ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিশন’ গঠনের গুরুত্ব ও হোসেন আলীদের ভূমিকা

রেজা সেলিম
প্রকাশিত: ০৪ আগস্ট ২০২০ মঙ্গলবার, ১০:৫৯ এএম
‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিশন’ গঠনের গুরুত্ব ও হোসেন আলীদের ভূমিকা

বাংলা ইনসাইডারে ৩ আগস্ট ২০২০ তারিখে প্রকাশিত অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী-র লেখা “১৫ আগস্ট: ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিশন হোক” রচনাটি পড়ে আমার “বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রে দোসর ও পরিকল্পনাকারী কারা?” শীর্ষক গবেষণার কিছু অংশ এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি। ডাঃ মোদাচ্ছের আলী তাঁর লেখায় ইতিহাসের একটি ধ্রুব সত্য প্রকাশের ইঙ্গিত দিয়েছেন, সে হলো কূটনীতিক হোসেন আলী-র ভূমিকা।

কাগজ-পত্র ও ইতিহাসের দলিলগুলো নিয়ে বসলে আমরা বিচলিতবোধ করি। হোসেন আলী-সহ এমনও অনেক মানুষ আছেন ১৯৭১ সালে যারা গৌরবময় ভূমিকা রেখেছিলেন, পরবর্তিতে বঙ্গবন্ধু সরকারের সব সাফল্যের সুবিধা নিয়ে বড়ো বড়ো পদে আসীন হয়েছেন, তাঁরা ‘৭৫ সালের ঘটনার সাথে সাথে ভোল পাল্টে ফেলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রের দোসর বা হত্যাকারীদের জন্যে করে দেয়া দায়মুক্তির দায় থেকে এদের কেন আমরা বাদ দিতে যাবো? এটা কি স্বতঃসিদ্ধ ছিল যে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকান্ডের পর এভাবেই বাংলাদেশের ইতিহাসের চাকা পেছনে ঘুরিয়ে দেয়া যাবে আর সে রথযাত্রায় অংশ নিতে কেউ কেউ তৈরিই ছিলেন?

কূটনীতিক হোসেন আলী ১৯৭১ সালে কোলকাতা মিশনে পাকিস্তানের উপ-রাষ্ট্রদূত ছিলেন ও ১৮ এপ্রিল পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। তিনিই বিদেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মিশনের যাত্রা শুরু করেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে প্রথমে অস্ট্রেলিয়া ও পরে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেন (জানুয়ারী ১৯৭৩)। অথচ রাষ্ট্রদূত হিসেবে এই হোসেন আলীই বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর, ১৯ অগাস্ট ১৯৭৫ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী সচিব আলফ্রেড আথারটনের সাথে দেখা করেন। সেদিনই কিসিঞ্জার এই সাক্ষাতের একটি সারমর্ম ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে পাঠান, যেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে, রাষ্ট্রদূত হোসেন আলী এই সাক্ষাতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের মোশতাক সরকারের পররাষ্ট্র নীতি ব্যাখ্যা করেছেন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল সুপার পাওয়ার দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বিশেষ গুরুত্বের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলবে বলে আশা করছে। শুধু তাই-ই নয়, রাষ্ট্রদূত হোসেন আলী আথারটনের সাথে আলাপকালে উল্লেখ করেন যে, ১৯৭১ সাল থেকেই মোশতাকের সাথে তাঁর ঘনিস্ট বন্ধুত্ব রয়েছে ও মোশতাককে একজন ধার্মিক, সৎ ও স্পষ্টবাদী মানুষ বলে বর্ণণা করেন (Drawing on his close friendship with new President Khondakar Mushtaque Ahmed during 1971 in Calcutta, he described him as “pious honest and straight forward”)।

 

https://www.banglainsider.com/media/PhotoGallery/2018October/12320200804042851.png

১৯৭৫ সালের ১৯ অগাস্ট ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে কিসিঞ্জারের পাঠানো টেলিগ্রামের কপি

 

এটা কেমন করে সম্ভব হলো? ১৫ আগস্টের ঘটনাবলীর পরে হোসেন আলী কেন মোশতাকের আনুগত্য ত্যাগ করলেন না? তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্রে তখন সেটা সম্ভব ছিল না? না কি অন্য কোন সংযোগ আছে? ডা মোদাচ্ছের আলী হয়তো সেরকমই কিছু ইঙ্গিত করেছেন? আমাদের মনে এই প্রশ্ন এমন অনেক ঘটনা ও মানুষ সম্পর্কে, যেসবের উত্তর মিলে না! কিন্তু মহাকালের জন্যে খারাপ বিবেচনার দায় থেকে আমাদের প্রিয় এই মাতৃভূমি কেমন করে কখন মুক্ত হবে সে চিন্তা থেকে আমরা বিরত থাকতে পারিনা।

বঙ্গবন্ধুর মতো এরকম এক বিশাল ব্যাক্তিত্ব, সংগ্রামী রাজনৈতিক অনুশীলনের জীবনে যে মানুষ একটি দেশের ভৌগোলিক, নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ও সোনার বাংলার অর্থনৈতিক পরিচয় বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে পেরেছিলেন তাঁকে যারা হত্যা করার মতো নৃশংস ক্ষমতা রাখে পুরস্কার হিসেবে তাদের দায়মুক্তি দেয়া মূল কুচক্রের জন্যে স্বাভাবিকই ছিল যদিও কোন সভ্য জাতির জন্যে এরকম চিন্তা অভাবনীয়! কিন্তু সে দায়মুক্তির সুবিধা কি কেবল সেসব হত্যাকারী কতিপয় সদস্যই ভোগ করেছেন, এ প্রশ্ন এখন আমরা করতেই পারি। যারা হত্যার পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন, যারা হত্যাকারীদের জন্যে দায়মুক্তির আইন করেছিলেন, পরবর্তিকালে তা অব্যাহত রেখেছিলেন তারাও এর অংশীদার ছিলেন বলে বিবেচিত হওয়া উচিত কারণ রাষ্ট্রক্ষমতা ও ক্ষমতাভোগের সব রকমের সুবিধা নিয়ে দেশি-বিদেশি চক্রকে ধারাবাহিকভাবে তারা সন্তুষ্ট করতে সচেষ্ট ছিলেন। শুধু তাই-ই নয়, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বিলোপ সাধনে বংশ-পরপম্পরায় তাদের চেষ্টার কোন ত্রুটি ছিল না। এমনও দেখা যায়, হত্যাকান্ডের পরে মোশতাক সরকার রাষ্ট্রাচারে বেশ অনেকগুলো পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন। "জয় বাংলা" শ্লোগান পরিবর্তন করে এর স্থলে "বাংলাদেশ জিন্দাবাদ" শ্লোগান চালু করেন। একই সময় তিনি "বাংলাদেশ বেতার" এই নাম পরিবর্তন করে রেডিও পাকিস্তানের আদলে "রেডিও বাংলাদেশ" করেন। ধীরে ধীরে, একুশ বছরে বাংলাদেশকে তার মূল নীতি থেকে সরিয়ে নেবারও সব রকমের চেষ্টা করা হয়। আমরা মনে করি, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত নীতি নির্ধারণের যারা জীবন বাঁচাবার অজুহাতে ও চাকুরী ঠিক রাখার অভিপ্রায়ে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার মৌলিক আদর্শ জলাঞ্জলি দিতে সামান্য দ্বিধা করেননি তাদেরও ইতিহাসের কাঠগড়ায় একদিন দাঁড়াতে হবে।

এসব কারণেই দলিলপত্র, ইতিহাস ও এ যাবত প্রকাশিত গোপন দস্তাবেজ বিশ্লেষণ করে আমাদের সঙ্গত চিন্তা এই যে, বঙ্গবন্ধু হত্যায় যারা অস্ত্র চালনা করেছে তাদের বিচার না হবার দায়মুক্তি দিয়ে বরঞ্চ এই ঘটনার পরিকল্পক কুচক্র তাদের সহায়তাকারী, দেশী ও বিদেশী ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক তথাকথিত এক শ্রেণীর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, ক্ষমতালোভী রাজনীতিক-সামরিক-বেসামরিক আমলা ও পরের সময়ের সুবিধাভোগী শ্রেণী নিজেদের পাপকার্য থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতে এই দায়মুক্তির সবরকম সুবিধা নিয়েছেন। ফলে বঙ্গবন্ধু হত্যা পরিকল্পনায় ও হত্যাকারীদের দায়মুক্তি সংঘটনে ও পরবর্তী ২১ বছর তা অব্যাহত রাখতে এইসব সুবিধাভোগীদের ভূমিকা ছিল না বা দায় নেই একথা বলা যায় না।--

লেখক: গবেষক

            পরিচালক, আমাদের গ্রাম