ঢাকা, রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২০, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

গুজব ছড়ানো এবং আতঙ্ক সৃষ্টি বন্ধ করুন

অধ্যাপক কাজী মনিরুল ইসলাম
প্রকাশিত: ০৩ জুলাই ২০২০ শুক্রবার, ০৫:০০ পিএম
গুজব ছড়ানো এবং আতঙ্ক সৃষ্টি বন্ধ করুন

ইউএনডিপির অর্থায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের গবেষণা প্রকল্প হলো বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি বা বিপিও। তাদের সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ১ হাজার ৫০০ জনের মতো মানুষ কোভিড-১৯ এর লক্ষণ নিয়ে কোনো টেস্ট ছাড়াই মারা গেছে। সরকারের হিসেবে তারা নেই। সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এখন পর্যন্ত হাসপাতাল অথবা বাসায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ৯৬৮।   

ওই সমীক্ষায় এটাও বলা হয়েছে যে, করোনায় লক্ষণ নিয়ে যারা পরীক্ষা ছাড়াই মারা গেছেন, মৃত্যুর পর তাদের কারও কারও নমুনা পরীক্ষা হয়েছিল। তার রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে।

আমি বিশ্বাস করি, সীমিত পরীক্ষার সুযোগ থাকায় বাংলাদেশে মূলত তারাই পরীক্ষা করছে, যাদের লক্ষণ উপসর্গ প্রবল। আর এই পরীক্ষাতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এক দিনে সবচেয়ে বেশি শনাক্তের হার হয়েছিল ২৩ শতাংশ। এই হারটাকে যদি আমি বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র হিসেবে ধরি এবং বিপিও’র সমীক্ষার সাথে বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখা যাবে যে, সরকারি হিসেবের বাইরে বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে আরও ৩৪৫ জন। কারণ, বিপিও’র সমীক্ষা অনুযায়ী ১ হাজার ৫০০ মানুষ করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। বাংলাদেশের সংক্রমণের হার বিবেচনায় এই মৃতদের মধ্যে সর্বোচ্চ ২৩ শতাংশ অর্থাৎ ৩৪৫ জন ছিল করোনায় আক্রান্ত। এটাকে যদি আমরা সরকারি হিসেবের সঙ্গে যোগ করি, তাহলে বাংলাদশে করোনায় মোট মৃত্যু হবে ১৯৬৮+৩৪৫= ২৩১৩। অর্থাৎ কোভিড-১৯ এ মৃত্যুর হার (সিএফআর) হবে ১.৪৮ শতাংশ।

যদি আমরা মোট সংক্রমিত মৃত্যুর হার/ আইএফআর বিবেচনা করি, (যত মানুষ মারা গেছে ভাগ উপসর্গহীনসহ প্রকৃত সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা) তবে মৃত্যুর হার আরও অনেক কম হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে অন্য দেশের সিএফআর তুলনা করে দেহা যাক। যুক্তরাজ্য এবং ইতালিতে সিএফআর ১৪ শতাংশেরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রাজিলে এই হার ৭ শতাংশের বেশি। সুইডেনে সিএফআর ৭.৭ শতাংশ এবং ভারতে ২.৮ শতাংশ বলে জানা যায়।

বাংলাদেশে কম সিএফআর এটাই দেখাচ্ছে যে, যত বেশি সংক্রমিত থাকুক না কেন, যাদের উপসর্গ নেই বা হালকা উপসর্গ আছে, যারা অজ্ঞাতেই করোনা সংক্রমিত হচ্ছেন, যারা কোনও জটিলতা ছাড়াই এই রোগ থেকে মুক্তি পাচ্ছেন, আক্রান্ত হয়েও যারা পরীক্ষা করছেন না বা সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন- এই সমস্ত হিসেবও যদি আমরা ধরি- তাহলেও আমাদের দেশে করোনায় ক্রিটিকাল কেস কম। যে কারণে আমাদের মৃত্যুও কম।

বিভিন্ন দেশে করোনায় অসুস্থ হওয়া এবং মৃত্যুর হারের এত পার্থক্যের কারণ কি তা খুঁজে দেখা খুব ভালো একটা কাজ হবে। করোনাকালে বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং কর্মসূচীর পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। বাংলাদেশে লকডাউন শিথিল হওয়ায় টেস্ট বাড়ানো অব্যাহত রাখতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা কর্মী, আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা, পোশাক কারখানা এবং শিল্প শ্রমিকদের মধ্যে টেস্ট করা আরও বাড়াতে হবে। কঠোর নজরদারির মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকা লকডাউন, কনট্যাক্ট ট্রেসিং, আইসোলেশন ইত্যাদি জোরদার করতে হবে। জনগণের যতদূর সম্ভব বাইরে যাওয়া এড়ানো উচিত। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং বাইরে যাওয়ার সময় সঠিকভাবে মাস্ক ব্যবহার করার পাশাপাশি সাবান দিয়ে বারবার হাত ধোয়া বা স্যানিটাইজার ব্যবহারের মতো ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

বাংলাদেশে যারা কোভিড-১৯ এর সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্বাস করে না এবং প্রশ্নবিদ্ধ করে, যারা বিভিন্ন মিডিয়া এবং সামাজিক মাধ্যমে দাবি করে যে বাংলাদেশের মানুষ মশা-মাছির মতো মারা যাচ্ছে, রাস্তায় লাশ পড়ে থাকছে- তাদের আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, দয়া করে গুজব ছড়ানো বন্ধ করুন। আতঙ্ক সৃষ্টি বন্ধ করুন। এসব মানুষের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। এসব কোভিড-১৯ মোকাবেলায় সহায়ক নয়। কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে এখন একসঙ্গে কাজ করার সময়।

লেখক: সিনিয়র স্পেশালিস্ট, লিভারপুল স্কুল অব ট্রপিকাল মেডিসিন, যুক্তরাজ্য।  

           সাবেক পরিচালক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

           থাইল্যান্ড ও নামিবিয়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক প্রতিনিধি।