ঢাকা, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০, ২৯ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

পরিকল্পনামন্ত্রী ও ‘বুঝপাতা’র কথা

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ মঙ্গলবার, ১০:০০ পিএম
পরিকল্পনামন্ত্রী ও ‘বুঝপাতা’র কথা

সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা কথা বেশ জোরেশোরে আসার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সেটা হলো- ‘গত সোমবার ১৭ ফেব্রুয়ারি) পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘কাঁঠালের আকার অনেক বড় হওয়ায় প্রায় ৪০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আপনারা কাঁঠালের আকারটা আরেকটু ছোট কীভাবে করা যায়, তা গবেষণা করতে পারেন।’ এসময় তিনি আরও বলেন, ‘আমি অনুরোধ করবো কচুরিপানা নিয়ে কিছু করা যায় কিনা? আমি তো গ্রামের ছেলে। আমাদের এলাকায় নদীগুলো সব কচুরিপানায় ভর্তি। কচুরিপানা (Water-hyacinth)’র পাতা খাওয়া যায় না কোনও মতে? গরু খেতে পারলে আমরা কেন পারবো না?’ এসময় তিনি হাসতে হাসতে বলেন, ‘এমনি একটা কথা বললাম।’

অনেকে বলেন, ‘নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা’ অথবা ‘শূন্য কলসির বাজনা বেশী’ সেটা আমাদের সবার জানা। যারা কথার অর্থ বোঝেন না, বা বুঝতে চান না, তাদের কথা ভিন্ন হলেও তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করতে ওস্তাদ। তাঁরা মানুষকে দেশ ও দেশের সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপীয়ে তুলতে নানাভাবে প্রাণান্ত চেষ্টা করেই চলেন।   

সাধারণভাবে কচুরিপানার যে ব্যবহার দেখা গেছে তা হলো-

  • ভাসমান সবজি চাষ এ কচুরিপানা।
  • সার ও বসতভিটা মজুতকরণ এ কচুরিপানা।
  • মাছের খাদ্য ও নিরাপদ আবাসস্থল।
  • মাছ চাষ - পুকুরে মাছ চাষ করা অনেক ব্যয়বহুল, কারণ মাছের জন্য বাজার থেকে খাবার ক্রয় করতে হয়। তাই অনেক মাছ চাষি আছেন যারা খরচ কমাতে ও মাছের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করাতে কচুরিপানা দিয়ে মাছ চাষ করেন।
  • গবাদি পশু খাদ্য এ কচুরিপানা।
  • হাঁসের খাদ্য এ কচুরিপানা ব্যাপক ব্যাবহার হয়।

কিন্তু মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন কচুরিপানার পাতার কথা। আর তাতেও গল বেঁধেছে। একটি গবেষণায় একটি পরিবেশগত উপদ্রবকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রাকৃতিক সম্পদে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। সর্বাধিক পাত প্রোটিন ঘনীভূত (কচুরিপানার পাতাকে) ভোজ্য আকারে বের করা হয়েছিল এবং এর ফিজিকোকেমিক্যাল বৈশিষ্ট্যগুলি, মোট ক্ষারক এবং ফেনোলিক যৌগগুলি নির্ধারণ করা হয়েছিল। কচুরিপানার পাতার প্রক্সিম্যাট কম্পোজিশন এবং অ্যামিনো অ্যাসিড প্রোফাইল বিশ্লেষণও করা হয়েছিল। কচুরিপানার পাতাতে ভারী ধাতুগুলির স্তর নিরাপদ সীমাতে পাওয়া গেছে। আনুমানিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে কচুরিপানার পাতাতে প্রোটিন তার পুষ্টির ৫০%, কার্বোহাইড্রেট এর পুষ্টিগুলির ৩৩% হিসাবে থাকে যখন ফ্যাট, ছাই এবং ফাইবার বাকী পুষ্টি থাকে। অ্যামিনো অ্যাসিড বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে কচুরিপানার পাতাতে ২০ টি সাধারণ অ্যামিনো অ্যাসিড রয়েছে।  এই গবেষণার প্রমাণ থেকে প্রমাণিত হয় যে কচুরিপানার পাতা হ`ল পাত প্রোটিন ঘনত্বের একটি ভাল উৎস; এটি পুষ্টিকর এবং তীব্রভাবে অ-বিষাক্ত।

গবেষণার পরীক্ষামূলক প্রমাণ থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে কচুরিপানার পাতাতে অর্ধেক পুষ্টি হ`ল প্রোটিন, এক তৃতীয়াংশ কার্বোহাইড্রেট, যখন ফ্যাট, অ্যাশ এবং ফাইবার বাকী পুষ্টি উপাদান তৈরি করে।   

২০ টি সাধারণ অ্যামিনো অ্যাসিডের মধ্যে ১৭ টি রয়েছে কচুরিপানার পাতাতে; যাতে ট্রিপটোফান, গ্লুটামিন এবং অ্যাসপারাজিন সনাক্ত করা যায়নি। কচুরিপানা ভারী ধাতব বিশ্লেষণে সিডি, সিআর, পিডি, এইচজি, পিবি, পিটি, স্নে, ফে, কিউ, জেডএন, নিন এবং কো উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে, তবে এই ধাতবগুলির ঘনত্ব নিরাপদ সীমার মধ্যে থাকায় কোনও হুমকি তৈরি করতে পারেনি। কচুরিপানার পাতায় মোট ক্ষারীয় স্তরের পরিমাণ ১.৬.৬ মিলিগ্রাম / কেজি এবং ফেনলিক যৌগগুলির পরিমাণ .0.০ মিলিগ্রাম / কেজি পাওয়া গেছে। কচুরিপানা হ`ল পাতার প্রোটিন ঘনত্বের একটি ভাল উৎস। জল hyacinth পাত প্রোটিন ঘনীভূত পুষ্টিকর হিসাবে গবেষণা রচনা দ্বারা প্রমাণিত হয়। কচুরিপানার পাতায় শারীরবৃত্তীয় পরিমাণে ক্ষারক এবং ফেনোলিক যৌগ থাকে। এই সমীক্ষা থেকে প্রাপ্ত সামগ্রিক তথ্য প্রমাণ করেছে যে কচুরিপানার পাতা হ`ল খাদ্য এবং খাদ্য সংযোজনকারী শিল্পের জন্য উপযুক্ত কাঁচামাল। এটি উপসংহারে পৌঁছেছে যে অনুকূল জলবায়ু অঞ্চলগুলিতে, নিকাশী জলাশয়ের মতো সমৃদ্ধ মাধ্যমগুলিতে উত্থিত জলের কচুরিপানার পাতাগুলি সম্ভবত যথেষ্ট পরিমাণে খাদ্য পরিপূরক বা পুষ্টির উৎস হিসাবে পরিবেশন করতে পারে। 

সোনার বাংলা নাম কিন্তু এমনিতেই হয়নি। বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আকরিক সোনার মত নানা উপকরণ বা উপাদান, যা আমাদের অনেকেই চেনেন না। আমাদের দেশের মাটি সম্পদে ঠাঁসা। আমরা আমাদের দেশের কোনটা সম্পদ আর কোনটা সম্পদ নয় তা চিনে নিতে পারিনা জ্ঞানের বা অভিজ্ঞতার অভাবে। তাঁর মানে এই নয় যে, তাতে সম্পদ আবর্জনা হয়ে যায়।

আমি দুইটি আবর্জনা আর একটি আগাছার কথা বলতে চাই যা ঠিকমত প্রসেস করলে এই বাংলা হাজার হাজার কোটি টাকার রপ্তানী আয় করতে পারে। তার একটি হচ্ছে সুস্থ্য গরু-ছাগল-মহিষের নাড়ি ভুঁড়ি যার পেস্ট দিয়ে ফার্মাসিটিক্যাল কোম্পানিতে তৈরি করা হয় ক্যাপসুলের ক্যাপ। হাঁসমুরগির নখ, ঠোঁটের পাওডার ব্যবহার হয় দামি ব্রান্ডের লিপস্টিকের মত  পণ্যে।  তেলাকুচার শুকনা পাতা থেকে যে তেল বের করা হয় তা তা খুবই দামী উপাদান ওষুধ কোম্পানির জন্য। এমন অনেক উদাহরণ আছে অনেকের কাছেই। তাই না জেনে জ্ঞানি মানুষকে ছোট করার প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা কি জরুরি নয়! অনেকে মনে করেন যে, মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী জ্ঞানি মানুষ বলেই এত সুন্দর কথা বলতে পেরেছেন। তাই, ‘বুঝলে বুঝপাতা, না বুঝলে তেজপাতা’।