ঢাকা, রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২০, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

গবাদিপশুতে করোনার ভয় নেই, হাটে-অনলাইনে গরু কিনুন

ড. মো. আওলাদ হোসেন
প্রকাশিত: ০৭ জুলাই ২০২০ মঙ্গলবার, ০৯:৫৯ এএম
গবাদিপশুতে করোনার ভয় নেই, হাটে-অনলাইনে গরু কিনুন

পদ্মানদীর ধূধূ বালুচরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বসতি। কেউবা নিজের জমিতে, কেউবা অন্যের জমিতে। সকল বাড়িতেই সামর্থ্য অনুযায়ী দুই/একটি গরু বা ছাগল লালন-পালন করছে। কৃষিকাজের আধুনিকতায় গৃহস্থরা এখন আর গরু দিয়ে হালচাষ করে না। যারা নিজেদের জমিতে বাড়ি করেছেন, আবাদী জমিজমা রয়েছে, তারা শখের বসে বা দুধ খাওয়ার জন্য দুধেল গাভী পুষেন। যারা সেই অবস্থায় নেই, তাদের অনেকেই কষ্টার্জিত অর্থের কিয়দাংশ সঞ্চয় করে একটি ছোট ষাঁড় বাছুর ক্রয় করে খুবই আদর-যত্নের সাথে লালন-পালন করেন। উদ্দেশ্য, কোরবানীর হাটে ক্রেতাসাধারণ সুস্থ, সুন্দর পশু ক্রয় করতে ভীড় জমাবেন, আর পদ্মাচরের গরীব পরিবারটির অতি আদরে লালিতপালিত পশুটি বিক্রয় করে, ঐ টাকা দিয়ে বাড়িতে টিনের ঘর তুলবেন, মেয়ের বিয়েতে খরচ করবেন, আরও কত কি স্বপ্ন রয়েছে।

গ্রামের অনেক বেকার শিক্ষিত যুবক, আরও কয়েকজন বেকার বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ায়। হঠাৎ পরিচয় হয় স্থানীয় প্রানীসম্পদ কর্মকর্তাদের সাথে। ধারনা পায় গরু পালনের, আশ্বাস পায় সরকারি সহযোগীতা পাবে গরু মোটাতাজাকরণের। তিন মাস, ছয় মাস বা এক বছর লালনপালন করে কোরবানীর হাটে ভাল দামে বিক্রয় করবে। বেকারত্ব ঘুচাবে। কর্মহীন যুবকেরা খুঁজে পেয়েছে বেঁচে থাকার উপায়। শুরু করেছে, গরু মোটাতাজকরণ খামার।

গ্রামের গরীব কৃষকও গোয়ালের ষাঁড় বাছুরটা বছর দুই যাবত অতি যত্ন সহকারে লালনপালন করছে। দেখতে বেশ নাদুস-নুদুস হয়েছে। কোরবানীর হাটে বিক্রয় করে একটু বেশী দাম পাবে। সেই দাম দিয়ে বন্ধক থাকা জমিটা ছাড়াবে।

ছোট ছোট গরু ব্যবসায়ীরা গ্রামের ৫০-৬০জন গরীব কৃষককে গরু কিনে বর্গায় পালতে দিয়েছে। গরু মোটাতাজকরণ প্রকল্পের অধীনে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এই টাকা বিনিয়োগ করেছে। কোরবানীর হাটে গরু বিক্রয় করে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করবে, মুনাফা করবে, ঐ বর্গাদার কৃষক ও গরু ব্যবসায়ী পরিবার পরিজন নিয়ে মহা আনন্দ নিয়ে ঈদ করবে।

সরকারি হিসাবে গত বছর বাংলাদেশে প্রায় ৫,৫০,০০০ বেকার যুবক, গরীব কৃষক ও খামারী এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত ছিল। গত বছর গরু হৃষ্টপুষ্টকরণ প্রকল্পের আওতায় কোরবানির জন্য ঢাকা সিটি করর্পোরেশনসহ সারাদেশে গবাদিপশুর সংখ্যা ছিল সর্বমোট ১,১৭,৮৮,৫৬৩ টি।

এবছরও  এ কার্যক্রমের আওতায় মাঠ পর্যায়ের রিপোর্ট অনুযায়ী কোরবানিরযোগ্য ৪৫ লক্ষ ৩৮ হাজার  গরু মহিষ, ৭৩ লক্ষ ৫৫ হাজার  ছাগল ভেড়াসহ সর্বমোট ১,১৮,৯৭,৫০০টি গবাদিপশুর প্রাপ্যতা আশা করা যাচ্ছে। এবারও কমবেশী প্রায় ৫-৬ লক্ষ বেকার যুবক, গরীব কৃষক ও খামারী এই কাজে জড়িত রয়েছে।
 
গত কয়েকদিন পূর্বে সচিবালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাথে আলাপ হলো। করোনার কারণে নিয়মিত অফিস করেন না। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সপ্তাহে ২/৩ দিন অফিসে আসেন। খুবই সতর্কতার সাথে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে চলাফেরা করেন। তার সাথে আলাপ প্রসঙ্গে গত রমজান, ঈদ , আগামী কোরবানী ঈদ ইত্যাদি বিষয়েও আলোচনা করা হলো। পরিবার পরিজন নিয়ে ঘরের ভিতরেই ঈদ-উল-ফিতর উদযাপন করেছেন। ঈদের নামাজ ঘরেই আদায় করেছেন। কোরবানী ঈদের বিষয়ে জানালেন, গতবার ছেলেকে সাথে নিয়ে গরুর হাটে গিয়েছেন, পছন্দমত গরু কিনেছেন, কোরবানী করেছেন। এবার আর সম্ভব হবে না। করোনার কারণে গরুর হাটে যাবেন না। প্রশ্ন করলাম দৈনন্দিন বা নিত্য প্রয়োজনীয় মাছ-তরকারী কিভাবে কি করেন? উত্তরে বললেন, প্রয়োজনের তাগিদে স্থানীয় বাজারে মাঝে মধ্যে গিয়ে থাকেন।

করোনার কারণে সাধারনত মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ আদায় করা হয় না, তবে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে সাপ্তাহিক জুম্মা নামাজ মহল্লার মসজিদে আদায় করি। এতে মসজিদ কমিটির সাথে মসজিদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে কথা বলা যায়, এলাকার মুরব্বীদের সাথে মত বিনিময় হয়, এই সুযোগে সংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথেও দেখা সাক্ষাতের সুযোগ হয়। গত শুক্রবার জুম্মা নামাজ আদায় করতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম, একজন সিনিয়র মুসল্লী পেছন থেকে সামনের কাতারে আসলেন। আমি বিনয়ের সাথে বললাম, এই ফাঁকা জায়গায় দাঁড়ানো যাবে না, স্বাস্থ্যবিধি লংঘন হবে। মসজিদের সম্মানিত ইমাম সাহেব উত্তরে বললেন, সামনেই বাজার রয়েছে, খোঁজ নিন, সকাল-সন্ধ্যা কোন ব্যক্তি স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে কি?

এবার আসল কথায় আসি। জিলহজ্ব মাসের নির্দিষ্ট তারিখসমূহে, আল্লাহর আদেশে নিজ পুত্র ইসমাঈল (আঃ)কে আল্লাহর জন্য কুরবানি করার হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর ইচ্ছা ও ত্যাগের কথা স্মরণে, মুসলমানগণ আল্লাহ ভীতির অকাট্য পরিচয় দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজ নিজ সাধ্য অনুযায়ী হালাল ও সুস্থ পশু জবেহ করেন এবং জবেহকৃত পশুর মাংস, চামড়া গরীব আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীদের মাঝে বিতরণ করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঈদ-উল-আজহার পূর্বে বিভিন্নভাবে এই পশুগুলো বেচাকেনা হয়ে থাকে। তদ্রুপ বাংলাদেশেও গরুর হাট বসে। এছাড়া জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গড়া ডিজিটাল বাংলাদেশে অনলাইনে গরু ক্রয় করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। উপরোল্লেখিত সরকারি হিসাবমতে এবছর ৫-৬ লক্ষ বেকার যুবক, গরীব কৃষক ও খামারীর লালন পালন করা কোরবানির যোগ্য (সুস্থ এবং প্রাপ্ত বয়স্ক) সর্বমোট ১,১৮,৯৭,৫০০টি গবাদিপশু দেশের বিভিন্ন হাটে বা অনলাইনে বিক্রয় হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
 
গত ২৮ জুন আমি বাংলাইনসাইডারে লিখেছি, গবাদিপশুতে COVID-19 হয় না। আমি আরও উল্লেখ করেছি, WHO (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা)-এর ওয়েবসাইটে স্পষ্ট বলা আছে এখন পর্যন্ত গবাদিপশু, পোষা কুকুর- বিড়াল হতে এই নভেল করোনার (SARS COV-2) জীবাণু মানুষে ছড়ানোর কোন প্রমান পাওয়া যায়নি। Kansas State University Veterinary Diagnostic Laboratory-এর পরিচালক বলেছেন,  “আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, বর্তমানে মানবদেহে সংক্রমণকারী SARS COV-2 এর সাথে গবাদিপশুর দেহের করোনা ভাইরাসের কোন সম্পর্ক নাই। গবাদিপশু COVID-19 এর জীবাণু বহন করে না এবং গবাদিপশু এই রোগ ছড়ানোর বাহক হিসাবেও কাজ করে না”। অর্থ্যাৎ SARS COV-2 virus মানুষ থেকে মানুষে সংস্পর্শ বা হাঁচি, কাশির মাধ্যমে ছড়ায়, গবাদিপশু এই ভাইরাস বহন করে না। অর্থ্যাৎ গবাদিপশুর সংস্পর্শে আসলে COVID-19 রোগ হওয়ার সম্ভাবনা নাই।

যদিও করোনার সংক্রমণরোধে স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী দুই মিটার দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা রয়েছে, কিন্তু আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে বাস্তবতা ভিন্ন। মসজিদ ও অফিস-আদালত ব্যতীত বাকী প্রায় সকল ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরন করা হচ্ছে না। আর যেহেতু গবাদিপশুর সংস্পর্শে আসলে COVID-19 রোগ হওয়ার সম্ভাবনা নাই, সুতরাং সচেতনভাবে গরুর হাটে গিয়ে গবাদিপশু ক্রয় করতে ভীত হওয়ার কোন কারন নাই। এছাড়া অনলাইনেও কোরবানীর জন্য পছন্দনীয় পশু ক্রয় করার সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সভাপতি ও সাবেক সিনিয়র সচিব জনাব সাজ্জাদ হোসেন উল্লেখ করেছেন, সম্পদ এর সাথে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ প্রত্যক্ষভাবে ৫০% পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে। প্রানীসম্পদ মন্ত্রনালয়ের তথ্যানুযায়ী স্থির মূল্যের ভিত্তিতে বিগত ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ছিল ১.৪৭%। যা টাকার অংকে প্রায় ৪৩২১২ (১.৪৭%) কোটি টাকা। প্রাণিসম্পদ খাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩.৪৭%।

চলতি মূল্যে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে কৃষিজ জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ছিল ১৩.৪৬%। চামড়াসহ বিভিন্ন উপজাত পণ্য, মাংস রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও এ খাতের গুরূত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে শিল্পোন্নয়নের ফলে দ্রূত অর্থনৈতিক পরিধি বাড়ার কারণে জাতীয় অর্থনীতিতে আনুপাতিক হারে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান কমে আসলেও একক খাত হিসেবে এই খাতের পরিধি দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতীয় রপ্তানি আয়ের প্রায় শতকরা ২.৪৯ ভাগ টাকা আসে বিদেশে চামড়া ও চামড়া জাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে। 

বানিজ্য মন্ত্রনালয়ের তথ্য অনুযায়ী চামড়া শিল্পের বাৎসরিক প্রয়োজনীয় ১০ মিলিয়ন চামড়া অর্ধেকেরও বেশী সংগৃহীত হয় কোরবানীর ঈদে।

গত বছর কোরবানীর জন্য ১,১৭,৮৮,৫৬৩টি পশু বিক্রয় হয়েছে। এ বছর  ১,১৮,৯৭,৫০০টি গবাদিপশু কোরবানী উপলক্ষে বিক্রয়ের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। যদি কোন কারণে এ বছর কোরবানীর জন্য প্রস্তুতকৃত গবাদিপশুগুলি বিক্রয় না হয় তবে, প্রত্যক্ষভাবে ৫-৬ লক্ষ বেকার যুবক, গরীব কৃষক ও খামারী ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এবং বাংলাদেশের প্রানীসম্পদ ও চামড়াশিল্পে একটি বড় আঘাত আসবে।

হে ধর্মপ্রান মুসলমানগণ হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর ইচ্ছা ও ত্যাগের কথা স্মরণে, আল্লাহ ভীতির অকাট্য পরিচয় দিয়ে আল্লাহ সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজ নিজ সাধ্য অনুযায়ী হালাল ও সুস্থ পশু কোরবানী করুন। মনে রাখবেন এবারের কোরবানীর সাথে আপনার ওয়াজেব আদায়ের পাশাপাশি অনেক বেকার ও দরীদ্র মানুষের ভাগ্য জড়িত।

লেখক: ভেটেরিনারীয়ান, পরিবেশবিদ, রাজনৈতিক কর্মী।