ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২০, ১৯ চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

মানবিকতার নিরিখে খালেদা জিয়ার মুক্তি!

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ রবিবার, ১০:১১ পিএম
মানবিকতার নিরিখে খালেদা জিয়ার মুক্তি!

মানবিক কারণে দলীয় চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার কারামুক্তির দাবি জানিয়েছে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শনিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) নয়াপল্টনে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে বলেন, ‘আমরা আশা করবো, মানবিক কারণে জনগণের দাবিকে সম্মান করে সরকার অবিলম্বে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেবে।’ বিএনপি- জামায়াত ও বিএনপি ঘরানা বাম ও নব্য আওয়ামী লীগারদের মাঝেও দাবিটা খুব যৌক্তিক মনে হয়েছে। পাড়া মহল্লায় আড়ালে আবডালে মানুষের ‘করুণা ভিক্ষা’র জন্য এমন সব কথা বাজারে জোরেশোরে শনা যাচ্ছে।

বিএনপি যার জন্য বা যে ‘আপোষহীন নেত্রী’র জন্য আওয়ামী লীগের বা সরকার প্রধানের কাছে ‘মানবিক কারণে’ মুক্তি দাবি করেছে সে নেত্রী (খালেদা জিয়া) তাঁদের ভাষায় ৩ বারের ‘সফল প্রধানমন্ত্রী’ থাকাকালে কতটুকু মানবিক ছিলে তা একটু দেখে নিলে দোষের হবে না। সবাই একটু কষ্ট করে পিছনে ফিরে তাকালেই জানতে পারবেন, যে-

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর গোটা পরিবারকেই শেষ করে দেওয়া হয় এক পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে। বিদেশে অবস্থান করার কারণে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যান। এর পরেও খুনি আর তার দোসরেরা থেমে থাকেনি। হাজার হাজার আওয়ামী লীগ কর্মীকে হত্যা করেছে। যারাই কেউ রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছে তাকেই নানাভাবে দাবিয়ে দেওয়া হয়েছে বা হত্যা করা হয়েছে। ১৯৭৫ পরবর্তী সবগুলো সরকারই কম বেশি এই আচরণ করেছে। এটাকে কি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মানবিক আচরণ মনে করেন!

বিএনপির মদদে ২০০৪ সালে ২১শে অগাস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন ১৬ জন। পরে সব মিলিয়ে নিহত মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২ জনে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তখনকার মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আইভি রহমান। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ তখন বধ্যভূমি, এদিক-ওদিক পড়ে আছে মানুষের ছিন্নভিন্ন অঙ্গ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতালসহ আরও অনেক হাসপাতালে শোনা যাচ্ছিল আহত আর অর্ধমৃত মানুষের আর্তনাদ এবং স্বজনদের আহাজারি। ওই অবস্থাতেই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মামলা দিতে গেলে পুলিশ সে মামলা নেয়নি। তার আগেই পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করে। এর বাইরে গ্রেনেডের স্প্লিন্টারে ক্ষতবিক্ষত হন কয়েক শ নেতা-কর্মী, যার যন্ত্রণা তাঁরা এখনো বয়ে চলেছেন।

ঘটনার সময় সংসদের অধিবেশন মুলতবি ছিল। ১২ সেপ্টেম্বর সংসদ বসলে আওয়ামী লীগের নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রক্তমাখা পাঞ্জাবি পরে অধিবেশনে যোগ দেন। সে দিন তিনি সংসদে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার তাঁকে ফ্লোর দেননি। এটা কি মানবিক আচরণ ছিল!

এগ আগে ২০০৪ সালের ২ এপ্রিল বরিশালের গৌরনদীতে তার গাড়িবহরে গুলিবর্ষণ করে দুর্বৃত্তরা। গৌরনদী বাস-স্ট্যান্ডে ওই হামলা, গাড়ি ভাঙচুর, লুটতরাজের ঘটনায় প্রকৃত হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা না করে “মানবিক কারণে (!)” উল্টো আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের আসামি করে মামলা দেয় পুলিশ। পরে ওই মামলার ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়। এই আচরণ কি মানবিক ছিল!

২০০৩ সালের ৩০ আগস্ট সাতক্ষীরার কলারোয়ায় বিএনপি অফিসের সামনে শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলা চালানো হয়। ওই দিন তার গাড়িবহরে ব্যাপক গুলিবর্ষণ করা হয়। কিন্তু অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা। এই আচরণ মানবিক ছিল বলে ফখরুল সাহেবরা দাবি করতেই পারেন!

২০০২ সালের ৪ মার্চ নওগাঁয় বিএমসি সরকারি মহিলা কলেজের সামনে শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলা চালানো হয়। ২০০২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীরা সাতক্ষীরার কলারোয়ার রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে শেখ হাসিনার ওপর হামলা চালায়। এই আচরণ কি মানবিক ছিল!

তখন বিএনপি ক্ষমতায়। ১৯৯৫ সালের মার্চে রাজধানীর পান্থপথে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে বোমা হামলা চালানো হয়। তখন দলের নেতাকর্মীরা তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। একই বছরের ৭ ডিসেম্বর রাজধানীর শেখ রাসেল স্কয়ারের কাছে সমাবেশে ভাষণদানরত অবস্থায় শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। এই আচরণ কতটুকু মানবিক ছিল!

১৯৯৪ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ট্রেনমার্চ করার সময় পাবনার ঈশ্বরদী রেলস্টেশনে। এ সময় শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রেনের বগি লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। অসংখ্য গুলি লাগে বগিটিতে। বিএনপি তখন ক্ষমতায়। এই আচরণ কি খুব মানবিক ছিল!

বিএনপি ক্ষমতায় থাকা কালে ১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চতুর্থ জাতীয় সংসদের উপনির্বাচনের সময় ধানমণ্ডির গ্রিন রোডের ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনকালে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। গাড়িতে গুলি লাগলেও তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। একই বছর ২৭ সেপ্টেম্বর লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর খুনি ডালিমসহ অন্যরা শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। এই আচরণকে মানবিক বলা যাবে কি!

বিএনপি শাসনামলে তাদের এমন অনেক মানবিক আচরণের উদাহরণ দেওয়া যায়। যেমন তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে বিএনপি রাষ্ট্রপতি করেন। তাঁর সাথে মনমালিন্য হবার পরে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করেই তাঁরা ক্ষান্ত হয় নি, ‘গুলি করে হত্যার হুমকি দিয়ে” রেল লাইনের পাশ ধরে তাঁকে দৌড়াতে বাধ্য করে বিএনপি মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে কী!

বিএনপি নেতারা দেশে বিদেশে বসে নানা কদর্য ভাষায় শেখ হাসিনা আর তাঁর সরকারকে আক্রমণ করে চলেছে। তাদের সহযোগীরা সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন মিডিয়া, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া ব্যবহার করে চালাচ্ছে বেশুমার মিথ্যাচার। যার নামে সব চেয়ে বেশি মিথ্যাচার আর, যাকে সব চেয়ে অশালীন ও কদর্য ভাষায় আক্রমণ করা হচ্ছে বিএনপি- জামায়াত আর তাদের সহযোগী বাম ঘরানার রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীগণ, তাঁর কাছেই আবার মানবিক আচরণের প্রত্যাশা কী ‘চরম ভণ্ডামি’ নয়!

তার পরেও বলি আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে খালেদা জিয়াকে যতটুকু সুবিধা দেওয়া যায়, প্রধানমন্ত্রী তা দেবেন। কিন্তু বিএনপি কী আসলে কি খালেদা জিয়ার মুক্তি চায়, না চায় না তাঁর ফয়সালা আগে করতে হবে। তার পরে সরকারকে বলতে হবে আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার মুক্তি দিতে।