ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২০, ১৯ চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ভোটারদের কেন্দ্রে ফেরাতে আওয়ামী লীগের উদ্যোগ!

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ রবিবার, ০৬:২৭ পিএম
ভোটারদের কেন্দ্রে ফেরাতে আওয়ামী লীগের উদ্যোগ!

ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন শেষ হয়েছে। ঢাকার দুই সিটিতে দুই মেয়র সহ সাধারণ ওয়ার্ডে ১২৯ টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের বিজয়ী কাউন্সিলরের সংখ্যা ৯৮ জন। আর সংরক্ষিত ৪৩ টি আসনের মধ্যে মধ্যে ৩৪ জন সহ মোট ১৩২ জন জয়ী হয়েছেন। ১৬ জন বিদ্রোহী কাউন্সিলর জয়লাভ করেছেন, বাকীরা অন্য দল বা নির্দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থী। কিন্তু নির্বাচনে পোল্ড ভোটের সংখ্যা শতকরা ৩০ ভাগেরও কম। যা সরকার, সরকারী দল ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের জন্য একটা মারাত্মক অশনি সংকেত।

এমন প্রেক্ষাপটে গত শুক্রবার আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর, দক্ষিণ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কমিটির তালিকা দলীয় দফতরে ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে। আর যেসব জেলায় যাদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে তাদের এপ্রিলের মধ্যে সম্মেলন শেষ করতে বলা হয়েছে।’

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় যে, বর্তমানে ডিএমপিতে ৫০ টি মতান্তরে ৫৩টি থানা রয়েছে এবং আরো চারটি থানা গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। থানার প্রকৃত সংখ্যা যাই হউক না কেন এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনে ২ হাজার ৪৬৮টি ভোট কেন্দ্র অর্থাৎ এতগুলো মহল্লা বা ইউনিট আছে বলে ধরে নেওয়া যায়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী মহানগরীর প্রতি ইউনিটে ৩৭ সদস্যের কমিটি (ধারা ৩৫ (গ)) করা হলে কী দাঁড়ায়? ৩৭ গুন ২,৪৬৮= ৯১,৩১৬ জন নেতা পয়া যায় বিভিন্ন মহল্লায় যারা সরাসরি ভোট কেন্দ্রের সাথে সম্পৃক্ত।

একইভাবে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- মহিলা আওয়ামী লীগ, কৃষক লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, তাঁতী লীগ, যুব মহিলা লীগ, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) ও শ্রমিক লীগের মত সংগঠন। সেগুলোরও মহানগরীর প্রতি ইউনিটে কমিটি থাকার কথা, আছেও মনে করা হয়। তাহলে মূল দলের প্রায় ১০গুন সমান সংখ্যক নেতা কর্মী ইউনিট লেভেলে তৈরি করা গেলে দলের সাংগঠনিক শক্তি যেমন বাড়বে তেমনি ভোট কেন্দ্রে ভোটের খরা অনেকটাই দূর হবে, ইউনিট নেতারা শতকরা ৬০/৭০ ভাগ সক্রিয় হলেও।

কিন্তু সমস্যা অন্যখানে। এসব কমিটির প্রায় অধিকাংশ এখন হাই ব্রিড বা পল্টিবাজ বহিরাগতদের দখলে যাদের পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড আওয়ামী লীগ নয়। যারা বর্তমানে কমিটিতে আছেন তাঁদের অধিকাংশই ৫/১০ বছর আগে ছিলেন এমন দলে যারা আওয়ামী লীগের কর্মীদের উপর অত্যাচার নিপীড়ন করেছেন, তাই পোড় খাওয়া আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তাঁদের চেহারা দেখলে ভোট কেন্দ্রেও যেতে চান না। শহর নগরে এই সমস্যা খুব প্রকট হলেও গ্রামে এটার প্রভাব তুলনামূলক কম। এসব হয়েছে সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে পদ বাণিজ্য আর কমিটি বাণিজ্যের কারণে বলে প্রবীণ আওয়ামী লীগ কর্মী সমর্থকগণ প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ করেছেন।

এমন বাস্তবতায় ইউনিট কমিটিগুলোতে সভাপতি সাধারণ সম্পাদক সহ কমপক্ষে ৬০ভাগ পদ পুরাতন আওয়ামী লীগ কর্মী সমর্থদের সমাবেশ ঘটানো মাস্ট। তা না হলে আগামী নির্বাচনে ভোট প্রদানের হার আরও কমে যাবার যৌক্তিক কারণ হতে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা করেন। আগামী ২ বছরের মধ্যেই এই কমিটি গঠন সম্পন্ন না করা গেলে ভোট কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতির এই বিপর্যয় ঠেকানোর আপাত কোন বিকল্প দেখা যাচ্ছে না। কারণ স্লোগান দিয়ে ভোট হয় না। ওয়ান টু ওয়ান আলোচনা করে ভালোবাসা আর মহল্লাবাসীদের বিভিন্ন বিপদে সহায়তার হাত প্রসারিত করার ফলেই দলের ভাবমূর্তি আর সমর্থন বাড়ে। দলের প্রতিটি স্তরের প্রতিটি নেতার কথা বার্তা, আচরণ হতে হয় সংযত, মার্জিত কারণ এটা সাধারণ মানুষ ফলো করেন। সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক দলের কর্মীদের আচার আচরণ দেখেই দলের প্রতি তাঁদের সমর্থন ব্যক্ত করেন, সমর্থক হয়ে কর্মী বনে যান।

অনেকে বলেছেন, আইন করে মানুষকে ভোট কেন্দ্রে আনতে হবে। জানিনা এটা বাঙ্গালীর জন্য কতটুকু কার্যকর হবে। তবে ভোটে সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে মানুষের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে কাজ করতে হবে, সাধারণ মানুষকে ভালোবাসতে হবে, সম্মান দিতে হবে, আস্থায় আনতে হবে। আর এই কাজে সরকারী দলের দায়িত্ব অন্যসব দলের চেয়ে অনেক বেশি।

মুখে মুখে যতই ওজুহাত খাড়া করা হউক না কেন, ভোট কেন্দ্রে ভোটারদের নিয়ে আসা এখন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ কেন ভোট বিমুখ হচ্ছে তার যতই কারণ থাক না কেন, সাধারণ মানুষকে ভোট কেন্দ্রে আনার জন্য যা যা করার সব করতে হবে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে। কার কারণে এটা হয়েছে তার চেয়ে জরুরী এই সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে আশু পদক্ষেপ গ্রহণ। ‘ফেব্রুয়ারির মধ্যে সব কমিটি পূর্ণাঙ্গ’ হবে, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কী সেই ইঙ্গিত দিচ্ছেন, নাকি কথার কথা বলেছেন! পোড় খাওয়া ত্যাগী কর্মীদের বিভিন্ন কমিটিতে এনে, তাঁদের দিয়ে মানুষের সেবা করে কি ভোটারদের আস্থা ফেরানোর কথা ভাবছে আওয়ামী লীগ!


বাংলা ইনসাইডার/এমআরএইচ