ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

করোনা মোকাবিলায় বড় বেসরকারি উদ্যোগ

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ৩০ মার্চ ২০২০ সোমবার, ০৯:৫৭ এএম
করোনা মোকাবিলায় বড় বেসরকারি উদ্যোগ

করোনাভাইরাস মোকাবিলার অংশ হিসেবে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প গোষ্ঠী আকিজ গ্রুপ একটি অস্থায়ী হাসপাতাল বানানোর কাজ শুরু করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের শিল্প জায়েন্ট নামে খ্যাত বসুন্ধরার গ্রুপ ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা যত দ্রুত সম্ভব চীনের উহান প্রদেশের চেয়ে বড় একটি অস্থায়ী হাসপাতাল তৈরি করে দেবে। এর পাশাপাশি বহু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাঁদের সামর্থ্য আর ইচ্ছা অনুযায়ী দেশের এই সংকট কালে এগিয়ে এসেছে বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে। এটা তারা করছে  তাঁদের কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে।   

কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) হচ্ছে একটি স্ব-নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক মডেল যা কোনও সংস্থা নিজেই নিজেকে সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ হতে সহায়তা করে, তার সাফল্যের অংশীদার জনসাধারণের কাছে, উৎপাদনে নিযুক্ত কর্মীদের কাছে। কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা, যাকে কর্পোরেট নাগরিকত্বও বলা হয়, অনুশীলনের মাধ্যমে সংস্থাগুলি অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত সহ সমাজের সমস্ত দিকগুলিতে যে ধরনের প্রভাব ফেলছে তা সম্পর্কে সচেতন হতে পারে। কোন শিল্প, কোম্পানি বা সংস্থা সিএসআর-এ জড়িত থাকার অর্থ, ব্যবসায়ের সাধারণ ধারায় কোনও সংস্থা তাদের মধ্যে নেতিবাচক অবদানের পরিবর্তে সমাজ ও পরিবেশকে উন্নত করার জন্য কাজ করে। এতে নিজেদের প্রচারও হয় আবার পরবর্তীতে তাঁদের ব্যবসায়ও প্রসার হয়।   

কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা একটি বিস্তৃত ধারণা যা বিভিন্ন ধরণের সংস্থা ও শিল্পের উপর নির্ভর করে অনেকগুলি রূপ নিতে পারে। সিএসআর প্রোগ্রাম, সমাজসেবা এবং স্বেচ্ছাসেবীর প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমাজকে উপকৃত করতে পারে। ছোট এবং মাঝারি আকারের ব্যবসায়িকদের সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রোগ্রামগুলি তৈরি করে, যদিও তাদের উদ্যোগগুলি বৃহত্তর কর্পোরেশনগুলির মতো প্রায়শই তেমন প্রচারিত হয় না।

বাংলাদেশে সিএসআর পরিস্থিতি কী তা জানার চেষ্টা করা যেতে পারে। বাংলাদেশ  ২০১২ সালে ব্যাংক  ও  অর্থনৈতিক  প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি  সিএসআর  নীতমালা প্রণয়ন করেছে। এই নীতিমালায় বিভিন্ন ব্যাংক আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালকগন সিএসার ফাণ্ড নিয়ে তাঁদের এলাকায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ তৈরি করে থাকেন। অন্য দিকে, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় শিশুদের জন্য জাতীয় বসায় সামাজিক দায়বদ্ধতা নীতিমালার খসড়া প্রণয়ন করেছে ২০১৫ সালে, কিন্তু কোন আইন হয়নি আমাদের দেশে। বাংলাদেশ সরকার  ব্যবসায়িক   প্রতিষ্ঠানসমূহকে  কর্পোরেট  সামাজিক  দায়বদ্ধতা  পালনের  ক্ষেত্রে এসআরও নং ১৮৬ আইন/আয়কর/২০১৪ এর বলে ১০% কর রেয়াত প্রদান করছে। বর্তমানে  গণপ্রজাতন্ত্রী  বাংলাদেশ  সরকারের  অর্থ  মন্ত্রণালয়  সিএসআর  বিষয়ক  একটি  জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছেন।  

একটি কোম্পানি কিভাবে পরিচালিত হবে এবং সেই সাথে কোম্পানি, অংশীদার ও ব্যবস্থাপকদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কিত বিধানসমূহ বর্ণনা করে কোম্পানি আইন ১৯৯৪।  এই আইন ব্যবসার মালিক অথবা কর্পোরেট বোর্ড পরিচালকদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কেও আলোকপাত করে। একটি কোম্পানির কর্পোরেট পরিচালনা পদ্ধতি, মালিকানা কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এই আইনের অনুচ্ছেদ ১০৪ এবং তফসিল ১ এ নির্দেশনা রয়েছে।  পরিচালক অথবা ব্যবস্থাপকদের সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি এই আইনে সুনির্দিষ্ট করা নেই।  এই ফাঁকে তারা ইচ্ছা মত কর্পোরেট  সামাজিক  দায়বদ্ধতা  পালনের  ক্ষেত্রে এসআরও নং ১৮৬ আইন/আয়কর/২০১৪ এর বলে ১০% কর রেয়াত নিয়ে থাকেন।    

অধিকাংশ উন্নত দেশসমূহে যেমন কানাডা, আমেরিকা, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ড, ইত্যাদি দেশে সিএসআর নীতমালা রয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের মধ্যে শ্রীলংকায় সিএসআর বিষয়ক নীতিমালা রয়েছে। ভারতে সিএসআর বিষয়ক আইন রয়েছে। সেখানে সকল প্রতিষ্ঠান তাদের লভ্যাংশের ২% সিএসআর খাতে প্রদান করে।

আমরা উন্নত হচ্ছি। আমাদের দেশে কি এখন এই কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে আইন করার সময় আসেনি এখনো! যাঁদের শ্রমে এসব পণ্য তৈরি হয় তাঁদের প্রতি আর যারা আমাদের সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে তাঁদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাচ্ছেন তাঁদের কি সমাজের কাছে কোন সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকতে নেই! আকিজ গ্রুপ আর বসুন্ধরা গ্রুপ স্বেচ্ছায় এসে আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে তাই দেখিয়ে দিলো।  

দেশের দুটি বড় কোম্পানি দুটি হাসপাতাল করোনা ভাইরাস রোগীদের চিকিৎসায় বা সংক্রামিত বা সন্দেহভাজনদের কোয়ারেন্টিনে রাখার জন্য যে উদ্যোগ নিয়েছে সেই খবরে সারা দেশের মানুষের মনে স্বস্তির বাতাস বইছে। আশা করি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে এইরকম উদ্যোগে দেশের বড় বড় কোম্পানি দেশের এই সংকটকালে সহায়তার নতুন নতুন দিগন্তে এগিয়ে আসবেন।   

লেখক: সায়েদুল আরেফিন

কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী