ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২০, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

এক ড্যাব নেতার উত্থানের কাহিনী

সায়েদুল আরেফিন 
প্রকাশিত: ১১ জুলাই ২০২০ শনিবার, ০৯:৫৯ এএম
এক ড্যাব নেতার উত্থানের কাহিনী

২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে বিএনপি পন্থী ডাক্তারদের সংগঠন ড্যাব নেতারা খুব বিপদে পড়ে যান। তারা টিকে থাকার জন্য নানামুখী চিন্তা করতে থাকেন। তখন স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা খুব বেহাল। কোন বিশেষ রোগের বা স্বাস্থ্য খাতের কোন বিষয়ের ব্যাপারে তথ্য পেতে হলে ৬৪ জেলায় ফোন করে বা ফ্যাক্স করে তা নিতে হতো। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ করার ঘোষণা দিলেন। এটা নিয়ে সবাই তখন খুব তাচ্ছিল্য আর হাসাহাসি শুরু করেন।
ইতোমধ্যে ২০১৪ সালের নির্বাচনে  আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসার পরে বিএনপি পন্থী ডাক্তারদের সংগঠন ড্যাব নেতারা খুব অসহায় অবস্থায় পড়ে যান। এ সময় ডা. আবুল কালাম আজাদ নিজেদের অবস্থা বেগতিক দেখে উল্টা সুরে গান শুরু করলেন। তিনি ভাবলেন যে, স্রোতের বিরুদ্ধে গিয়ে লাভ হবে না। তাঁর টাকা পয়সার অভাব ছিল না, কারণ ড্যাব নেতা হিসেবে তিনি কামিয়েছিলেন বিস্তর। বিএনপি আমলে পাকি পন্থী পরিবারের সদস্য হিসেবে তাঁকে টাকা কামানোর এই বিশেষ সুযোগ এনে দেয়।      
হঠাৎ সবাইকে অবাক করে দিয়ে ডা. আবুল কালাম আজাদ বললেন তিনি এমআইএস মানে স্বাস্থ্য খাতের সব তথ্য ডিজিটাল ফরমে আনার দায়িত্ব নেন। তিনি ভাবলেন যে, এটা করে যদি চাকরীতে ভাগ্য পরিবর্তন করা যায়। উনি ডিজি অফিসের নীচ তলায় কয়েকটা কম্পিউটার নিয়ে কিছু আইটি জানা লোক নিয়ে এমআইএস এর কাজ শুরু করলেন। এর পরে তিনি জাইকার সহযোগিতায় জাপানী আইটি বিশেষজ্ঞ নিয়ে সহায়তা নিলেন। জাইকার এক্সপার্ট কিছু ইনপুট দিয়ে এমআইএস শাখাকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করলেন। কাজ করতে করতে এর মাঝেই ডা. আবুল কালাম আজাদ এমআইএসএর বেশ কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফেললেন। তাঁর শেখাটা ছিল অস্তিত্বের কারণে খুব আন্তরিক, কারণ এটা ছিল একজন ড্যাব নেতার চাকরিতে টিকে থাকার প্রশ্ন। তাই চেষ্টাটাও ছিল খুব সিরিয়াস।  
কিছুদিন যাবার পরে ডিজি অফিসে যত মিটিং হয় তার সব মিটিং এ নানা রকম স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্যের জন্য ডা. আবুল কালাম আজাদ সাহেবের ডাক পড়ে। তিনি তথ্য দিতে দিতে তাঁর গায়ের ড্যাব নেতার তকমা ফিকে হতে থাকে। তিনি হয়ে উঠেন ডিজিটাল বাংলাদেশের অন্যতম নিবেদিত প্রাণ কর্মী। ধীরে ধীরে ডা. আবুল কালাম আজাদ ডিজি হেলথ অফিসে একজন অপরিহার্য বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠেন। এ সময় মন্ত্রণালয়, ছাড়াও বিভিন্ন দপ্তরে স্বাস্থ্য খাতের বিষয়ে প্রেজেন্টেশন করতে থাকেন ডা. আবুল কালাম আজাদ। এভাবেই তিনি ধীরে ধীরে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিচিতি আর করিতকর্মা মানুষ হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যান।
এর পরে আস্তে আস্তে ডা. আবুল কালাম আজাদের মুখে জয় বাংলা, বঙ্গবন্ধু, ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে বলতে মুখে-ফেনা তুলে ফেলতে থাকেন। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অনেকেই তাঁর প্রতি দুর্বল হতে থাকে। তাঁকে ছাড় দিতে শুরু করেন। এভাবেই তিনি ডিজি অফিসের বড় পদটি বাগিয়ে নেন। এভাবেই ধীরে ধীরে মিষ্টভাষী ডা. আবুল কালাম আজাদ পরে চুক্তিতে নিয়োগটাও বাগিয়ে নেন।      
এর পরে শুরু হয় আসল খেলা। তাঁর প্রভাবেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ পদে জামায়াতের সাবেক এমপি সাহেবের ছেলে নেতা বনে যান। বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রলীগ করা ডাক্তারগনের শুরু হয় বঞ্চনা, আর গঞ্জনার শিকার। পদোন্নতি, ভালো জায়গায় পোস্টিং, বিদেশে প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য দপ্তরের বিভিন্ন কেনা কাটায় ডা. আজাদ হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য। কৌশলে তিনি সাথে নেন মন্ত্রী মহোদয়ের সন্তানকে স্বাস্থ্য খাতে ব্যবসার সুযোগ দিয়ে। এই কারণেই ডা. আবুল কালাম আজাদ আজ এত শক্তিশালী ভিত্তির উপর জেঁকে বসে আছেন। তাঁর টিকি ছোঁয়া যায় না। তিনি মুখে যা বলেন তাই হয়ে যায় ডিজি হেলথ অফিসের আইন। তাই তাঁর ক্ষমতায় জেকেজি’র আরিফুল ও সাবরিনা অবৈধ উপায়ে করোনা পরীক্ষার অনুমতি পায়। লাইসেন্স বিহীন রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক ও বহু প্রতারণা মামলার আসামী শাহেদ পায় করোনা পরীক্ষার লাইসেন্স, যেখানে মন্ত্রী সচিব সবাই উপস্থিত ছিলেন। স্বাস্থ্য দপ্তরের ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু হয়ে ওঠেন স্বাস্থ্য খাতের গড ফাদার, সকল গুরুত্বপূর্ণ কেনাকাটা আর সরবরাহের মহান অধিপতি। ডিজিএইচএসএর ডা. ইকবাল কবীর  প্রাক্তন ছাত্রদল নেতা হয়েও, হয়ে উঠেন মহীরুহ, হয়ে যান একের ভিতর চার।  
শাহেদ, মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু, ডা. ইকবাল কবীররা হয়ে উঠেন তাদের বলয় রক্ষার মুল ফাইনান্সার, তারা প্রিন্ট,  ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া, আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ আর সহযোগী সংগঠনে প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। তাঁর নিজেদের ঘরানার ডেডিকেটেড মানুষকে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে পদোন্নতি, পদায়নে সক্ষম হন। তাই তো মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু দুদককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাতে দুঃসাহস দেখায়, ৪/৫ দিন অতিবাহিত হবার পরেও শাহেদ ধরা পড়ে না। প্রধানমন্ত্রীর আদেশ উপেক্ষা করার দুঃসাহস দেখায় তারা। সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে অর্থের পাহাড় তৈরি করতে সামর্থ্য হন। দেশের কেউ জানেন না এর শেষ কথায়।