ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

১৯৭১ ও করোনার বিরুদ্ধে ‘’অস্তিত্বের যুদ্ধ’’

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ৩১ মার্চ ২০২০ মঙ্গলবার, ০৯:০০ এএম
১৯৭১ ও করোনার বিরুদ্ধে  ‘’অস্তিত্বের যুদ্ধ’’

মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরুর সুস্পষ্ট নির্দেশনা আসে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর থেকে।  তখন আমাদের হাতে কোন অস্ত্র ছিল না। বাস্তবে অস্ত্র বলতে ছিল বাঁশের লাঠি, গাইতি, শাবল, দা, কুড়াল, মরিচের গুড়া, ইত্যাদি। সাথে ছিল আপামোর মানুষের মনবল, একতা, এবং বঙ্গবন্ধুর ৭ই  মার্চের ভাষণে দেওয়া নির্দেশনা। সেটা মেনে আমরা মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে বিভিন্ন দেশ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে সাহায্য নিয়ে দেশকে শত্রুর হাত থেকে অর্থাৎ পাকিস্তানী হায়েনাদের কবল থেকে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে স্বাধীনতা অর্জন করি।    

এখন সারা দুনিয়ায় চলছে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এটা আমাদের জন্য ‘অস্তিত্বের যুদ্ধ’। এই যুদ্ধের ডাক আসে সেই আগুণ ঝরা মার্চেই। ০৭ই মার্চ পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে রোববার ৮ই মার্চ বিকেলে রাজধানীর মহাখালীতে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)  কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা এ তথ্য জানান। এটাও যেন সেই ১৯৭১ এর মত বাংগালীর অস্তিত্বের যুদ্ধের প্রস্তুতির ডাক। যখন যুদ্ধ জয়ের জন্য ১৯৭১ সালের মত আমাদের হাতে নেই তেমন কোন অস্ত্র। 

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মাঝ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ঢাকায় নিরীহ বাঙ্গালী, ঢাকা বিশবিদ্যালয় ও রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও ইপিআর এর উপর হামলা চালায়। খবর পেয়ে ২৬শে মার্চ ১৯৭১ এর প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এর কিছু সময় পরেই তাঁকে পাকিস্তানী বাহিনী গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।     

২৬শে মার্চ দেশের অন্যান্য শহরে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে হামলা শুরু হলে ইতোমধ্যেই রাজারবাগ ও পিলখানা থেকে ছাড়াও দেশের অন্যান্য স্থান থেকে বিদ্রোহ করা বাঙ্গালী পুলিশ ও ই পি আর এর সাহায্যে আমাদের হাতে কিছু অস্ত্র আর গোলাবারুদ হাতে আসে যা সে সময়ের শক্তিধর পাকিস্তানী বাহিনীর যুদ্ধাস্ত্রের কাছে নস্যি মাত্র। এর আগে আমারদের হাতে ব্যক্তি নিরাপত্তার সামান্য কয়েকটা বন্দুক ছাড়া কোন আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না। ছিল বাঁশের লাঠি, গাইতি, শাবল, দা, কুড়াল, মরিচের গুড়া, ইত্যাদি।   

এবারের বাংগালীর ‘অস্তিত্বের যুদ্ধ’ শুরুর পরে সেই ১৯৭১ সালের মতোই ২৬শে মার্চ চীন থেকে করোনাভাইরাস পরীক্ষার কীট, পিপিই, থারমমিটার ও অন্যান্য সরঞ্জাম এসেছে বাংলাদেশ যা দিয়ে আমরা করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সীমিত অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ শুরু করি।       

কী অদ্ভুত মিল আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ আর আমাদের ‘অস্তিত্বের যুদ্ধে’র মধ্যে! স্বাধীনতা যুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু আর বাংলীর অস্তিত্বের যুদ্ধের ডাক দিলেন তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা। ১৯৭১ সালে সারা দুনিয়াকে অবাক করে দিয়ে আমরা মাত্র ৯ মাসে দেশকে শত্রু মুক্ত করে স্বাধীন করেছি। যা ছিল বিশ্বের শক্তিধর দেশের চোখে বিস্ময়। এবার যখন মহা শক্তিধর ও জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নত আমেরিকান, ইউরপিয়ান দেশের সরকার ও মানুষের চরম নাজেহাল। চলছে মৃত্যুর মিছিল, তখন আমরা আমাদের সীমিত ‘যুদ্ধাস্ত্র’ দিয়ে ১৯৭১ সালের মত বন্ধু রাস্ট্রের যৎসামান্য সাহায্য নিয়ে বাংগালীর ‘অস্তিত্বের যুদ্ধ’ জয় করবোই, করবো।           

সারা দুনিয়া স্বীকার করে নিয়েছে যে, করোনাভাইরাসের সংক্রামণ থেকে আক্রান্তদের ভাল করার বা সংক্রমণ বন্ধ করার মূলত তিনটি উপায় আছে। যার প্রথমটি হচ্ছে - পুরোপুরি ভাইরাস সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত করতে একটা এলাকা লক-ডাউন করা বা মানুষের মুক্ত গতিবিধি বন্ধ করে দেওয়া, জনসমাবেশ বন্ধ করা, ব্যাপক আকারে পরীক্ষা করা। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে ব্যাপক আকারে পরীক্ষা করা অসম্ভব। কারণ ১৯৯ টি দেশ ও অঞ্চলে করোনাভাইরাসের  ছোবল পড়েছে। জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নত আমেরিকা, ইতালী, জারমানী, ফ্রান্স, ব্রিটেন, স্পেন, ইত্যাদি দেশও সেটা করতে পারছে না কিট, পিপিই, ইত্যাদির স্বল্পতার জন্য।  তাই আমাদের পক্ষেও এটা অসম্ভব। আমরা তাই সন্দেহভাজনদের পরীক্ষা করছি মাত্র।   

দ্বিতীয়টি হচ্ছে ভ্যাকসিন দেওয়া যা সবাইকে রক্ষা করতে পারে তবে এটি এখনও কোন দেশ আবিষ্কার করতে পারেনি, তবে চেষ্টা চলছে।  

 তৃতীয়টি বিবেচনা সম্ভাব্য কার্যকর তবে ভয়াবহ। ১০০% লোকের মধ্যে এটা ছড়িয়ে পড়লেও তাঁর মধ্য থেকে ৮০% মানুষ বেঁচে যাবেন। তাঁদের দেহে রোগ প্রতিরোধ এমন ক্ষমতা হয়ে যাবে যে রোগের জীবাণুটির পক্ষে সংবেদনশীল হোস্ট খুঁজে পেতে কঠিন হবে। এই ঘটনাটি হার্ড ইমিউনিটি বা পশুর প্রতিরোধ ক্ষমতা হিসাবে পরিচিত। আমরা আমাদের জন্মদাতা পিতা মাতা বা সন্তানদের উপর এই পরীক্ষা চালাতে পারিনা, কারণ আমরা বাঙ্গালী।  

যেহেতু আমাদের সামর্থ্য সীমিত তাই অনেক চিন্তা করেই আমরা করোনাভাইরাস মোকাবিলায় প্রথম উপায়টি বেছে নিয়েছি। এখন দরকার সরকারের আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) নির্দেশ মেনে চলা, সবাই একতাবদ্ধ থাকা, অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো, নিজেদের আর পরিবারের অন্য সদস্য তথা প্রতিবেশীদের নিরাপদ রাখতে নিজেকে সংযত রাখা। ১৯৭১ সালের পুলিশ, ই পি আর নিয়ে গঠিত মুক্তি বাহিনীর মত আমাদের দেশ প্রেমিক সেনা বাহিনী, পুলিশ, ডাক্তার আর স্বেচ্ছাসেবকগন রয়েছেন আমাদের পাশে।  

১৯৭১ সালে আমরা নিজেদের খাবার যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে ভাগ করে খেয়েছিলাম। এখন আমরা আমাদের পাশের গরীব প্রতিবেশীদের সাথে আমাদের খাবার ভাগ করে খাব। কারণ তাঁরাও এই ‘অস্তিত্বের যুদ্ধে’র মহান যোদ্ধা। তাঁরা খাবারের খোঁজে বাইরে বেরুলেই আমরা মহা বিপদে পড়ব। ১৯৭১ সালের মত কিছু রাজাকারের সহায়তায় শত্রুরা আমাদের ঘরে ঘরে ঢুকে পড়বে। মাত্র কিছু দিন, তার মধ্যেই আমাদের হাতে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মত অস্ত্র সাহায্য আসবে বন্ধু রাস্ট্রদের কাছ থেকে, যেমনটি এসেছিলো ১৯৭১ সালে। বাঙ্গালীর এই ‘অস্তিত্বের যুদ্ধে’ জয়ী হওয়া ছাড়া আমাদের  কোন বিকল্প নেই। তাই আসুন আমরা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ি।