ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২০, ১৯ চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

গার্মেন্টস ধ্বংস করতে টিআইবি’র পাঁয়তারা!

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ বৃহস্পতিবার, ০৫:৫৯ পিএম
গার্মেন্টস ধ্বংস করতে টিআইবি’র পাঁয়তারা!

দুর্নীতির খবরে চাউর আমাদের দেশের সকল মিডিয়া। দৈনিক পত্রিকা, অনলাইন পোর্টাল বা সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখলেই হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের খবর এখন অনেকটা গা সওয়া হয়ে যাচ্ছে। এখন আর মানুষ তেমনিভাবে আঁতকে ওঠে না। কারণ অভিযোগ আছে যে, টাকা পাচারকারীরা অনেকেই জন প্রতিনিধি বা জন প্রতিনিধি হতে চান, কেউ সরকারী চাকুরে বা ব্যাংকের বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, ব্যবসায়ী,ইত্যাদি। গতকাল এর সাথে যোগ হয়েছে বিদেশী নাগরিক।

খবর বেরিয়েছে, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকরা প্রতিবছর অবৈধভাবে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে। এমন তথ্য দিয়েছে দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি)। টিআইবি বলছে, বিভিন্ন সূত্র থেকে তারা সংগ্রহ করা তথ্যে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে বৈধ এবং অবৈধভাবে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের সংখ্যা কমপক্ষে আড়াই লাখ।

সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের নিয়োগ ও চাকরি করার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাব ও নীতিমালা বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ না থাকার কারণে এমন ঘটনা ঘটছে।

টিআইবি’র গবেষণায় বলা হয়েছে, বিদেশী নাগরিকরা যেসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন সেখানে তাদের প্রকৃত বেতন গোপন করা হচ্ছে। গার্মেন্টস খাতে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের উদাহরণ তুলে ধরে টিআইবি বলেছে, সেখানে একজন বিদেশী নাগরিক সিইও হিসেবে প্রতিমাসে ১০ থেকে ১২ হাজার ডলার বেতন পেলেও কাগজপত্রে সেটি দেখানো হচ্ছে মাত্র তিন থেকে চার হাজার ডলার।

টিআইবি বলছে, বাংলাদেশে প্রায় আড়াই লাখ বিদেশি নাগরিক কাজ করে। তবে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই সংখ্যাটি অনুমান করা হলেও, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে বলেও ধারণা করছে তারা।

টিআইবি’র এই অনুমান নির্ভর তথ্যের একটু বিশ্লেষণ করা যায় দুই ভাবে। এক হচ্ছে সরকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ করা বিদেশী আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করা বিদেশিদের নিয়ে। টিআইবি’র মত প্রতিষ্ঠানের জানা উচিৎ যে সরকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ করা বিদেশীরা সরকারের সাথে সম্পাদিত চুক্তির আওতায় কাজ করেন। এদের আছে আবার তিনটি ভাগ। এক- পুরোপুরি সরকারী প্রতিষ্ঠানে কারিগরি সহায়তা দান করেন যারা চুক্তির শর্ত মোতাবেক আয়কর মুক্ত কারণ তাঁদের বেতন ভাতার সব কিছুই বাংলাদেশের বাইরে লেনদেন হয়। দুই- অনুদানে বাস্তবায়িত প্রকল্প যারা টাকাও দেশের বাইরে দেওয়া হয়, বাংলাদেশে নয়। তাঁদের বেলায় আয়কর মৌকুফের চুক্তি থাকে সরকারের সাথে। তৃতীয়ত- ঋণ চুক্তির আওতায় বাস্তবায়িত প্রকল্পে নিয়োজিত থাকে দুই ধরণের বিদেশী ক). বিদেশী পরামর্শক যারা বেতন ভাতাদি পান ঋণ দাতা সংস্থার কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় এবং বিদেশে। তাই এখানে টাকা পাচারের কোন সুযোগ নেই। খ). প্রকল্প বাস্তবায়নকারী বিদেশী ঠিকাদার (যদি বিদেশী হয়) সেখানেও সব দেশের ঠিকাদারদের কাছে থেকে আয়কর নেওয়ার বিধান নেই। কারণ বাংলাদেশের সাথে অনেক দেশের ‘দ্বৈত কর অব্যাহতি চুক্তি’ আছে। যে সব দেশের সাথে ‘দ্বৈত কর অব্যাহতি চুক্তি’ আছে তাঁদের কাছ থেকে আয়কর নেওয়া যায় না বিধায় টাকা পাচারের কোন সুযোগ নেই। তাই সরকারী কাজে টাকা পাচারের সুযোগ খুউব সীমিত।

এবার আসা যাক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশীদের নিয়ে। বিদেশী কাজ করার আরেকটি ক্ষেত্র হচ্ছে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (বেপজা) এ স্থাপিত শিল্প কারখানায় কর্মরত বিদেশী নাগরিক। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়য়ের ছাড়পত্র নিয়ে এদের ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু করার দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারী এজেন্সি হচ্ছে বেপজা। তাই এখানে কর ফাঁকির সুযোগে থাকলে তার জন্য গয়রহ বাংলাদেশের কোম্পানিকে কি দায়ী করা যায়? বেজা এখনো পুরোদমে কাজ শুরু করেনি বলে তাঁদের কথা এখানে নাইবা আনলাম।

এবার আসি আমাদের দেশীয় গার্মেন্টস ও অন্যান্য শিল্প কারখানায় নিয়োজিত বিদেশিদের কথায়। দেশীয় গার্মেন্টস ও অন্যান্য শিল্প কারখানায় নিয়োজিত বিদেশিদের নিয়োগের অনুমতি বা ওয়ার্ক পারমিট দেয় বিডা (সাবেক বিওআই)। বিদেশীদের বেতন ভাতাদি নিয়ে টিআইবি যে তথ্য দিয়ে তার সাথে বিতর্ক না করেই বলি সব গার্মেন্টস বা শিল্প কারখানা এটা করে না, অনেকে করে, সবাই না। তাই ঢালাওভাবে গার্মেন্টসকে অনুমানের ভিত্তিতে দোষারোপ করা কতটুকু সঙ্গত তা বিবেচনায় নিতে হবে।

৪ এপ্রিল ২০০৭ সালে (বহিঃ-২)/পি-৭/২০০৬/৫১২ তে প্রকাশিত বাংলাদেশ সরকারের ভিসা নীতিমালায় ৩৩ ধরণের ভিসার কথা বলা হয়েছে। এখান থেকেই বুঝা যাবে যে কে কোন কাজে বাংলাদেশে আসছেন। বি ভিসায় ব্যবসার জন্য না ই ভিসায় চাকরির জন্য না টি ভিসায় বেড়াতে বা ভিওএ ভিসায় এসেছেন!

সমস্যাটা অন্য খানে। ভিসা ইস্যু করে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন আর এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশনের পুলিশ কর্তাগণ, যাদের অনেকের ভিসা পলিসি সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা নেই। তবে বাংলাদেশে আগত সব বিদেশীর ভিসার তথ্য এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন তথা পুলিশের এসবি’র কাছে থাকে। কার ভিসার মেয়াদ কখন শেষ হল তার জানান দেওয়ার বিধান এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশনের সফটওয়ারে বা কম্পিউটারে নেই। থাকলে তারা ব্যবস্থা নিতে পারতেন। অন্য দিকে বাংলাদেশে ভিসার মেয়াদ শেষ হলে তা বৃদ্ধির জন্য যখন বাংলাদেশ সরকারের ডিপার্টমেন্ট অফ ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট (ডিআইপি) এ আবেদন করেন তার কোন তথ্য এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশন পান না। ডিআইপি’র সার্ভারের সাথে এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশনের কম্পিউটারের সার্ভারের কোন লিংক নেই। একই মন্ত্রণালয়য়ের অধীন দুটি দপ্তরের মাঝে এমন সমন্বয়হীনতার এই অপকর্মের সুযোগ পাওয়ার অন্যতম একটি কারণ।

বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টর হচ্ছে অন্যতম শ্রমঘন একটি শিল্প। যেখানে লক্ষ লক্ষ মহিলা কাজের সুযোগ পেয়ে মোটামুটি একটা সুন্দর জীবনযাপন করছেন। গার্মেন্টস খাতে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের উদাহরণ তুলে ধরে টিআইবি এই খাতকে একটা চাপের মুখে ফেলতে চেয়েছে কি? তা না হলে উদাহরণ হিসেবে কেন শুধু এই খাতের নাম আসে! অন্যান্য শিল্প কারখানায় যে সব এক্সপার্ট কাজ করেন তাঁদের বেলায় কি এই পাচার কম হয় তাই তারা বলতে চেয়েছে! অনুমান নির্ভর তথ্যের উপর ভিত্তি করে টিআইবি`র এই আচরণ কেন! টিআইবি তে যারা কাজ করেন তাঁরা বাংলাদেশের নাগরিক। তাঁদের নাগরিক দায়িত্ব আছে। সেই দায়িত্ববোধ বা দায়িত্ব থেকে তাঁরা অর্থ পাচারের কারণ, তার প্রতিকারের উপায় না বাতলে অনুমান নির্ভর তথ্য দিয়ে কি আমাদের গার্মেন্টস শিল্পকে ধ্বংস করতে চান! অবাক হবার কথা বটে!