ঢাকা, রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২০, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

এবার বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধে ষড়যন্ত্র

সায়েদুল আরেফিন 
প্রকাশিত: ০৩ জুলাই ২০২০ শুক্রবার, ০৮:২২ পিএম
এবার বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধে ষড়যন্ত্র

পৃথিবীর সব দেশেই শিল্পের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের জন্য লাগে উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী, জমি, অর্থ, শ্রমিক, জ্বালানী, পরিবহণ ব্যবস্থা, পরিসেবা ব্যবস্থা,ইত্যাদি। আধুনিক মানের মাঝারী ও ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠায় জ্বালানি হচ্ছে অন্যতম প্রধান উপাদান। তাই দেশের শিল্প বিকাশে বিভিন্ন উপায়ে জ্বালানীর সংস্থান করা হয়ে থাকে যার মধ্যে কয়লা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ অন্যতম সস্তা। তাই গোটা বিশ্বের জ্বালানীর প্রায় ৩৮.৩ ভাগ আসে কয়লা উৎপাদিত বিদ্যুৎ থেকে। যার ৭৮% উৎপাদন করে থাকে চায়না, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাপান, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলংকার মত দেশগুলো।
  
বাংলাদেশ কেন কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে? তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহারে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেখানে উৎপাদন খরচ হয় ৬ থেকে ১২ মার্কিন ডলার প্রতি মিলিয়ন বিটিইউ। অন্য দিকে কয়লার মূল্য সেখানে ১ থেকে ২ ডলার ( মার্কিন ) প্রতি মিলিয়ন বিটিইউ। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, ১ হর্সপাওয়ার ৭৪৬ ওয়াটের সমান  যা প্রতি মিনিটে ৩৩,০০০ ফুট–পাউন্ডের সমান । ১০৫৫ জুল = ১ ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (বিটিইউ) যা ১ ঘণ্টায় ১ কিলোওয়াট শক্তির সমান। 

বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা ব্যবহারের আরেকটি কারণ হচ্ছে বর্তমান ব্যবহারের হিসাবে, জীবাশ্ম-জ্বালানিগুলির মধ্যে তেল, কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার নিঃশেষ হবে আনুমানিক যথাক্রমে ৩৫, ১০৭  এবং ৩৭ বৎসরে । এর অর্থ, কয়লা পাওয়া যাবে ২১১২-সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ ২০৪২-সালের পর এটি থাকবে একমাত্র জীবাশ্ম-জ্বালানি। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পরে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, বায়ু থেকে বিদ্যুৎ তৈরির সম্ভাবনা বাংলাদেশে নেই। বিদ্যুতের নতুন উৎসের সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত আগামীতে কয়লাই হচ্ছে আমাদের একমাত্র ভরসা।
     
এসব সর্বজ্ঞানীদের অভিযোগ কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পরিবেশ দূষণ হবে। কিছু দূষণ যে হবে তাতে কোনই সন্দেহ নেই। যে কম্পিউটার বা মোবাইল থেকে এই প্রতিবাদ লিপি পাঠানো বা সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা হচ্ছে তার একটি ছোট্ট চিপস ১ ঘণ্টায় কয়েক লক্ষ পানি দূষিত করে ফুড চেইন এ ঢুকে পড়তে পারে। যে এসি রুমে বসে কোল্ড টি খেতে খেতে বিবৃতি দিচ্ছেন তসেই এসি বা রেফ্রিজারেটরে কি পরিবেশ দূষণ করে না? করোনা কালে সে কি আপনার ইমিউন সিস্টেম দুর্বল করছে না? সভ্যতার কোন অনুষঙ্গ দূষণ করে না সেটা হিসাব করা তাঁদের জন্য খুব জরুরী।
    
২০১১-সালে যুক্তরাজ্যের জনৈক  non-profit- Carbon Tracker তার রিপোর্ট- Unburnable Carbon-এ বলছে যে, ২-ডিগ্রী সেলসিয়াস সীমার মধ্যে বিশ্বের গড় তাপমাত্রাকে রাখতে হলে বর্তমান শতাব্দীর প্রথমার্ধে জীবাশ্ম-জ্বালানিগুলি থেকে কার্বন-নিঃসরণ সীমায়িত রাখতে হবে ১,৪০০ গিগা-টনের মধ্যে । যেহেতু ২০১৩-সালের মধ্যে আমরা ৪০০ গিগাটন নিঃসরণ করে ফেলেছি, ২০৫০-সালের মধ্যে আমাদের নিঃসরণের সীমা হল ১,০০০ গিগাটন।
 
আলট্রা-সুপার-ক্রিটিক্যাল ইউনিটে ( গ্রস ) প্ল্যান্ট-কার্যদক্ষতা হয় ৪৬-শতাংশের মতন  এবং উন্নত আলট্রা-সুপার-ক্রিটিক্যাল ইউনিটে ( গ্রস ) প্ল্যান্ট-কার্যদক্ষতা হয় ৫০-শতাংশের মতন। চাপ- ও তাপ- বৃদ্ধি হলে কার্যদক্ষতা বাড়ে, কয়লার প্রয়োজন হয় কম এবং ফলে, কমে যায় কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ। দেখা যাচ্ছে, আলট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল CO2 বন্দীকরণ-সহ প্রযুক্তিতে কার্বন-নিঃসরণ ও বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি মূল্য সব থেকে কম এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার সত্ত্বেও প্ল্যান্টের সার্বিক মূল্য খুব বেশি নয় ।  

বাংলাদেশে পরিকল্পনাধীন ও বাস্তবায়নাধীন কয়লাভিত্তিক মেগা প্রকল্পগুলো হচ্ছে-মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট, রামপাল, বাগেরহাট; আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল পাওয়ার প্ল্যান্ট, মাতারবাড়ি, কক্সবাজার; মহেশখালী, বিপিডিবি ও সিঙ্গাপুর জয়েন্ট ভেঞ্চার; মহেশখালী, কক্সবাজার; মহেশখালী, বিপিডিবি ও টিএনবি মালয়েশিয়া জয়েন্ট ভেঞ্চার; মহেশখালী, বিপিডিবি ও সিএইডিএইচকে, চায়না জয়েন্ট ভেঞ্চার; মহেশখালী, বিপিডিবি ও কেপকো, কোরিয়া জয়েন্ট ভেঞ্চার; ও পায়রা, পটুয়াখালী, এনডব্লি ও পিজিসিএল এবং সিএমসি, চায়না জয়েন্ট ভেঞ্চার। 

মাতাবাড়ি আলট্রা-সুপার-ক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে অর্থায়ন বন্ধে জাপানকে ১৮ দেশের ৪৪ সংগঠন চিঠি দিয়েছে।যদিও একই এলাকায় আরও ৬টা কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে, সিঙ্গাপুর, চীন, মালয়েশিয়া, কোরিয়ান সহায়তায়। তাঁদের কিছুই বলা হচ্ছে না। শুধু চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বাংলাদেশে সর্ব বৃহৎ দ্বিপাক্ষিক দাতা সংস্থা জাইকা, জাপানকে।  কারণ জাপানী সাহায্য বন্ধু হলে বাংলাদেশের উন্নয়নের চাকা থমকে যাবে।   

বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ বিষয়ক কর্মজোট গত মাসের মাঝামাঝি ই মেইলে পাঠানো এক চিঠিতে এ দাবি জানায়। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিতসু মোটেগি এবং জাইকা প্রেসিডেন্ট শিনিচি কিটায়োকার কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে মাতাবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্পে মানবাধিকার লঙ্ঘন, স্থানীয় পরিবেশ বিপর্যয়সহ নানা বিষয়ে উদ্বেগ জানানো হয়। 

চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছে থ্রি ফিফটি ডট অরগ, গ্রিনপিস, ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থ, এনজিও ফোরাম অন এডিবি, অয়েল চেঞ্জ ইন্টারন্যাশনাল, জ্যাকসেস জাপান, ক্লিন বাংলাদেশ। চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা (ক্যাপাসিটি) এখন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে স্থাপিত সক্ষমতার মাত্র ৪৩ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে। এটা যে এই মহামারির কারণে তা তাঁরা উল্লেখ না করেই বিবৃতিতে সই করেছেন। তাঁরা মনে করেন যে, জাপান সরকার এর কিছুই জানে না। এর সাথে পরিবেশ দূষণ সহ নানান খোঁড়া যুক্তি তাঁরা উত্থাপন করেছে।

একজন উন্নয়ন কর্মী বলেন, বাংলাদেশ যখন উন্নয়নের মহাসড়কে উঠার পরে দুনিয়াজোড়া করোনা-মহামারীর অংশ হিসেবে অন্যান্য উন্নত দেশের মত চরম নাকাল ঠিক তখন একটি বিশেষ গোষ্ঠী আবার সেই পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বাতিলের ষড়যন্ত্রের মত নতুন নোংরা খেলায় মেতেছেন। একই ভদ্রলোকের নেতৃত্বে আশে পাশের দেশের বেশ কিছু ভুঁইফোঁড় সংগঠন মিলে জাপানী সাহায্যে তৈরি মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ করার জন্য জাপান সরকারকে লিখিত দরখাস্তের মাধ্যমে চাপ দিচ্ছে।      

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই উন্নয়ন কর্মী আরও বলেন, এরা কি তাঁরা যারা ২০১৬ সালে ১ জুলাই হোলি আর্টিজান রেস্তোরাটিতে জঙ্গিদের হামলায় ১৮ জন বিদেশি নাগরিকসহ ২২ জন হত্যায় মদদ দেন, যাদের মধ্যে ৭ জন ছিলেন জাইকার বিশেষজ্ঞ! সে সময় জাপান সরকার বলেছিল যে, “এই অবস্থায় বাংলাদেশে সাহায্য বন্ধ করা মানে ইসলামিক স্টেট জঙ্গি গোষ্ঠীর স্বার্থে কাজ করা, সন্ত্রাসীদের কাছে হেরে যাওয়া; যা তাঁরা কখনোই করবেন না।“ এবারেও তাই হবে জাপান কখনোই মাতাবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজে অর্থায়ন বন্ধ করবে না বলে জাপানের কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।  কারণ বিবৃতিদাতারা দেশ বিরোধী, উন্নয়ন বিরোধী মানুষ, এরা বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে সব করতে পারে। জাপান বিশেষ সুবিধা দেয় না বলে এরা জাপানের বিরুদ্ধে লেগেছে, যদিও একই কাজ করছেন অন্যরাও। তাহলে তাঁদের কাছে কী তাঁরা কিছু পেয়েছেন! প্রশ্ন এসেই যায়।  

এখানে উল্লেখ্য যে, আমদানি করা কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয় প্রতি ইউনিট ৬ টাকার মত। পক্ষান্তরে আমাদের দেশীয় খনির কয়লা ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলে সেই উৎপাদন খরচ হবে মাত্র ৩ টাকা। এতে দেশের মানুষ যেমন কম খরচে বিদ্যুৎ পাবেন, তেমনি দেশীয় সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত হবে।   

কিছু দিন আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৭ সালের হিসাব মতে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় ন্যাশনাল পার্কের এক কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ভিয়েতনামের হ্যালং বে (উইনেস্কো ঐতিহ্য) এর মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ১২০০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্লান্ট। কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট যদি এতই দূষণ সৃষ্টি করতো, তাহলে জাপানের মতো দেশ নতুন নতুন কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট তৈরির উদ্যোগ নিতো না। ক’দিন আগে জাপান সরকার ৭০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে। চীনে প্রায় ৩০০ কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট নির্মাণ কাজ চলছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি বা দূষণ ভৌগলিকভাবে সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কোনো কারণ সুদূর আমেরিকায় ঘটলে, তার প্রভাব আমাদের এখানেও পড়বে। তাহলে আমেরিকা, জাপান, চীন, ভারতকে বলুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ রাখতে।