেতে পারেননি। শুক্র শনিবার পরপর দুদিন ছুটি তাই অনেকেই ঢাকার বাইরে চলে গেছেন। আবার একথাও আছে যে দুই সিটির ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে যারা প্রার্থী হয়েছেন তাদের বেশিরভাগের যোগ্যতা নিয়ে ভোটার মধ্যে যে নেতিবাচক মনোভাব তাতে করা ভোটাররা আগ্রহী হয়নি। ভোটাররা প্রার্থীদের কান ঝালাপালা করা প্রচারেও বিরক্ত ছিলেন। তাদের অনেকেই হয়তো ধরেই নিয়েছেন ক্ষমতাসীন সরকারের উন্নয়নের সুবাদে তাদের প্রার্থীরাই জিতবে, তাই ভোট দেয়া না দেয়া সমান।