ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২০, ১৯ চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

‘বড় অপারেশন’ ছাড়া ভোটার কেন্দ্রে আসবে না

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সোমবার, ১২:৩০ পিএম
‘বড় অপারেশন’ ছাড়া ভোটার কেন্দ্রে আসবে না

ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ভোট নিয়ে এক ধরণের বিষণ্ণতা জেঁকে বসেছে নগরীর সচেতন মানুষের হৃদয়ের মাঝে। এর থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে ভোটারের কম উপস্থিতি নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনা আর মন্তব্যে তাই মিডিয়া সয়লাব। নানা জনে তার নিজের সীমিত জ্ঞান বিবেচনায় নানারূপ মন্তব্য করে অবস্থার বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করে চলেছেন। পাড়া মহল্লাতেও গতকাল এটা ছিল মূল আলোচনার বিষয়। সিটি নির্বাচনে পোল্ড ভোট শতকরা ৩০ এর নীচে বলা হয়েছে নির্বাচন কমিশন থেকে। বিভিন্ন সূত্রে কম ভোট পড়ার যে সব কারণ বলা হচ্ছে যে গুলো হচ্ছে-

ইভিএম নিয়ে খোদ একজন নির্বাচন কমিশনারের তির্যক মন্তব্য আর তারই সূত্র ধরে বিরোধীদলের নেতিবাচক প্রচারণা আর ইভিএম নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অপ্রতুল প্রচার মানুষের মধ্যে ভোট দেওয়া জটিল হতে পারে এমন ধারণার জন্ম দিয়েছে। যাতে অনেকের মাঝেই জটিলতা এড়িয়ে চলার জন্য অনীহা দেখা দিয়েছে যা তাঁদের ভোট কেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করেছে।

এবারের নির্বাচনে প্রার্থীরা বা তার কর্মীরা মিছিল মিটিং করলেও বাসায় বাসায় ভোটার স্লিপ পৌঁছে দেন নি বহু এলাকায়। এতে এই শীতের দিনে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে লাইন ধরে ভোটার স্লিপ নিয়ে ভোট দিতে যাওয়ায় অনেকেই অনীহা দেখিয়েছেন। তাই ভোট কেন্দ্রে যান নি।

ঢাকার এক এলাকার ভোটার হয়েও অনেকে নানা কারণে বাসা পরিবর্তন করে অন্য এলাকায় চলে গেছেন। যানবাহনের অভাবে টাকা খরচ করে তাই একটা ভালো অংশের মানুষ ভোট দিতে আসেন নি। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বা গণযোগাযোগের যানবাহনের সংকট ভোট কম হবার একটি অন্যতম কারণ বলে অনেকে উল্লেখ করেছেন।

স্কুল কলেজে পর পর ৩ দিনের ছুটি থাকার কারণে অনেকে ঢাকার বাইরে গেছেন, তাই তারা ভোট দিতে আসতে পারেন নি, বা আসতে চান নি। তাঁদের কাছে ভোটের চেয়ে পরিবার নিয়ে বাইরে বা গ্রামের বাড়িতে যাওয়া বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

শীতে অনেকে দেরিতে ঘুম থেকে উঠছেন। আগের দিন বড় দুই দলের কেন্দ্র দখলে রাখার শব্দ বোমা মারার আস্ফালন আর পরে টিভিতে ছোটখাটো গোলযোগের ওজুহাতে ভোট কেন্দ্রে যাওয়া থেকে বিরত থেকেছেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় জামায়াত বিএনপি ও বামপন্থীরা যত সক্রিয় সেই তুলনায় আওয়ামী লীগ বা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিরা ততটা সক্রিয় না। বিদেশ থেকে পরিচালিত বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল, ইউটিউব খুব নোংরা ভাবে আর বাংলাদেশের কিছু জনপ্রিয় মিডিয়ায় স্লো পয়জনিংয়ের মত নির্বাচন আর সরকার বিরোধী মতবাদ প্রচারের ফলে বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থায় সন্দেহ বা অবিশ্বাসের জন্ম নিয়েছে যার প্রভাব পড়েছে সদ্য সমাপ্ত সিটি নির্বাচনে।

বিএনপি’র কর্মীরা দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের বন্ধুদের সাথে থেকে অনেকটা আওয়ামী লীগ সেজে চুটিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। তারা চক্ষু লজ্জায় ধানের শীষের ব্যাজ না লাগিয়ে নৌকার ব্যাজ লাগাতে চায় না। আবার মুখে প্রচার করে যে, ‘আরে কিছু লাগবে না এমনিতেই আওয়ামী লীগ জিতে যাবে’। এই ধরণের প্রচারকের কথার পক্ষে যুক্তি হল ২০১৪, ২০১৮ সালের নির্বাচন। এতেও বহু মানুষ ডি-মোটিভেটেড হয়েছে ভোট কেন্দ্রে যাবার ব্যাপারে।

তৃণমূলে আওয়ামী লীগের ত্যাগী কর্মী সমর্থকরা চরম অবহেলিত। পুরাতনদের মাঝে যারা একটু বেশি কম্প্রোমাইজিং মেন্টালিটির, তারা ছাড়া কেউ ভোটারের বাড়ি বাড়ি তেমন করে যান নি। আওয়ামী লীগের ত্যাগী কর্মীদের অধিকাংশই এক ধরণের হতাশায় ভুগছেন, কিন্তু তাঁদের হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু তাই তারা শত অবহেলাতেও দলের সাথে আছেন, থাকবেন। এদেরকে বাদ দিয়ে এবার অধিকাংশ মহল্লায় হাইব্রিড আওয়ামী লীগারদের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মহল্লার ত্যাগী কর্মীদের রাখা হয়েছে নামকাওয়াস্তে গণ-উপদেষ্টা পরিষদে, যাদের কোন দায়িত্ব নেই বাস্তবে। যারা ঐ মহল্লায় ১০ বছর আগেও ধানের শীষ নিয়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছে, তাণ্ডব ছড়িয়েছে। তাঁদের ক্ষমতা নেই কোন অন্তপ্রাণ আওয়ামী লীগারকে নির্বাচনী ক্যাম্পে আনা বা ভোট দিতে জোর করা। এতে বয়স্ক বিপুল আওয়ামী লীগ সমর্থক অসহায় হয়ে নির্লিপ্ত হয়ে গেছেন। তারা প্রতিবাদ করতে পারেন নি কারণ সেই পরিবেশ নেই, বরং পরবর্তীতে বিপদের সম্ভাবনা আছে। এই নির্লিপ্ততা অনেকেই ভোট কেন্দ্রে যান নি। এছাড়া দলীয় এমপি বা নেতাদের মধ্যে গ্রুপিং তাঁদের ভোটে দলীয় প্রার্থীর পক্ষ নিতে নিরাপত্তাহীন ও মানসিকভাবে নিরুৎসাহিত করেছে।

আরেকটি বিরাট বিষয়ে বয়স্ক ও সৎ আওয়ামী লীগ কর্মীরা হতাশ হয়েছেন। তা হল, কাসিনো কেলেঙ্কারির পরে যেসব বড় নেতা, এমপি, বা এলাকার পাতি নেতাদের নাম দুর্নীতিবাজ হিসেবে বিভিন্ন মিডিয়ায় এসেছিল তাঁদের অনেকেই নির্বাচনের আগে আবার সেই আগের রূপে এলাকায় এসেছে। তাদের অনেকে নমিনেশন না পেলেও তাদের অপকর্মের সঙ্গীরা মনোনয়ন পেয়েছেন। এতে সাধারণ মানুষ খুব শঙ্কিত আর পুরাতন আওয়ামী লীগাররা আশাহত হয়েছেন। তাই তাঁদের কাছে ভোট দেওয়া না দেওয়া অর্থহীন হয়ে পড়েছে। কিছু আশাবাদী মানুষ বলেছেন, আওয়ামী লীগের কাউন্সিল আর সিটি নির্বাচন পরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ে গোয়েন্দা হিসেবে ঢুকে পড়া প্রায় ৫৫ হাজার অনুপ্রবেশকারী আর দলের উচ্চ পর্যায়ের কিছু দুর্নীতিবাজ নেতার মুখে লাগাম টেনে ধরা হবে, মানে ‘সাংগঠনিক অপারেশন’ চালান হবে। সবার প্রত্যাশা ছিল আওয়ামী লীগে এবার হাইব্রিডের আর অসৎদের দাপট কমবে। সেই প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি। তা না হলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর থেকে দেখা আওয়ামী লীগের যে দলীয় ভোট তার সাথে বিএনপি’র ১০ /১২ ভাগ ভোট যোগ হলেও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে ভোট পড়ার হার ৫০ ভাগ ছাড়িয়ে যেতো।

এমতাবস্থায়, আওয়ামী লীগ কর্মী ও ভোটারগণ আওয়ামী লীগের হাই কম্যান্ডের দিকে তাকিয়ে আছেন। জননেত্রি শেখ হাসিনাই পারেন দলকে পরগাছা মুক্ত করে আগের মত চাঙ্গা করে, ভোটারদের নির্বাচনের সময় ভোটকেন্দ্রমুখি করতে।

 

সায়েদুল আরেফিন

কলামিস্ট, উন্নয়নকর্মী