ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

প্রধানমন্ত্রীর দেয়া নমুনায়ন নির্দেশনার সঠিক অনুসরণ হতে হবে

রেজা সেলিম
প্রকাশিত: ০২ এপ্রিল ২০২০ বৃহস্পতিবার, ০৭:৫৪ পিএম
প্রধানমন্ত্রীর দেয়া নমুনায়ন নির্দেশনার সঠিক অনুসরণ হতে হবে

জীববিদ্যা, জৈব-পরিসংখ্যান, ভূতত্ত্ব তথ্য-বিজ্ঞান এবং সামাজিক বিজ্ঞানের উপর নির্ভর করে রোগতত্ত্ব বা মহামারী বিদ্যা (ইংরেজীতে যা এপিডেমিওলজি নামে সুপরিচিত) রোগ ও মৃত্যুর নিয়ামকের বিষয় নিয়ে দেশে দেশে গবেষণা বা অনুসন্ধান চালায়। এই বিদ্যা রোগের প্রাদুর্ভাব, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা কৌশল তৈরি ও বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক তৈরির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। 

করোনা ভাইরাসের সম্ভাব্য সঙ্ক্রমণ ঠেকাতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকল মহলের কী কী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন তা ভালো করে বুঝতে তথ্য বিশ্লেষণ জরুরী ছিল। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এ কাজটি করা হয়েছে ও চলমান আছে। মহামারী বিদ্যায় এরকম তথ্য বিশ্লেষণের কাজকে মডেল হিসেবে গণ্য করা হয়। হোয়াইট হাউস যুক্তরাষ্ট্রের নামীদামী বিশেষজ্ঞদের তৈরি এরকম ১২টি মডেল বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করেছে ও তার ভিত্তিতে গত সোমবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উল্লেখ করেন যে করোনা ভাইরাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ১লক্ষ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করছেন তিনি।

মার্চের মাঝামাঝি বাংলাদেশে যখন করোনা আতঙ্কের আলোচনা বিস্তৃত হয় তখনই প্রত্যাশা ছিল যেন এরকম একটি নমুনাভিত্তিক মডেল বিশ্লেষণের কাজ শুরু হয়। দুর্ভাগ্যবশতঃ আমাদের দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআর-এর কর্তাব্যাক্তিরা সে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ নয় উল্লেখ করে তা উড়িয়ে দেন। আপাত দৃষ্টিতে এটাই মনে হয়েছে যে এসব কর্মকর্তাগণ হয়তো এই জাতীয় মডেলের গুরুত্ব বুঝেন না বা তা করতে তাদের সক্ষমতায় দুর্বলতা আছে।

কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেক উপজেলা থেকে কমপক্ষে দু’টি নমুনা সংগ্রহ করে আজ বৃহস্পতিবারের মধ্যে অন্তত এক হাজার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) দুপুরে অনলাইন ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান স্বাস্থ্য অধিদফতরের এমআইএস শাখার পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান। 

তিনি বলেন, ‘আজ একটা নির্দেশনা পেয়েছি আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে। ইতোমধ্যে আমাদের মহাপরিচালক, ঢাকাসহ প্রত্যেকটা বিভাগের পরিচালক, সব সিভিল সার্জনকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন আজকের মধ্যে প্রত্যেকটি উপজেলা থেকে কমপক্ষে দু’টি করে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আমরা যেন অন্তত এক হাজার নমুনা সংগ্রহ করতে পারি এবং আগামীকাল সেগুলো পরীক্ষা করতে পারি’।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই নমুনায়নের নির্দেশনা পর্যন্ত করে দিয়েছেন বা তাঁকেই তা করে দিতে হয়েছে, আশা করি এতে আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যারা পরিসংখ্যান ও রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ে সরকারী পর্যায়ে গবেষণা করেন তাঁরা এক্ষণে এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছেন। তাঁরা নিশ্চয়ই ভেবে দেখবেন এই নির্দেশনায় দেশের সব উপজেলার কথা বলা হয়েছে অর্থাৎ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভৌগোলিক অবস্থানে করোনা আক্রান্তের হার দেখতে চেয়েছেন। দেশে একটি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিশেষ করে করোনা আক্রান্তের দেশগুলো থেকে এই রোগের প্রাদুর্ভাব শুরু হলে আমাদের দেশে প্রবাসীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশে ফিরেছেন। বাংলাদেশ পুলিশের বরাত দিয়ে পত্র পত্রিকায় এই তথ্য বেরিয়েছে যে, দেশে মার্চের প্রথম ২০ দিনে বিদেশ থেকে ফিরেছেন ২ লাখ ৯৩ হাজার মানুষ। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক এসেছেন কোভিড-১৯ আক্রান্ত দেশগুলো থেকে। বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই তাঁরা যাঁর যাঁর বাড়িতে চলে গেছেন। তাঁদের মধ্যে মাত্র ১৮ হাজার বিদেশফেরত স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টাইনে আছেন। অন্যদের কোন হদিস নেই!

ফলে দেশে উদ্বেগের প্রধান কারণ হয়েছে কমিউনিটি সঙ্ক্রমণ যার কিছু প্রমাণ সাম্প্রতিক কয়েকটি নির্ণয় বাহকের ইতিহাসে পাওয়া গেছে। ফলে দেশের সব ক’টি উপজেলা থেকে অন্তত ২টি করে নমুনা নিয়ে সব মিলিয়ে মোট ১ হাজার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করলে যে ৪টি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে সেগুলো হলো-

১। ভৌগোলিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কতোটা বিস্তৃত হয়েছে বা আদৌ হয়েছে কী না তার একটি ভিত্তিমূল ধারণা পাওয়া যাবে; 

২। সাধারণ উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের সাথে করোনা আক্রান্তের সম্পর্ক-সম্ভাবনা আছে এই আতঙ্ক-বিতর্কের সুরাহা হবে;

৩। কমিউনিটি সঙ্ক্রমণ প্রতিরোধে আমাদের দেশে যেসব কৌশল নেয়া হয়েছিল তার ভাল-মন্দ ও উপযোগিতা বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের একটি রূপরেখা পাওয়া যাবে।

৪। করোনা আক্রান্তের হার বিবেচনা করে একটি ‘অভিক্ষেপ’ বা ‘প্রজেকশন’ তৈরি হবে যা অনুসরণ করে করোনা মোকাবেলায় জাতীয় কৌশল নির্ধারণ করা যাবে।  

জাতি আজ দেখলো, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণের এই মানুষটি রোগতত্ত্ব ও জৈব-পরিসংখ্যানের হিসাবের গুরুত্ব অনুযায়ী নমুনা সংগ্রহের নির্দেশনা দিয়েছেন। যারা এখন তা বাস্তবায়ন করবেন আশা করি তাঁরা তাদের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে অন্তত এই কাজটি যথাযথভাবে সম্পন্ন করে জাতিকে নিশ্চিত রাখবেন। এতে দেশের স্বাস্থ্য গবেষণারও সম্মান বাড়বে।  

--
রেজা সেলিম, পরিচালক, আমাদের গ্রাম
ই-মেইলঃ [email protected]