ঢাকা, রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২০, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

মিনা ফারাহ: এক দেহজীবি নষ্ট আত্মার মনুষ্য রূপ

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ০৬ জুলাই ২০২০ সোমবার, ১০:০১ এএম
মিনা ফারাহ: এক দেহজীবি নষ্ট আত্মার মনুষ্য রূপ

টাকা আর খ্যাতির জন্য কিছু মানুষ কত নীচে নামতে পারেন তা জানলে অনেক মানুষ বাকরুদ্ধ হবেন। টাকা আর আত্মপ্রচারের উচ্চাভিলাষ মানুষকে কোথায় নামায় তা সহজেই জানা যায় এই আইটি’র যুগে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা অনেকেই চুলে মেহেদি মাখা এক বিগত যৌবনা নারীকে দেখি কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি করে খুব নোংরা কথার ইঙ্গিতের ফুলঝুরিতে ব্যস্ত। বিদেশে বসে ইউটিউব বা ফেসবুকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অনেক বিষোদ্গার করে থাকেন এই মিনা রানী সাহা ওরফে মিনা ফারাহ।     

স্বাধীনতার পূর্বে বাংলাদেশের শেরপুর নয়ানীবাজার বাসভবনে পরিবারের সাথে থাকতেন মিনা রানি সাহা। শেরপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে সুন্দরী কিশোরী মিনা রানি সাহা এসএসসি পাশ করেন ১৯৭০ সালে। এর পরেই শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার কামারুজ্জামান দলবল নিয়ে ব্যবসায়ী সুরেন্দ্র মোহন সাহার কন্যা মিনা রানী সাহাসহ পরিবারের নারী শিশুদের ধর্ষণ করে। ধর্ষণের পরে নগদ টাকাসহ বহু স্বর্ণালংকারের বিনিময়ে তাদেরকে ভারত যাওয়ার সুযোগ দেয় কামারুজ্জামান। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল সুরেন্দ্র মোহন সাহা পরিবার নিয়ে ভারতে চলে যান। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে ১৯৭২ সালে ২য় ব্যাচে এইচএসসি পাশ করে ঢাকা ডেন্টাল কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী নেন মিনা রানি সাহা। এর মাঝেই ডেন্টাল কলেজের এক মুসলিম ছেলের সাথে প্রেম করে প্রেমিকের হাত ধরে প্রায় শূন্য হাতে ১৯৮০ সালে আমেরিকায় পাড়ি জমান মিনা রানি সাহা।                 

আমেরিকায় জীবন চালাতে মিনা রানি সাহা নতুন ‘বিনোদনের বিনিময়ে টাকা’ খেলায় মেতে উঠেন। অভিযোগ আছে যে, আমেরিকায় ম্যাগডোনাল্ডে চাকরীদাতার সাথে নিমরাজি হয়ে অনৈতিক সম্পর্ক করে তাকে ধর্ষণের অভিযোগ এনে পরে ২০ হাজার ডলারে আপোষ করেন। একই ধারায় পরবর্তীতে ১৩টি কর্মক্ষেত্রের ৭টিতেই এ কৌশলে টাকা উপার্জন করেন। কিন্তু ধরা খান এক পাকি ডেন্টিস্টের কাছে, ডেন্টিস্টের সহকারী হিসেবে নিয়োগ পেয়ে তার সাথে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে ধর্ষণের অভিযোগে ফাঁসাতে গিয়ে। এর পর মিনা তার দেহ ব্যবসায় ভিন্ন কৌশল নেয়। তার সাথে এক আফ্রিকানের নিবিড় সম্পর্ক হলে সে মিনাকে রিয়েল এস্টেটের দালালির সুযোগ করে দিলে এতে সাফল্য আসে। ফরহাদ রেজা নামের একজন মুসলিমকে বিয়ে করে সে ধর্মান্তরিত মুসলমান হন মিনা। মিনা রানী সাহা থেকে তার নাম হয় মিনা সাহা ফারাহ। কিন্তু পরে টাকার জন্য জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেওয়ার পর সাহা শব্দটি বাদ দিয়ে মিনা ফারাহ নাম ধারণ করেন তিনি।        

বাঙালী অবৈধ ইমিগ্র্যান্টদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে বেশি ভাড়ায় থাকা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করার ব্রোকারিসহ জালিয়াতি করে, আর দালালীর পাশাপাশি ডেন্টিস্ট হিসেবেও কাজ শুরু করে বলে জানা যায়। টাকার নেশায় দিশাহারা হয়ে তিনি নিউইয়র্কে ইনস্যুরেন্স জালিয়াত চক্রের অন্যতম হোতা হিসেবে পরিচিত। ফলস ইনস্যুরেন্স ক্লেইমের সাথে জড়িত থাকায় তাকে ২০০১ সালে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়।   

মিনা রানি সাহা দাবি করতেন যে, ১৯৭১-এর দুঃসহ স্মৃতি তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াতো, তাই বিবেকের তাগিদে কামারুজ্জামানসহ রাজাকারদের শাস্তির দাবিতে ‘বাংলা হলোকাস্ট অ্যান্ড নাৎসি রিসার্চ সেন্টার’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। কামারুজ্জামানের যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ নিয়ে ভিডিও-চিত্র তৈরি করেন। ২০০৮ সালের ৫ ডিসেম্বর ঢাকায় এসে সেনা সদর দফতরে সাক্ষাত করে জেনারেল মইনকে ভিডিওটি প্রদান করেন মিনা ফারাহ। এ সময় মিনা ফারাহ সাংবাদিকদের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “ওই ভিডিওটি আমি নিজে করেছি শেরপুরে গিয়ে। কেননা একাত্তর সালে শেরপুর শহরস্থ আমাদের বাড়িকেই আলবদর বাহিনীর ক্যাম্প করা হয়। সে ক্যাম্পের অধিনায়ক ছিলেন বদর বাহিনীর কমান্ডার বর্তমানে জামায়াত নেতা কামারুজ্জামান। কামারুজ্জামনের সহযোগী রাজাকার মোহন এখনও বেঁচে রয়েছেন। মোহনের জবানবন্দিতে স্পষ্ট হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফাকে হত্যার ঘটনাবলী। মোহন বলেছেন কামারুজ্জামানের পৈশাচিকতার অনেক অজানা তথ্য। এই ভিডিওটি জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের যুদ্ধাপরাধের প্রধান সাক্ষী হতে পারে বলেই তা আমি সেনাপ্রধানের কাছে হস্তান্তর করেছি।”

চারুলিপি প্রকাশন থেকে ২০০৯ সালে প্রকাশিত “হিটলার থেকে জিয়া” বইতে মিনা ফারাহ জিয়া মুক্তিযোদ্ধা নয়, জিয়া পাকিস্তানের দালাল ও আইএসআইয়ের গোলাম, জিয়া এতটা নৃশংস ও অমানুষ যে হিটলারই তার সাথে তুলনীয় - অর্থাৎ জিয়াকে সর্বকালের সর্বনিকৃষ্ট ব্যক্তি প্রমাণে অনেক ঐতিহাসিক দলিল, তথ্য-উপাত্ত ও যুক্তি দিয়ে ৭৮টি বিবেচ্য বিষয় তুলে ধরেন। বই লিখে, বিভিন্ন সভা-সেমিনারে জিয়াউর রহমানকে অশ্লীল ভাষায় গালি দিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়ে আলোচনায় এসে বিতর্কিত হয়ে নিজেকে জনপ্রিয় করতে চান মিনা ফারাহ। “হিটলার থেকে জিয়া” প্রকাশের প্রতিক্রিয়ায় কিংস কাউন্টি ব্রুকলিনে বিএনপির নেতাকর্মীরা রাস্তায় ফেলে তাকে প্রহার করে। আবুল বাসার নামের একজন চুলের ঝুটি ধরে তাকে চড়, থাপ্পড় ও লাথি মারে। তখন ড. নুরন্নবীসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেকেই তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। 2008 British television play God on Trial এর নাম নকল করে "গড অন ট্রায়াল" বইটির লেখিকা মিনা ফারাহ। বইয়ের বিষয়বস্তু মূলত ইসলাম ধর্মের কড়া সমালোচনা, পাশাপাশি অন্য ধর্মও সমালোচনায় এসেছে। এ বই নিয়ে নিউইয়র্কে বিক্ষোভ হয়। এতে তিনি তসলিমা নাসরিন হবার চেষ্টা করেন। এছাড়াও তিনি বেশ কিছু বই লিখেছেন।       

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলে তার পিতার শেরপুরের নয়ানীবাজারস্থ বাসভবনকে টর্চারসেল হিসেবে ব্যবহার করে কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে হত্যা-ধর্ষণ ও লুটপাট করা হত এই মর্মে স্বীকারোক্তি দিয়ে স্বেচ্ছায় সাক্ষী হন। কিন্তু পরে পুরো পরিবার মিলে ২০১৩ সালের পর ডিগবাজী দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে সাক্ষ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। কারণ হিসেবে জানা যায় যে, তাঁদের এলাকার প্রাক্তন জমিদার মিনার বাবাকে মন্দিরসহ বেশকিছু সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব দিলে তিনি তার আয়ত্বে নিয়ে নেন। এটা বিক্রি করার চেষ্টা করলে জটিলতা দেখা দিলে ২০১৩ সাল থেকে মিনা তার জামাত-বিরোধী অবস্থান থেকে সরে আসেন। শেরপুরের এসপি আনিসুর রহমান জানান যে, জামাতের সাথে মিনার পরিবারের ডিল ছিল ৭ কোটি টাকার; ২ কোটি টাকা দেয়া হয় শেরপুর জামাতের মধ্যস্থতায়। এর পরে মিনা ইনকিলাব-নয়া দিগন্তে রাজাকারদের পক্ষে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে লেখা শুরু করেন। 

"হিন্দুরাই হিন্দুদের শত্রু। হিন্দুরা আওয়ামী লীগের নির্দেশে নিজেরাই নিজেদের উপর হামলা করে।... মুসলমানরা কখনোই একটি অধার্মিক কাজ কোটি টাকা দিলেও করতো না। আমি তাদের ধর্মপ্রাণতা জানি। হিন্দুদের সমস্যা এরা মেরুদণ্ডহীন, ধর্মহীন এবং ধর্ম বেচে ব্যবসা করে”। মিনা ফারাহ’র এমন লেখার প্রতিবাদে শেরপুরের মন্দির কমিটির সিদ্ধান্তে তার বিরুদ্ধে জিডি করা হয় (জিডি নং-১৪৩৫, শেরপুর সদর থানা)।  

মিনার ছেলে শাফায়েত রেজা জয় মায়ের বেপরোয়া, উচ্ছৃঙ্খল আচরণে হতাশ হয়ে এবং নিজের পছন্দের মেয়ের সাথে প্রেমে বাধা পেয়ে এলএসডি নামের মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে। কিছুদিন পর একটি ইসলামিস্ট গ্রুপের সাথে যুক্ত হয়ে নামাজ-রোজা পালনসহ ইসলামের দাওয়াতি কাজে অংশগ্রহণ শুরু করে। রোজা থাকা অবস্থায় একটি সড়ক দুর্ঘটনায় জয়ের মৃত্যু হলে তাকে কবর দেয়ার পরিবর্তে চিতায় পোড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় মিনা। সংবাদ শিরোনাম হয় এই ঘটনা।

মিনা ফারাহ এখনো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিষোদগার করে চলেছেন এবং জামায়াতের পক্ষে ফোঁপর দালালী করছেন। তাঁর বক্তব্য রেকর্ড করে ইউ টিউবে আপলোড করছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের রাজনীতিতে যদি জামায়াত প্রভাব বিস্তার করতে পারতো তা হলে আমাদের হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ ফিরে আসতো। বর্তমান সরকার জামায়াতকে ছেড়াবেড়া করে ফেলেছে। শেখ হাসিনা জামায়াতের পেছনে লেগে আছে। ভবিষ্যতে জামায়াতের সন্তানরা এদেশ শাসন করবে।’ মিনা ফারাহ বঙ্গবন্ধুকে নিয়েও বাজে কথা বলার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন। ফলে তার বাংলাদেশে আসার উপর হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। 

বিগত যৌবনা দেহজীবি  যেমন অচল শরীরের মনোবাসনা মুখের নোংরা কথা দিয়ে মেটায়, মিনা ফারাহ’রও এখন সেই দশা। মিনা ফারাহ এখন এক বিগত যৌবনা দেহজীবির নষ্ট আত্মার মনুষ্য রূপ

কৃতজ্ঞতা: সঞ্জীব চন্দ্র, রিচার্ড লী, শওকত আলী, আবদুল কুদ্দুস, বিশ্বজিত সাহা, আলী আকবর টাবী, অন্যান্য

 

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট