ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২০, ১৯ চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

খালেদা জিয়ার মুক্তি ও রাজা দক্ষিণ রায়

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ বুধবার, ০৯:০০ পিএম
খালেদা জিয়ার মুক্তি ও রাজা দক্ষিণ রায়

উন্নত চিকিৎসার জন্য মানবিক দিক চিন্তা করে সরকারের কাছে কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানিয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা। খালেদা জিয়ার বোন সেলিমা ইসলাম বলেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে, উঠে দাঁড়াতে পারেন না। হাঁটতেও পারেন না। একটু হাঁটলে আবার তাকে বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় সরকারের কাছে আমরা তার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছি। দুই বৎসর ধরে খালেদা জিয়া কারান্তরীণ। যখন তিনি কারাগারে গিয়েছেন, তখন তার শারীরিক যে অবস্থা ছিল, এখন তা নেই। তখন তিনি হেঁটে-চলে বেড়াতেন, এখন ৫ মিনিটও দাঁড়াতে পারেন না।

এক প্রশ্নের জবাবে খালেদা জিয়ার বোন বলেন, ‘তার মুক্তির জন্য আমরা এখনও আবেদন করিনি। আমরা জাতির কাছে আবেদন করছি, জনতার কাছে আবেদন করছি যে, ওনার জন্য দোয়া করবেন’।

জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ১৭ বছরের কারাদণ্ড নিয়ে বন্দি আছেন খালেদা জিয়া। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দণ্ডিত হওয়ার পর তাকে নেয়া হয়েছিল পুরাণ ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে। কয়েক দফায় সেখান থেকে এনে তাকে বিএসএমএমইউতে চিকিৎসা দেয়া হয়। সর্বশেষ গত বছর ১ এপ্রিল খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউতে ভর্তি করা হয়। এরপর থেকে সেখানেই চিকিৎসাধীন আছেন তিনি।

পত্রিকায় উপরের খবরটা পড়ে অনেকেই অবাক হয়েছেন। যারা নিজেদের তথাকথিত শিক্ষিত বলে দাবি করেন তাঁরা মুখে স্বীকার করেন আর নাই করেন কিন্তু ভালভাবেই জানি যে খালেদা জিয়ার মুক্তির দুটি উপায় আছে। ১). আদালাত উনাকে জামিন দেবেন বা তার অপরাধ থেকে অব্যাহতি দেবে তখন তিনি মুক্তি পাবেন। ২). হচ্ছে সরকারের কাছে তিনি আবেদন করবেন তার প্যারোলের জন্য। এর জন্য সরকারের একটা নীতিমালা (স্মারক নং ৪৪.০০.০০০০.০২৪.০১.০০১.১৫।-২০১ তাং ০১ জুন ২০১৬) আছে। যাতে বলা হয়েছে যে, কয়েদি/ হাজতি বন্দীদের নিকট আত্মীয় মারা গেলে সংশ্লিষ্ট কয়েদি বা হাজতিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যাবে। এছাড়া আদালতের আদেশ বা সরকারের বিশেষ সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্যারোলে মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যাবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

এতে দেখা যায় যে, আদালত ছাড়া কোন কয়েদি/ হাজতি বন্দীকে প্যারোলে মুক্তি একটা সাময়িক ব্যাপার, অপরাধ থেকে দায় মুক্তি নয়। যেটা আদালতের আদেশ বা সরকারের বিশেষ সিদ্ধান্ত মোতাবেক হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্ধারিত একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় এই প্যারোলের আবেদন করতে হয়, মৌখিক কথায় হয় না।

বেগম খালেদা জিয়ার বোন বলেছেন, ‘তার (খালেদা জিয়া) মুক্তির জন্য আমরা এখনও আবেদন করিনি। আমরা জাতির কাছে আবেদন করছি, জনতার কাছে আবেদন করছি যে, ওনার জন্য দোয়া করবেন’। তিনি ‘সরকারের কাছে আমরা তার নিঃশর্ত মুক্তি’র দাবি জানিয়েছেন। জাতির কাছে আবেদন করে উনারা সরকারের কাছে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করছেন সরকারের কাছে। এতে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, খালেদা জিয়ার মুক্তির আইনগত যে সুযোগ তাঁদের (বিএনপি ও জিয়া পরিবারের সদস্যদের) কাছে আছে তা নিতে তাঁরা আন্তরিক নন। ফলে এটা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে যে, উনারা খালেদা জিয়াকে জেলে রেখা নানা বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চাচ্ছেন, বাস্তবে খালেদা জিয়ার মুক্তি তাঁরা চান না। বিএনপি নেতা ও জিয়া পরিবারের সদস্যদের বাইরের রূপ আর অন্তর বা ভিতরের রূপ দুটোই আলাদা।

উপরের কথায় মানুষের উপর রাজা দক্ষিণ রায়ের ভর হবার কথা মনে পড়ে। বনবিবির জহুরানামা নামে একটি বই থেকে জানতে পারা যায়, বনবিবি হলেন ইব্রাহিম নামে এক সুফি ফকিরের কন্যা। ইব্রাহিম সুদূর আরব দেশের মদিনা থেকে আসেন বাংলায়। সঙ্গে আসেন তাঁর দুই স্ত্রী। ইব্রাহিমের প্রথম স্ত্রী গুলাল বিবি তাঁর সতীনের প্ররোচনায় সুন্দরবনে পরিত্যক্ত হন। সুন্দরবনের জঙ্গলে গুলাল বিবির গর্ভে আরবদূহিতা বনবিবি ও তাঁর ভাই শাহ জঙ্গলী জন্ম নেন। জন্মের পর থেকেই বনবিবির ঐশ্বরিক ক্ষমতার কথা সারা সুন্দরবনে প্রচারিত হয়ে যায়।

জঙ্গলের পশুপাখি থেকে মানুষ সবাই বনবিবির বশ হয়ে যায়। এ দিকে, যশোরের ব্রাহ্মণনগরের রাজা মুকুট রায়ের অধীনস্থ ভাটির দেশের রাজা ছিলেন ব্যাঘ্র-রূপী অপদেবতা দক্ষিণ রায়। তিনি ছিলেন সুন্দরবনের একছত্র অধিপতি। তিনি বনবিবির বশ্যতা মেনে নেন না। দক্ষিণ রায়ের অত্যাচার থেকে সুন্দরবনের মানুষদেরকে বাঁচানোর জন্য স্বর্গ থেকে আদেশ আসে মা বনবিবির কাছে। তাঁর সঙ্গে বনবিবির একাধিক যুদ্ধ হয়। দক্ষিণ রায় প্রতিটি যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বনবিবির সঙ্গে সন্ধি করতে বাধ্য হন।

দুই বাংলার সুন্দরবন এলাকার অনেক মানুষ এখনো বিশ্বাস করেন যে, অপদেবতা দক্ষিণ রায় মানুষের উপর ভর করার ক্ষমতা রাখে। যে সব মানুষের উপর ভর হয় তারা বাইরে থেকে তাদের মানুষের মত দেখালেও যখন অপদেবতা দক্ষিণ রায় যখন মনে করে তখনই বাঘের রুপ ধারণ করতে পারে।