ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২০, ১৮ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

করোনার পিছে হাঁটা ঠিক হবে না

ডাঃ দীন মোহাম্মদ নূরুল হক
প্রকাশিত: ২৮ মে ২০২০ বৃহস্পতিবার, ১২:০০ পিএম
করোনার পিছে হাঁটা ঠিক হবে না

করোনা মহামারীর সংকটেও কিন্তু এবারের ঈদে মানুষের যাতায়াতেরএকটা স্রোতধারা আমরা লক্ষ্য করেছি। প্রচুর গার্মেন্টস কর্মী, চাকুরীজীবি এবং খেটে খাওয়া মানুষ পরিবারের সাথে ঈদ উদযাপনকরতে সকল বাধা অতিক্রম করে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গিয়েছে।এখন আবার তারা কর্মক্ষেত্রে যোগদান করতে শহরের দিকে আসছে। উল্লেখ্য হটস্পট খ্যাত নারায়ণগঞ্জ ও টঙ্গী, গাজীপুরের প্রচুর লোকবাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে ঈদ করতে গিয়েছে।

গ্রামগঞ্জের ৮০ শতাংশ মানুষ করোনা মহামারীর ব্যাপারে এখনোউদাসীন। চলাফেরা, মিলা মিশা, হাট বাজার করা স্বাভাবিক নিয়মেই তারা চালিয়ে যাচ্ছে। ঈদুল ফিতরে শহর থেকে মানুষের যে স্রোতধারাহাজারো গ্রামে মিশে গিয়ে কিভাবে কতজনকে করোনায় আক্রান্তকরেছে সে হিসাব হয়তো কেউ দিতে পারবে না। তবে ক্ষতি যা হওয়ারতা কিন্তু হয়ে গেছে এখন শুধু অপেক্ষার পালা। আগামী ২ সপ্তাহেবুঝা যাবে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে। এখন কারফিউ দিলে বাসম্পূর্ণ লকডাউন করলেও যা হওয়ার তা কিন্তু হবে। বরং তা হবেকরোনার পিছে হাঁটা। আমাদের উচিত হবে করোনার আগে হেঁটে তারপথ রুদ্ধ করা।

https://www.banglainsider.com/media/PhotoGallery/2018October/pashai20200528061403.jpg

সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, ঘনঘন সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘরে থাকা, ইত্যাদি বিধি নিষেধ সঠিক ভাবে মেনেঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করে আমাদের উচিত হবে সারাদেশব্যাপী আগামী ২ সপ্তাহ করোনা প্রতিরোধে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। আমাদের বুঝতে হবে লকডাউন শিথিল করায় এবং গত ঈদে ইচ্ছেমত যাতায়াতের ফলে করোনার বিস্তৃতি কতটুকু হয়েছে। তারপর করোনা সংক্রমণ যদি বেড়ে যায় বা একই থাকে তা হলে পরবর্তী ২ সপ্তাহ অর্থাৎ জুন মাসের ১৫ তারিখ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত এই ১৫ দিন সারাদেশব্যাপী এক কঠিন কর্মসূচি নিতে হবে।

তখন রাস্তায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোক, অ্যাম্বুলেন্স ও খাদ্যশস্য বহনকারী গাড়ি ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। জনসাধারণকে কোনো অবস্থায় ঘর থেকে বেড় হতে দেওয়া যাবে না - কি শহর, কি গ্রামে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে যদি দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে কারফিউ দিতে হয় বা মানুষকে বাধ্যতামূলক ভাবেলক আপ করে রাখতে হয় তবে দেশের জনগণের স্বার্থে সরকারকে তাই করা উচিত। মনে হয় এটাই হবে করোনাকে বেঁধে ফেলার শেষ প্রচেষ্টা। তবে আগামী ১৫ দিনে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। বিশেষ করেসারা দেশে মানুষকে বাধ্যতামূলক ঘরে রাখার পূর্বশর্তই হবে খেটেখাওয়া মানুষের ঘরে ১৫ ই জুন থেকে ৩০ শে জুন পর্যন্ত পর্যাপ্তখাবারের ব্যবস্থা করে দেওয়া।

এতদিন কিন্তু গ্রামের অবস্থা ভালো ছিল। শহর থেকে আলাদা ছিল, বলতে গেলে করোনা মুক্তই ছিল। এখন কিন্তু গ্রাম আলাদা করে রাখার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে চলেছে। গ্রামেও করোনার বিস্তার ঘটেছে। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে কিন্তু বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন করেছে। ইমুনাইজেশন, ডাইরিয়াল ডিজিজ কন্ট্রোল, টিবি কন্ট্রোল, ম্যালেরিয়া কন্ট্রোল, মাতৃ মৃত্যু, শিশু মৃত্যুকমানো, নিরাপদ পানি ও খাদ্যের ব্যবস্থা, ভিটামিন এ ক্যাপসুল ওপুষ্টি সহ স্বাস্থ্যের সকল ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় উন্নতি সাধন করেছে। বিশেষ করে প্রতিটি গ্রামে ঐতিহাসিক কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করেপ্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে।

https://www.banglainsider.com/media/PhotoGallery/2018October/pasha20200528061342.jpg

তবে গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে ডিজিজ হলে কিউরেটিভ চিকিৎসাব্যবস্থা অপ্রতুল। তাহলে গ্রামের রোগী করোনায় আক্রান্ত হলে কোথায়যাবে? উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি ফ্লোরে আলাদা করে করোনারোগীর ব্যবস্থা করা যায় - যেখানে অক্সিজেন ও পালস অক্সিমিটারব্যবস্থা রাখতে হবে। পালস অক্সিমিটার খুবই অল্প দামের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি যন্ত্র। অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে গেলেই আমরাচিন্তিত হই এবং ভীত হয়ে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (ইন্টেনসিভ কেয়ারইউনিট বা আইসিইউ) অথবা ভেন্টিলেটরের চিন্তা করে বড় বড় হাসপাতালে ছুটে যাই। শুধু কয়েকটি পালস অক্সিমিটার থাকলেই উপজেলা বা জেলা হাসপাতালে ভর্তি করোনা রোগীদের অক্সিজেন স্যাচুরেশন দেখে কোন রোগীর আইসিইউ সাপোর্ট লাগবে তার সিদ্ধান্ত সহজেই নেওয়া যাবে।

এখন চাইলেই কিন্তু বিশ্বমানের চিকিৎসা ব্যবস্থা করা যাবে না। প্রতিটি হাসপাতালকে নতুন ভেন্টিলেটর মেশিন দিয়ে সমৃদ্ধ করা যাবে না।আমাদের যা আছে তারই সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারী ও বেসরকারী উভয় পর্যায়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে সেবা কার্যক্রম গতিশীল করতে হবে।

জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে অন্তত অক্সিজেন সিলিন্ডার ও পালস অক্সিমিটারের দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারী ও বেসরকারী অ্যাম্বুলেন্সগুলো সচল রাখতে হবে। অবশ্যই সকল কাজের কন্ট্রোল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হাতে নিতে হবে। প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ, কৃষি, খাদ্যও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে স্বস্ব ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সহিতসমন্বয়ের মাধ্যমে সকল ধরণের সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে কৃষি, গার্মেন্টস ও বৈদেশিক রেমিট্যান্স। এই ৩টি সেক্টরকে রক্ষা করার বাস্তব সম্মতকর্মসূচি অবশ্যই নিতে হবে।

একটি কথা বলে শেষ করতে চাই যে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকার জনগণ কর্তৃক সাংবিধানিক ভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত। কাজেই রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে সরকার যে কোন প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ বা ব্যবহার করতেপারে। জনস্বার্থে মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী, সচিব, অধিদপ্তরেরমহাপরিচালক (স্বাস্থ্য) ও পরিচালকবৃন্দ করোনা আক্রান্ত রোগীদেরচিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও সেবিকাদের সাথে একসাথেঅবস্থান করুন। পরিবার থেকে আলাদা হয়ে শেরাটন অথবারেডিসন হোটেলের মতো বড় স্থাপনায় সকলে একসাথে থাকার ব্যবস্থাকরুন। তা হলে অনেক ভালো এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে যারফলে করোনা প্রতিরোধে গৃহীত সকল কর্মসূচির পর্যবেক্ষণ এবং সমন্বয়অনেক ভালো হবে। সেই সাথে মানুষের সাহস ও আস্থা বেড়ে যাবে। মানুষের আস্থা আরো বহুগুন বেড়ে যাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি একটি পূর্ণাঙ্গ কভিড-১৯ হাসপাতালে রূপান্তরিত করা হয়। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি অবশ্যই ভেবে দেখবেন বলে আশা রাখি।

লেখকঃ অধ্যাপক ডাঃ দীন মোহাম্মদ নূরুল হক, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সাবেক মহাপরিচালক স্বাস্থ্য।