ঢাকা, রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২০, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বিজ্ঞান, বাস্তবতা এবং ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী

অধ্যাপক কাজী মনিরুল ইসলাম
প্রকাশিত: ৩০ জুন ২০২০ মঙ্গলবার, ০৫:০১ পিএম
বিজ্ঞান, বাস্তবতা এবং ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে আমি বহু বছর ধরে চিনি। আমরা ডব্লিউএইচও সভা এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বহুবার একসাথে অংশ নিয়েছি। সাভারে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র আয়োজিত একটি সম্মেলনে আমাকে আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন তিনি। এরপর পারিবারিক অনুষ্ঠানে আমি তাঁর মেয়েকে জানতে পারি। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে আমি সবসময়ই খুব শ্রদ্ধা করি। তাঁর কাজ, উত্সর্গ এবং কৃতিত্বের জন্য তাকে নিয়ে আমি গর্বিতও বটে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় কোনো সম্মেলন বা অনুষ্ঠানে বা যেকোনো উপলক্ষে দর্শকদের কাছে তাঁর এবং তাঁর অর্জন সম্পর্কে কথা বলে আমি সম্মানিত বোধ করি। আমি তাকে শ্রদ্ধা করি, এর প্রথম কারণ হলো তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ভারতের আগরতলায় বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দিয়েছিলেন তিনি। ড্রাগ প্রোগ্রামে তার  অবদানের জন্যেও তাকে আমি শ্রদ্ধা করি। তাছাড়া ১৯৮০ এর দশকের গোড়ার দিকে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য তাঁর সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা সবচেয়ে উদ্ভাবনী কর্মসূচির একটি। এক্ষেত্রে তিনি বিশ্বের প্রথম কয়েক জনের একজনও বটে। এই বীমার ফলে তার সেন্টারে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।  তিনি অনেক পুরষ্কার এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। যাই হোক, আমরা অনেক সময় শ্রদ্ধার সাথে তাঁর কিছু দৃষ্টিভঙ্গি এবং কৌশল সম্পর্কে অসম্মতি জানাতেও সম্মত হয়েছি। যথাযোগ্য সম্মানের সাথে এবং অনেকটা আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই বলছি যে, গত কয়েক বছরে তার কার্যক্রমগুলো বিশেষ করে, টিভি টকশো, মিডিয়া ব্রিফিং এবং সদ্যই কোভিড-১৯ ডায়াগনস্টিক কিট নিয়ে মিডিয়ায় যা চলছে তাতে করে একজন জনস্বাস্থ্য নেতা এবং একজন বিজ্ঞানী হিসাবে ডা. জাফরুল্লাহর নিষ্ঠার বিষয়ে আমার সন্দেহ জাগছে। এর কারণগুলো আমি একটু ব্যাখ্যা করছি-

বিজ্ঞান এবং বাস্তবতা

১. কভিড -১৯ অত্যন্ত সংক্রামক। প্রতিরোধের যথাযথ ব্যবস্থা ছাড়া যেমন- বাড়িতে থাকা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা বা বাইরে গেলে মাস্ক ব্যবহার না করলে একজন সংক্রমিত ব্যক্তি গড়ে আরও দুই থেকে তিন জন সুস্থ ব্যক্তিকে আক্রান্ত করতে পারে। এটি সাধারণ ফ্লুর চেয়ে দ্বিগুণ সংক্রামক।

২. ভাইরাসটি ছড়ানোর সময়কাল হলো ১৪ দিন পর্যন্ত। এই সময়কালে কোনও লক্ষণ ছাড়াই ভাইরাসটি খুব সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এটি সংক্রামিত লোকদের অন্যকে সংক্রামিত করার ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি করে। করোনার বাহক কোন উপসর্গ দেখা দেওয়ার ৪৮ ঘণ্টা আগেই ভয়ানকভাবে এটি ছড়িয়ে দিতে পারে। অতএব, যাদের হালকা সর্দি-কাছি ছে কেবল তারাই এই ভাইরাস ছড়াতে পারে, এমনটা নয়।

৩. আমি যদি সঠিক হই, তবে বাংলাদেশে যাদের লক্ষণ রয়েছে বা যাদের কনট্যাক্টে এসেছেন তাদের সবারই পরীক্ষা হয়। পরীক্ষার সুবিধা এবং ক্ষমতা বাংলাদেশে সীমিত। তাই এমন অনেকেই থাকতে পারেন যারা সংক্রমিত, কিন্তু পরীক্ষা হচ্ছে না। অতএব এমন অনেকেই থাকতে পারেন যারা লক্ষণ উপসর্গ ছাড়াই আমাদের মাঝে ঘুরছেন। তারা অবচেতনভাবেই এই রোগটি ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

৪. সংক্রমণের হার (যারা পরীক্ষায় পজিটিভ হয়েছেন) ২০-২৩% এর মধ্যে থাকাটা এটাই ইঙ্গিত করে যে, বাংলাদেশে বিস্তৃত আকারে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।  অনুমান করা হচ্ছে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করোনার বাহক আছেন, যারা পরীক্ষার আওতায় আসছেন না। করোনা প্রতিরোধের জন্য যে নির্দেশনাগুলো রয়েছে, তা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণই মানছে না বা তাদের মানতে বাধ্য করা যাচ্ছে না, বা কোনো কারণে তা মানাতা সম্ভব হচ্ছে না। এই বাস্তবতাগুলো সমক্রমণ নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তোলে।

৫. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কৌশল হলো পরীক্ষা, ট্রেস এবং বিচ্ছিন্নতা। ডব্লিউএইচও দেশগুলোকে সর্বাধিক নির্ভুল ডায়াগনস্টিক কিট দিয়ে পরীক্ষার ক্ষমতা বাড়াতে পরামর্শ দিচ্ছে। ডায়াগনস্টিকস কিটের করোনা শনাক্তকরণের সক্ষমতার কমতির ফলে বহু মিথ্যা নেগেটিভ কেস দেখা দেবে। এটা উপসর্গ সহ এবং উপসর্গ ছাড়া সব ধরনের মানুষের জন্যই কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং, আইসোলেশনে নেওয়া এবং বিচ্ছিন্নতাকরণকে আরও কঠিন করে তুলবে। এর ফলে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়বে। বহু মিথ্যা পজিটিভ কেসের পাশাপাশি বহু মিথ্যা নেগেটিভ কেসও দেখা দেবে। ভুলভাবে যাদের পজিটিভ বলা হবে, তাদের সেবা দিতে গিয়ে দেখা যাবে সত্যিকারের পজিটিভ কেসের চিকিৎসা সেবা দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে।    এই পুরো বিষয়টিই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বোঝা আরও বাড়িয়ে তুলবে। রাষ্ট্রের এবং ব্যক্তিপর্যায়ে আর্থিক বোঝা বৃদ্ধির পাশাপাশি এটা অনেকের মানসিক চাপও বাড়াবে।

উপরের এই বাস্তবতা বিবেচনা করে, পরীক্ষার কিটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নির্বাচনের ক্ষেত্রে দেশকে অবশ্যই যত্নবান হতে হবে। কোভিড-১৯ ডায়াগনস্টিক কিটগুলোর অবশ্যই সঠিকভাবে কেস সনাক্তকরণে উচ্চ সংবেদনশীলতা এবং সুনির্দিষ্টতা থাকা উচিত। যাতে করে এটা স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক বোঝার পাশাপাশি কোভিড-১৯ সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ করতেও সহায়তা করে। অন্যদিকে নিম্নমানের পরীক্ষার কিটগুলো ভ্রান্ত সুরক্ষা দেবে। সেই সঙ্গে জনসাধারণের আস্থা এবং সরকারের প্রচেষ্টাকেও ক্ষুণ্ন করবে। যার আর্থ-সামাজিক পরিণতি হবে ভয়াবহ।

আমি সেই প্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছু কথা বলি যেটা কোনও চিকিত্সা ডিভাইস বা ডায়াগনস্টিক টেস্ট কিট বাছাই এবং নিবন্ধনের জন্য ডব্লিউএইচও, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং বহু দেশ সুপারিশ করেছে-

১. পরীক্ষা কিটের সংজ্ঞা

পরীক্ষা কিটের বিবেচিত বিষয়গুলোর মধ্যে থাকতে হবে- কী রোগ বা কন্ডিশন শনাক্ত করবে, একক পরীক্ষা বা একটি অ্যালগরিদম প্রয়োজন কিনা; এবং পরীক্ষাগুলো একটি গুণগত বা পরিমাণগত ফলাফল প্রদান করতে পারে কিনা। এছাড়াও সর্বোত্তম ক্লিনিকাল ইউটিলিটির জন্য, অবশ্যই পরীক্ষার স্থানটি বিবেচনা করতে হবে (বৃহৎ পরীক্ষাগার নাকি ছোট স্বাস্থ্য কেন্দ্র); এবং এন্ড ইউজার (ভাল প্রশিক্ষিত ম্যাবরেটরি টেকনিশয়ান নাকি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহকারী দরকার হবে)।

২. মার্কেট রিভিউ

প্রস্তাবিত পরীক্ষার কিট স্পেসিফিকেশনে প্রয়োজনীয় নমুনার ধরণের বিবরণ অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে; পরীক্ষার অপারেটিং শর্তসমূহ; অতিরিক্ত কী কী সরঞ্জাম প্রয়োজন; এবং কিটটি কতদিন ব্যবহার করা যাবে।

৩. নিয়ন্ত্রক অনুমোদন

কিটের প্রি কোয়ালিফিকেশন নিম্নলিখিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত-

- পণ্য অ্যাপ্লিকেশন পর্যালোচনা; পণ্য পরীক্ষাগার মূল্যায়ন; উত্পাদন সাইট পরিদর্শন।

পরীক্ষার পারফরম্যান্স এবং উত্পাদন মানের দুটোই মূল্যায়ন করতে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।

৪. অপটিমাল ডায়গনস্টিক আক্যুরেসি

 আদর্শগতভাবে একটি পরীক্ষার পারফরম্যান্স সর্বোত্তম কার্যকারিতা নির্দেশ করে। এই ধরনের মূল্যায়ন কেবলমাত্র পরীক্ষার ডায়াগনস্টিক নির্ভুলতার জন্যই নয় তবে এর রিপিট্যাবিলিটি, পুনঃউৎপাদন এবং ব্যাপক হারে পণ্য ব্যবহার করা যাবে কিনা সেটা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করতে পারে। এসব তথ্য ব্যবহারকারীদের বাস্তব জীবনে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা কিট নির্বাচন করতে সক্ষম হবে কিনা তা বুঝতে সহায়তা করে।

৫. প্র্যাকটিসে ডায়াগনস্টিক নির্ভুলতা

ভিট্রো ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার প্রকৃত কর্মক্ষমতা এবং তাদের ব্যবহারের সহজতা উভয়ই নির্বাচন প্রক্রিয়া চলাকালীন বিবেচনা করা উচিত। সর্বশেষ ব্যবহারকারী স্তরের মূল্যায়ন বাস্তব জীবনের পরীক্ষার কার্যকারিতা এবং গুরুত্ব প্রকাশ করতে পারে।

৬. মনিটরিং পারফর্মেন্স

গুণমান নিয়ন্ত্রণ, দক্ষতা পরীক্ষা এবং শেষ ব্যবহারকারীদের তদারকি নিয়মিত হওয়া উচিৎ এবং নথিভুক্ত করা উচিত। দীর্ঘমেয়াদী গুণগত নিশ্চয়তার আরেকটি উপাদান বিপণন পরবর্তী নজরদারি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) এর টেস্ট কিট মূল্যায়ন কমিটি গণস্বাস্থ্যের কিট সুপারিশ করেনি এবং কম সেন্সিটিভিটি (১১-৪০%) পেয়েছে শুনে শয্যাশায়ী ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছিলেন, ‘কী লজ্জা!’

বিএসএমএমইউ এর মূল্যায়নের ফলাফলের ভিত্তিতে কিটের ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্তটি কি সত্যিই লজ্জাজনক ছিল? ডা.  চৌধুরী যদি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার করোনা পরীক্ষার কীটের বাছাই ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার সাথে একমত হন তবে আমি তাকে শ্রদ্ধার সাথে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলো করতে পারি-

১. গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কিটটি উপরের প্রাথমিক পাঁচটি ধাপ কি পেরিয়েছিল? যদি তা হয় তবে সেই তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যাচ্ছে কি?

২. অ্যান্টিজেন বা অ্যান্টিবডি টেস্টিং বা উভয়ই সেটা সংজ্ঞায়িত করার ব্যাপারে কেন মিক্স আপ ছিল?

৩. আমি প্রিন্ট মিডিয়া থেকে জেনেছি যে কোনও সরকারী কর্মকর্তার উপস্থিতি ছাড়াই ডঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রাথমিকভাবে আমেরিকার সিডিসিতে পরীক্ষার কিট সরবরাহ করেছিলেন। আমরা কি সিডিসি, মার্কিন মূল্যায়ন রিপোর্ট পেয়েছি?

৪. তিনি মিডিয়াকে বলেছিলেন যে তিনি নিজের কিটস রেজিস্ট্রেশন করতে কাউকে কোনও টাকা দেবেন না! একটি টিভি টকশোতে তিনি তার অর্থ কী তা বোঝাতে ব্যর্থ হন এবং বার বার ইতস্তত করতে থাকেন যে, নিবন্ধন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হবে বা ব্যয় খুব বেশি হবে বলেই আইসিডিডিআরবি বা বিএসএমএমইউকে কিট সরবরাহ করতে রাজি হননি কিনা।

একজন জনস্বাস্থ্য নেতা হিসাবে তিনি কি জনগণকে নিম্ন সংবেদনশীল টেস্ট কিট ব্যবহারের ফলে বিপুল সংখ্যক মিথ্যা পজিটিভ কেস তৈরি করতে এবং মানুষের জীবনকে বিপদে ফেলতে পারেন? সেটাও আবার শুধু এই কারণে যে, কিট মূল্যায়নের প্রক্রিয়াটি ব্যয়বহুল বা বিলম্বিত হবে? সরকার যদি তার কিটের দাবির সাথে একমত হত এবং প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন না করত, তবে কীভাবে এটা বিজ্ঞান, উদ্ভাবন, পণ্য বিকাশ এবং এর বিশ্বব্যাপী আস্থা অর্জনে বাংলাদেশকে সহায়তা করতো?

৫. গণস্বাস্থ্যের কিট ব্যবহার করে তার পজিটিভ রেজাল্ট আসাটাকে তিনি কিটের যথার্থতা বলে প্রমাণ করছেন? তার পরীক্ষাটা কি তার কিটের ১১-৪০% সংবেদনশীলতার মধ্যে পড়তে পারে না?

আমি সবসময় আমার দেশের যে কোনও উদ্ভাবন এবং বিকাশের জন্য গর্ববোধ করি। উন্নত স্বাস্থ্য অর্জনে বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি এদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং সুশীল সমাজের কাছ থেকে বিশ্ব অনেক কিছু শিখতে পারে। আমি জানি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আন্তরিকতার সাথে বাংলাদেশকে মহামারী কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করার জন্য সর্বোত্তমভাবে অবদান রাখতে চেয়েছিলেন। একইভাবে, চীন থেকে কাঁচামাল আনতে সরকার আন্তরিকভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছিল এবং দ্রুত ও ব্যাপকভাবে এই কিট ব্যবহার করে কম খরচে বেশি সংখ্যক মানুষকে পরীক্কখার আওতায় আনার প্রত্যাশা করছিল। 

দুঃখের বিষয়, সমস্ত কঠোর পরিশ্রম এবং আন্তরিক প্রচেষ্টা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দেয় নি! আমি বলব না যে এটি ব্যর্থতা। আমাদের সকলকে অবশ্যই একমত হতে হবে ভুল টেস্ট কিট কোনো সমাধান নয়। একটি ভুল টেস্ট কিট নির্বাচন করে সরকার মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলতে পারে না এবং জাতীয় অর্থনীতিকে বিপদে ফেলতে পারে না।

আমি জানি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছিলেন সরকার ‘অন্ধকার ঘরে একটি কালো বিড়াল’ ধরার চেষ্টা করছে। কেন এই জাতীয় মিডিয়া সেনসেশন বিজ্ঞান এবং এর বিধিবিধানের প্রতি সম্পূর্ণ অবহেলা করছেন! বিশ্বের অনেক সংস্থাই টেস্ট কিট তৈরিতে বিনিয়োগ করে এবং অনেক সময়ই সফল হয় না। মানসম্পন্ন অ্যান্টিবডি টেস্ট কিট না থাকার কারণে যুক্তরাজ্য তার অ্যান্টিবডি পরীক্ষায় অনেক বেশি বিলম্ব করেছে।

কোনো মিডিয়া সেনসেশন বা কেবল আত্মপ্রচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া কারও সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা উচিৎ নয়, যখন কিনা এর সঙ্গে জনগণের জীবন ও দুর্ভোগ জড়িত থাকে। 

আমি একমত যে, ভুল হতে পারে। এ থেকে অবশ্যই শিক্ষা নেওয়া উচিৎ। একটি সুন্দর বর্তমান এবং ভবিষ্যতের জন্য আমাদের অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিতে হবে। ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ তার জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে কোভিড -১৯ এর বিধ্বংসী অভিজ্ঞতা এবং বিশাল দুর্ভোগের বিষয়ে যা বলেছিলেন, আমি সেটাই এখানে তুলে ধরছি-

“আমরা আমাদের দেশে যা করেছি তাতে আমরা গর্বিত হতে পারি। অবশ্যই এই চ্যালেঞ্জটি আমাদের দুর্বলতা, অন্য অঞ্চলের উপর আমাদের নির্ভরতা প্রকাশ করে দিয়েছে। একই সঙ্গে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর জটিলতা এবং আমাদের সামাজিক ও আঞ্চলিক বৈষম্যও সামনে নিয়ে এসেছে। আমি এই সমস্ত কিছু থেকেই শিক্ষা নিতে চাই।’

আমাদের সবারও কি এ রকম আত্মপোলব্ধি এবং বিনয় প্রকাশ করে আত্মপ্রচারণা এড়ানো উচিত নয়? আমাদের লক্ষ্য অবশ্যই স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং জীবন বাঁচানো। আমাদের চিকিৎসা পেশাজীবি, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং বিজ্ঞানীদেরও অবশ্যই সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য উপযুক্ত প্রমাণ দিতে প্রস্তুত থাকতে হবে।

ডা. চৌধুরী, স্বাস্থ্য ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আপনার অবদান উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ ও এদেশের জনগণের এখনও আপনাকে দরকার ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী! আমরা আপনার প্রতি আমাদের আস্থা রাখতে চাই। আমি কোভিড -১৯ থেকে আপনার দ্রুত এবং সম্পূর্ণভাবে মুক্তির জন্য প্রার্থনা করছি।

 

লেখক: সিনিয়র স্পেশালিস্ট, লিভারপুল স্কুল অব ট্রপিকাল মেডিসিন, যুক্তরাজ্য।  

           সাবেক পরিচালক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

           থাইল্যান্ড ও নামিবিয়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক প্রতিনিধি।